প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ০৪ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৯:২৭ পিএম
আপডেট : ০৪ ডিসেম্বর ২০২৫ ২০:৩৫ পিএম
পুতিন ও মোদির মধ্যে উষ্ণ সম্পর্ক রয়েছে। ছবি: এএফপি
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন দু’দিনের সফরে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ভারতে এসেছেন। তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক করবেন আর দু’দেশের যে বার্ষিক সম্মেলন হয়, তাতেও যোগ দেবেন।
যুক্তরাষ্ট্র যখন ভারতকে চাপ দিচ্ছে যেন তারা রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধ করে, তার কয়েকমাস পরেই এই সফর হচ্ছে। আশা করা যাচ্ছে, দিল্লি আর মস্কো এই সফরে বেশ কিছু চুক্তিতে সই করবে।
এদিকে আবার যুক্তরাষ্ট্রও ইউক্রেন যুদ্ধ থামানোর জন্য রাশিয়া আর ইউক্রেনের সঙ্গে কথা বলছে। ঠিক এমন একটা সময় পুতিন আসছেন।
ভারত আর রাশিয়ার মধ্যে বহু দশক ধরে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। পুতিন আর মোদির সম্পর্কও বেশ ভালো।
চলুন দেখে নেওয়া যাক কেন এই দুজনের একে অপরের দরকার, আর এই সভায় কী কী হতে পারে।
বিশেষ বন্ধুত্ব, বাণিজ্যিক চুক্তি আর বিশ্ব রাজনীতি
ক্রেমলিনের জন্য ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক এত জরুরি কেন? প্রথমেই কিছু সংখ্যা দেখা যাক— ভারতের লোক সংখ্যা প্রায় দেড়শো কোটি। অর্থনীতি ৮ শতাংশের বেশি হারে বাড়ছে। ভারত হলো বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত বাড়তে থাকা বড় অর্থনীতি।
এসব কারণেই ভারত রাশিয়ার জিনিসপত্র আর সম্পদের জন্য– বিশেষ করে তেলের জন্য একটা বিরাট বড় বাজার।
ভারত হলো বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল ব্যবহারকারী দেশ। তারা রাশিয়া থেকে প্রচুর তেল কিনছে। আগে কিন্তু এমন ছিল না। ইউক্রেন যুদ্ধের আগে ভারত যে তেল আমদানি করত, তার মাত্র ২.৫ শতাংশ আসত রাশিয়া থেকে।
কিন্তু নিষেধাজ্ঞা আর ইউরোপের বাজারে ঢুকতে না পারার ফলে রাশিয়া যখন কম দামে তেল দেওয়া শুরু করল, ভারত সেই সুযোগ নিল। ফলে রাশিয়া থেকে ভারতের তেল কেনা ৩৫ শতাংশ বেড়ে গেল।
ভারত এতে খুশি। কিন্তু
যুক্তরাষ্ট্র খুশি নয়।
চলতি বছর শুরুর দিকে ট্রাম্প প্রশাসন ভারতীয় পণ্যের উপর আরও ২৫ শতাংশ শুল্ক বসিয়ে দেয়। তারা বলে, রাশিয়া থেকে তেল কিনে ভারত নাকি তাদের যুদ্ধ চালানোর টাকা দিচ্ছে। এরপর থেকে ভারত রাশিয়া থেকে তেল কেনা কমিয়ে দিয়েছে। প্রেসিডেন্ট পুতিন চাইবেন ভারত যেন কেনা চালিয়ে যায়।
রাশিয়ার জন্য ভারতে অস্ত্র বেচা আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যা সোভিয়েত যুগ থেকেই চলে আসছে। পুতিনের সফরের আগেই শোনা যাচ্ছিল, ভারত নাকি রাশিয়ার কাছ থেকে একদম নতুন মডেলের ফাইটার জেট আর এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম কিনতে চাইছে।
