প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ০৮ ডিসেম্বর ২০২৫ ২১:১৪ পিএম
রবিবার থাইল্যান্ডের সিসাকেট প্রদেশে একটি বিতর্কিত সীমান্ত এলাকা নিয়ে থাই ও কম্বোডিয়ান সৈন্যদের মধ্যে সংঘর্ষের পর একজন আহত সৈনিককে হাসপাতালে স্থানান্তর করা হচ্ছে। ছবি: রয়টার্স
মাত্র দু’মাস আগে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দুই প্রতিবেশী দেশ থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার মধ্যে শান্তি স্থাপনকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দেখেছিলেন এক বিশাল কূটনৈতিক বিজয় হিসেবে। কিন্তু সেই উচ্ছ্বাস আজ ধূসর।
সোমবার (৮ ডিসেম্বর) সকালে থাইল্যান্ড কম্বোডিয়ার সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালায়। ফলে ঐতিহাসিক সীমান্ত বিবাদ এবং পারস্পরিক অবিশ্বাস দুর্বল শান্তিচুক্তিকে ভেস্তে দিতে পারে যেকোনো সময়।
দুই দেশের মধ্যে নতুন করে শুরু হওয়া এই সংঘাত কেবল আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকেই নষ্ট করছে না, বরং কয়েক হাজার বেসামরিক নাগরিকের জীবনকে ঠেলে দিয়েছে অনিশ্চয়তার মুখে।
এক রাতে বদলে যাওয়া পরিস্থিতি
সংঘাতের সূত্রপাত সোমবার ভোরে। উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে বিতর্কিত সীমান্ত এলাকায় প্রথম আক্রমণের অভিযোগ তুলেছে। থাই সেনাবাহিনী জানিয়েছে, কম্বোডিয়ার হামলায় তাদের একজন সেনা নিহত এবং সাতজন আহত হওয়ার প্রতিশোধ হিসেবে তারা এই বিমান হামলা চালিয়েছে। থাই সামরিক মুখপাত্র মেজর জেনারেল উইন্ঠাই সুভারী দাবি করেন, কম্বোডিয়া ভারী অস্ত্র ব্যবহার করে থাই ঘাঁটিতে আক্রমণ করেছিল।
অন্যদিকে, কম্বোডিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এই অভিযোগকে ‘মিথ্যা’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে। তারা দাবি করেছে, উল্টো থাই বাহিনীই প্রথমে আক্রমণ শুরু করে এবং কম্বোডিয়ার সেনাবাহিনী কোনো পাল্টা আক্রমণ করেনি। কম্বোডিয়ার তথ্যমন্ত্রী নেথ ফেকট্রা বলেছেন, এই হামলায় অন্তত চারজন কম্বোডিয়ান বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং ১০ জনেরও বেশি আহত হয়েছেন।
থাইল্যান্ডের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র নিকর্নডেজ বালানকুরা বলেন, ‘থাইল্যান্ডের অবস্থান, সামরিক পদক্ষেপ অপরিবর্তিত থাকবে যতক্ষণ না কম্বোডিয়া তাদের অবস্থান পরিবর্তন করে শান্তির পথে আসে।’
ট্রাম্পের কূটনীতির ব্যর্থতা?