এছাড়াও, রাশিয়ায় যেহেতু শ্রমিকের অভাব, তাই তারা ভারতকে দক্ষ কর্মীর একটা ভালো উৎস হিসেবেও দেখে।
কিন্তু এর পেছনে বিশ্ব রাজনীতিও আছে।
ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য পশ্চিমের দেশগুলো রাশিয়াকে একা করে দেওয়ার চেষ্টা করেছে; ক্রেমলিন এটা দেখাতে চায় যে সেই চেষ্টা সফল হয়নি। পুতিনের দিল্লিতে এসে মোদির সঙ্গে দেখা করা সেই কাজটা করারই একটা উপায়।
যেমনটা তিন মাস আগে পুতিন চীনে গিয়ে শি জিনপিংয়ের সঙ্গে কথা বলেছিলেন। সেই সফরেই তিনি মোদির সঙ্গেও দেখা করেন। তিন নেতার হাসিমুখে একসঙ্গে ছবি একটা স্পষ্ট বার্তা দেয়, যুদ্ধ সত্ত্বেও মস্কোর এমন শক্তিশালী বন্ধু আছে, যারা একটা ‘একাধিক ক্ষমতা-কেন্দ্রের বিশ্বকে’ সমর্থন করে।
রাশিয়া চীনের সঙ্গে তাদের ‘সীমাহীন বন্ধুত্ব’ নিয়ে উচ্চকণ্ঠ।
একইভাবে, ভারতের সঙ্গে তাদের ‘বিশেষ এবং বিশেষাধিকার প্রাপ্ত কৌশলগত বন্ধুত্ব’ নিয়েও তারা খুবই সরব।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মস্কোর সম্পর্কের যে টানাপোড়েন, তার থেকে এই সম্পর্কটা একদম আলাদা।
নোভায়া গেজেটার কলামিস্ট আন্দ্রে কোলেসনিকভ মনে করেন, ‘আমার মনে হয় ক্রেমলিন নিশ্চিত যে ইউরোপসহ পশ্চিমা দুনিয়া পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে।’
‘আমরা একা নই, কারণ আমাদের এশিয়া আর গ্লোবাল সাউথের সঙ্গে যোগাযোগ আছে। অর্থনীতির দিক থেকে, এটাই ভবিষ্যৎ। এদিক থেকে দেখতে গেলে রাশিয়া আবার দুনিয়ার এই অংশের মূল খেলোয়াড় হিসেবে ফিরে এসেছে, যেমনটা সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়নেরও আমেরিকা, পশ্চিম জার্মানি আর ফ্রান্সের সঙ্গে বিশেষ যোগাযোগ ছিল। তাদের নীতি ছিল বহু-মুখী।’
‘কিন্তু এখন আমরা ইউরোপ থেকে পুরোপুরি আলাদা। এটা আগে কখনও হয়নি। আমাদের দার্শনিকরা সব সময় বলতেন, রাশিয়া ইউরোপেরই অংশ। এখন আমরা আর তা নই। এটা একটা বিরাট ভুল আর বিরাট ক্ষতি। আমি নিশ্চিত, রাশিয়ার রাজনীতি আর ব্যবসার সঙ্গে জড়িত অনেকে ইউরোপে ফিরে যাওয়ার এবং শুধু চীন আর ভারত নয়, ইউরোপের সঙ্গেও ব্যবসা করার স্বপ্ন দেখছে।’
তবে, এই সপ্তাহে রাশিয়া-ভারত বন্ধুত্ব, বাণিজ্য চুক্তি আর মস্কো-দিল্লির মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানো নিয়েই আলোচনা হবে বলে আশা করা যায়।

মোদির ‘নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা’র পরীক্ষা
পুতিনের এই সফর মোদি আর ভারতের বৈশ্বিক ক্ষমতা বাড়ানোর ইচ্ছার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এসেছে।
ভারত-রাশিয়ার সম্পর্ক সোভিয়েত আমল থেকে চলছে এবং বিশ্ব রাজনীতি বদলালেও এই সম্পর্ক টিকে আছে। বলা যায়, অন্য রুশ নেতাদের চেয়ে পুতিন এই সম্পর্কের পিছনে বেশি সময় আর শক্তি দিয়েছেন।
আর মোদির কথা যদি বলি, ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে রাশিয়াকে সমালোচনা করার জন্য পশ্চিমের সরকারগুলো তাকে যতই চাপ দিক না কেন, তিনি সবসময় বলেছেন, একমাত্র আলোচনার মাধ্যমেই এই সমস্যার সমাধান করা সম্ভব।
এটাই ছিল ভারতের ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’— মানে মোদি এমন একটা অবস্থানে ছিলেন, তিনি মস্কোর সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখতেন আবার পশ্চিমের সঙ্গেও তার সম্পর্ক ঠিক রাখতেন।
এই কৌশল কাজ করছিল যতক্ষণ না ট্রাম্প আবার হোয়াইট হাউসে এলেন। শুল্ক নিয়ে সমস্যা মেটাতে না পারায় গত কয়েক মাসে ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক একদম খারাপ হয়ে গেছে।
এই পরিস্থিতিতে, পুতিনের সফর মোদির জন্য আরও বেশি জরুরি। কারণ এটা ভারতের নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকে পরীক্ষা করবে। তাকে এখানে সাবধানে কূটনীতিকের মতো কাজ করতে হবে।
মোদি দেশে এবং বাইরে সবার কাছে এটা দেখাতে চাইবেন, তিনি এখনও পুতিনকে বন্ধু হিসেবেই দেখেন এবং ট্রাম্পের কাছে মাথা নত করেননি, যাকে তিনি আগে তার ‘সত্যিকারের বন্ধু’ বলেছিলেন।
কিন্তু ইউরোপের বন্ধুদের কাছ থেকেও তিনি চাপ পেয়েছেন; এই সপ্তাহেই জার্মানি, ফ্রান্স ও ব্রিটেনের রাষ্ট্রদূতরা একটি বড় কাগজে একসঙ্গে একটি লেখা লিখে ইউক্রেন ইস্যুতে রাশিয়ার সমালোচনা করেছেন।
তাই, মোদিকে খেয়াল রাখতে হবে, ভারত-রাশিয়া সম্পর্ক জোরদার হলেও সেটা যেন আমেরিকার সঙ্গে চলতে থাকা বাণিজ্য আলোচনা আর ইউরোপের সঙ্গে তার বন্ধুত্বকে ছাপিয়ে না যায়।
দিল্লির থিংক-ট্যাংক গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভ (জিটিআরআই) বলেছে, ‘ভারতের জন্য চ্যালেঞ্জ হলো কৌশলগত ভারসাম্য- আমেরিকার চাপ আর রাশিয়ার ওপর নির্ভরতার মধ্যে নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বাঁচিয়ে চলা।’
মোদি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে চাইবেন- ভারত আর রাশিয়ার মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো।
বিশ্লেষকরা প্রায়ই বলেন, এই দুই কাছের বন্ধুর মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বহু বছর ধরে তেমন বাড়েনি।
২০২০ সালে তাদের মধ্যে মাত্র ৮.১ বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা ছিল, যা ২০২৫ সালের মার্চ মাস শেষে ৬৮.৭২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এটা মূলত হয়েছে ভারতের রাশিয়া থেকে কম দামে প্রচুর তেল কেনার কারণে। এতে বাণিজ্যের পাল্লা রাশিয়ার দিকে খুব বেশি ঝুঁকে গেছে, আর মোদি এটা ঠিক করতে চাইবেন।
যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর জন্য ভারতীয় কোম্পানিগুলো যেহেতু রাশিয়া থেকে তেল কেনা কমাচ্ছে, তাই দুই দেশ এখন ব্যবসা বাড়ানোর জন্য অন্য দিকে নজর দেবে।