চলতি বছরের শুরুতে থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার মধ্যে যে সংঘাত শুরু হয়েছিল, তা ছিল কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ যুদ্ধ। এর পরিপ্রেক্ষিতে ট্রাম্প উভয় দেশের নেতাদের সঙ্গে ফোনে কথা বলার পর ২৮ জুলাই একটি প্রাথমিক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়।
এরপর থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়া অক্টোবর মাসের শেষের দিকে কুয়ালালামপুরে একটি বর্ধিত যুদ্ধবিরতি ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করে। এই অনুষ্ঠানে ট্রাম্প ও মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম উপস্থিত ছিলেন।
সোমবার ইব্রাহিম বলেন, ‘কম্বোডিয়ান ও থাই বাহিনীর মধ্যে সশস্ত্র সংঘর্ষের খবরে তিনি গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।’ একইসঙ্গে উভয় পক্ষকে সংযম দেখানোর আহ্বান জানান তিনি।
তিনি এক বিবৃতিতে বলেন, ‘নতুন করে শুরু হওয়া এই সংঘাত দুই প্রতিবেশীর মধ্যে সম্পর্ক স্থিতিশীল করার জন্য যেসব কাজ করা হয়েছে, তা নষ্ট করে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে।’
থাইল্যান্ডের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র নিকর্নডেজ সোমবার জানিয়েছেন, সর্বশেষ সংঘাতের তীব্রতা বৃদ্ধির পর থাইল্যান্ডের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রদূত এবং যুক্তরাষ্ট্রের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স (ভারপ্রাপ্ত প্রধান)-এর সঙ্গে বৈঠক করেছে, তবে তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত আর কিছু জানাননি।
অক্টোবরে যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়, তা ট্রাম্পের প্রশাসনের কাছে বড় ধরনের সাফল্য হলেও বাস্তবে সেই চুক্তি কাগজে-কলমেই রয়ে গেল। কারণ, কুয়ালালামপুরে স্বাক্ষরিত হওয়ার দুই সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে চুক্তিটি ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে। সীমান্তে স্থল মাইন বিস্ফোরণে থাই সেনারা আহত হওয়ার পর থাইল্যান্ড একতরফাভাবে চুক্তির বাস্তবায়ন স্থগিত করে দেয়।
থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী আনুদিনই চার্নভিরাকুল স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, তার দেশ ‘সহিংসতা দেখতে চায় না,’ তবে তারা কখনোই ‘দেশের সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন মেনে নেবে না।’ এই অনমনীয় অবস্থান এটাই প্রমাণ করে যে সীমান্ত নিয়ে তাদের মৌলিক বিরোধ এখনও অমীমাংসিত।

সীমান্ত থেকে পালাচ্ছে মানুষ
সামরিক পদক্ষেপের অনিবার্য ফল হিসেবে সীমান্তের উভয় দিকেই বেসামরিক নাগরিকদের জীবন বিপন্ন হয়েছে। থাইল্যান্ড যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই সীমান্ত শহরগুলো থেকে লোকজনকে সরিয়ে নেওয়া শুরু করে। এখন পর্যন্ত প্রায় ৩ লাখ ৮৫ হাজারেরও বেশি মানুষ অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে সরে গেছে।
কম্বোডিয়ার উত্তরাঞ্চলের প্রেহ বিহার এবং ওদ্দার মিঞ্চে প্রদেশেও হাজার হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। কম্বোডিয়ান কর্তৃপক্ষ অভিযোগ করেছে, থাই বাহিনীর আক্রমণে ঘরবাড়ি পুড়ে যাওয়ায় মানুষ পালাতে বাধ্য হয়েছে।

থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার মধ্যে সীমান্ত বিবাদের মূল কারণ ঐতিহাসিক। দুই দেশের মধ্যেকার প্রায় ৮০০ কিলোমিটার স্থল সীমান্তের অংশবিশেষ নিয়ে বিরোধ চলে আসছে সেই সময় থেকে, যখন কম্বোডিয়া ছিল ফরাসি উপনিবেশ। ফরাসিদের তৈরি মানচিত্রের কিছু অংশ থাইল্যান্ড মেনে নেয় না। এই ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকারের জেরে তৈরি হওয়া ক্ষত শত বছর পরেও আন্তর্জাতিক চুক্তির পথে বড় কাঁটা হয়ে আছে।
যখন আঞ্চলিক গোষ্ঠী
আসিয়ান অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা নিয়ে কাজ করছে, তখন এই দুই সদস্য রাষ্ট্রের
মধ্যেকার সংঘাত গোটা অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে। ট্রাম্পের মধ্যস্থতা
শেষ পর্যন্ত একটি সামরিক বিরতির চেয়ে বেশি কিছু দিতে পারল না, যা আবারও প্রমাণ করল,
গভীর ঐতিহাসিক অবিশ্বাস থাকলে কেবল একটি চুক্তি শান্তির নিশ্চয়তা দিতে পারে না।