প্রতিরক্ষা হলো সবচেয়ে সহজ উপায়। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (সিপ্রি) তথ্য অনুযায়ী, ভারতের অস্ত্র আমদানি ২০১০-২০১৫ সালের ৭২ শতাংশ থেকে কমে ২০২০-২০২৪ সালের মধ্যে ৩৬ শতাংশে নেমে এসেছে। এর কারণ, ভারত অস্ত্র কেনার উৎস বাড়াচ্ছে আর দেশে বানানোয় জোর দিচ্ছে।
তবে গভীরভাবে দেখলে অন্য ছবি দেখা যায়। ভারতের অনেক অস্ত্রশস্ত্রের প্ল্যাটফর্ম এখনও রাশিয়ার ওপর খুব নির্ভরশীল। তাদের ২৯টি বিমান বাহিনীর স্কোয়াড্রনের মধ্যে অনেকেই রাশিয়ার সুখোই-৩০ জেট ব্যবহার করে।
এ বছরের মে মাসে পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের ছোটখাটো সংঘর্ষে এস-৪০০-এর মতো রুশ এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমের গুরুত্ব বোঝা গেছে, কিন্তু একই সঙ্গে এটাও বোঝা গেছে, দেশের কিছু সমস্যা দ্রুত ঠিক করা দরকার।
খবর আছে, ভারত আরও উন্নত এস-৫০০ সিস্টেম এবং এসইউ-৫৭ ফিফথ-জেনারেশন ফাইটার জেট কিনতে চায়। পাকিস্তান চীনের তৈরি জে-৩৫ স্টিলথ ফাইটার কেনার পর দিল্লিও দ্রুত একটা পাল্লা দেওয়ার মতো জেট পেতে চাইছে।
কিন্তু নিষেধাজ্ঞা আর ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য রাশিয়া ইতিমধ্যেই জরুরি যন্ত্রাংশের অভাবে ভুগছে। শোনা যাচ্ছে, এস-৪০০-এর কিছু চালান দিতে নাকি ২০২৬ পর্যন্ত দেরি হতে পারে। মোদি পুতিনের কাছ থেকে সময়মতো সরবরাহের নিশ্চয়তা চাইবেন।
বাণিজ্যের বিশাল পার্থক্য কমানোর জন্য মোদি চাইবেন রাশিয়ার বাজারে ভারতীয় পণ্যের জায়গা করে নিতে।
জিটিআরআই বলেছে, সাধারণ মানুষ কেনে এমন জিনিসপত্রের বাজার এখনও কম; স্মার্টফোন (৭৫.৯ মিলিয়ন ডলার), চিংড়ি (৭৫.৭ মিলিয়ন ডলার), মাংস (৬৩ মিলিয়ন ডলার) আর পোশাক মাত্র ২০.৯৪ মিলিয়ন ডলার। এর থেকে বোঝা যায়, যতই রাজনীতি বদলাক না কেন, রাশিয়ার খুচরা বাজার আর ইলেকট্রনিক্সের বাজারে ভারতের প্রবেশ খুব সীমিত।
মোদি রাশিয়ার বাজারে ভারতীয় পণ্য ঢুকিয়ে দিতে চান, বিশেষ করে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর যখন মস্কো আবার বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত হবে।
তিনি তেল আর প্রতিরক্ষার ওপর বাণিজ্যের নির্ভরতা কমাতে চাইবেন; এমন একটা চুক্তি চাইবেন, যা রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক জোরালো করবে আর একই সঙ্গে পশ্চিমের সঙ্গেও সম্পর্ক গভীর করার সুযোগ রাখবে।
জিটিআরআই বলেছে, পুতিনের এই সফর পুরোনো দিনের কূটনীতিতে ফিরে যাওয়া নয়। এটা ঝুঁকি, সাপ্লাই চেইন আর অর্থনৈতিক সুরক্ষার ওপর একটা দর কষাকষি। যদি অল্প কিছু হয়, তাহলে তেল আর প্রতিরক্ষা সুরক্ষিত হবে; আর যদি বড় কিছু হয়, তাহলে এই অঞ্চলের অর্থনীতি বদলে যাবে।