× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

এক্সপ্লেইনার

ধনী দেশগুলোতে কর্মমুখী অভিবাসন কেন কমছে?

প্রবা প্রতিবেদন

প্রকাশ : ০২ ডিসেম্বর ২০২৫ ০০:৫০ এএম

আপডেট : ০২ ডিসেম্বর ২০২৫ ০০:৫৯ এএম

যুক্তরাজ্যের লন্ডনে অক্সফোর্ড সার্কাসজুড়ে মানুষ হেঁটে যাচ্ছে, যেখানে কঠোর ভিসার প্রয়োজনীয়তার কারণে কর্মমুখী অভিবাসন কমছে। ছবি: এপি

যুক্তরাজ্যের লন্ডনে অক্সফোর্ড সার্কাসজুড়ে মানুষ হেঁটে যাচ্ছে, যেখানে কঠোর ভিসার প্রয়োজনীয়তার কারণে কর্মমুখী অভিবাসন কমছে। ছবি: এপি

বিশ্ব অর্থনীতি এখন এমন এক ধাপে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে উন্নত দেশগুলোতে শ্রমবাজারের পুরোনো সমীকরণ দ্রুত বদলে যাচ্ছে। একসময় ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, পূর্ব এশিয়া বা ওশেনিয়ার ধনী রাষ্ট্রগুলো দক্ষ-অদক্ষ উভয় ধরনের কর্মীর আকর্ষণীয় গন্তব্য ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেখা যাচ্ছে, এই দেশগুলোতে কর্মমুখী অভিবাসনের প্রবণতা কমছে। আর আগের মতো শ্রমিকরাও সেখানে যেতে আগ্রহী নন। 

এ ধরনের অভিবাসন গত বছর এক-পঞ্চমাংশের বেশি কমে গেছে, যার পেছনে বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক কারণ রয়েছে বলে মনে করছে বিশ্লেষকরা। 

শ্রমবাজার দুর্বল হওয়া এবং অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাজ্যসহ কয়েকটি দেশের ভিসা নীতি কঠোর করার ফলেই এই পতন ঘটেছে, যা অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট বা ওইসিডির নতুন গবেষণায় উঠে এসেছে। 

প্যারিসভিত্তিক ওইসিডিকে উন্নত ও মধ্যম আয়ের গণতান্ত্রিক দেশগুলোর একটি ‘থিঙ্ক ট্যাঙ্ক’ এবং ‘নীতি সমন্বয়কারী ফোরাম’হিসেবেও ধরা হয়, যার সদস্য ৩৮টি দেশ।  

সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে কর্মমুখী অভিবাসন কমেছে। এমনকি ডোনাল্ড ট্রাম্পের হোয়াইট হাউসে প্রত্যাবর্তনের আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে আগমন কমে গিয়েছিল।

বিশ্বব্যাপী কোভিড-১৯ মহামারির পরে অবিচ্ছিন্ন বৃদ্ধির পর গত বছর উন্নত বলে ধরে নেওয়া দেশগুলোতে স্থায়ী কাজের উদ্দেশ্যে আসা মানুষের সংখ্যা ২১ শতাংশ কমে প্রায় ৯ লাখ ৩৪ হাজারে দাঁড়িয়েছে।

অভিবাসন কমার প্রধান কারণ কী?

ওইসিডির আন্তর্জাতিক অভিবাসন বিভাগের প্রধান জ্যাঁ-ক্রিস্টোফ ডুমন্ট এই পতনের জন্য একটি ‘কম অনুকূল’ বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে দায়ী করেছেন।

দুর্বল বৈশ্বিক অর্থনীতি: আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এপ্রিলের প্রতিবেদনে বলেছে, ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধের চাপের কারণে ২০২৫ সালে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস তারা ০.৫ শতাংশ কমিয়ে ২.৮ শতাংশ করেছে। সংস্থার ভাষায়, এই বাণিজ্য উত্তেজনাই এখন বিশ্বের অর্থনীতির গতি কমিয়ে দিচ্ছে।


কঠোর ভিসা নীতি: কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাজ্য গত দুই বছরে কর্মমুখী অভিবাসন সীমিত করার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন দেখা গেছে যুক্তরাজ্যে, যেখানে ২০২৪ সালে মোট অভিবাসন ৪০ শতাংশের বেশি কমেছে।

ইউক্রেনীয়দের আগমন: ডুমন্ট উল্লেখ করেছেন, ইউরোপে সাময়িক সুরক্ষা পাওয়া বিপুল সংখ্যক ইউক্রেনীয় বেশ কয়েকটি খাতে শ্রমিকের ঘাটতি কমিয়েছে। এতে বিদেশি শ্রমিকের চাহিদা কমেছে। ২০২৫ সালের জুন মাস পর্যন্ত, আনুমানিক ৫১ লাখ ইউক্রেনীয় ওইসিডি সদস্য দেশগুলোতে বসবাস করছে, যারা ২০২২ সালে রাশিয়ার পূর্ণ-স্কেলের আক্রমণের পর দেশ ছেড়ে পালিয়ে এসেছিলেন। 

এছাড়াও, নীতিগত অবস্থান পরিবর্তন না হওয়া সত্ত্বেও অধিকাংশ ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে শ্রম অভিবাসন কমে ২০১৯ সালের স্তরের নিচে নেমে এসেছে।

অন্যান্য ধরনের অভিবাসনের চিত্র কেমন?

আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী: ওইসিডি দেশগুলোতে ২০২৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর আগমন ১৩ শতাংশ কমেছে। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ায় কঠোর ভিসা নীতি এর একটি প্রধান কারণ। অভিবাসন জালিয়াতি এবং স্থানীয় আবাসন বাজারের উপর চাপের উদ্বেগের কারণে এই নীতিগুলি কঠোর করা হয়েছে।

মানবিক কারণে অভিবাসন: শিক্ষা ও কর্মমুখী অভিবাসনের বিপরীতে, মানবিক কারণে অভিবাসন বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। গত বছর বাইডেন প্রশাসনের শেষ মাসগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয়ের আবেদন বেড়েছে এবং যুক্তরাজ্যে সম্প্রতি ইইউ দেশগুলো থেকে অবৈধভাবে ছোট নৌকায় আগমন অনেক বেড়েছে।

শ্রমিক ও শিক্ষার্থী অভিবাসন কমলেও মানবিক কারণে অভিবাসনের এই বৃদ্ধি বোঝায়, ২০২৪ সালে উন্নত অর্থনীতিগুলোতে মোট স্থায়ী অভিবাসন পূর্ববর্তী বছরের সর্বোচ্চ শিখর থেকে মাত্র ৪ শতাংশ কমেছে। 

তা সত্ত্বেও ২০২৪ সালে ওইসিডিতে রেকর্ড করা ৬২ লাখ নতুন আগমনকারী প্রাক-মহামারী স্তরের চেয়ে প্রায় ১৫ শতাংশ বেশি। অস্থায়ী কাজের ভিসা প্রায় ২৩ লাখে স্থির ছিল, যা এখনও ২০১৯ সালের স্তরের উপরে রয়েছে।

অভিবাসন সংখ্যায় পরিবর্তন: অতীতের চিত্র

২০২৩ সালে রেকর্ড ৬৫ লাখ মানুষ ওইসিডিভুক্ত দেশগুলোতে বসতি স্থাপন করেছিল। এটি ২০২২ সালের আগের রেকর্ড ৬০ লাখের চেয়ে প্রায় ১০ শতাংশ বেশি, যার মধ্যে যুক্তরাজ্যে ছিল সর্বাধিক।

২০২৩ সালে কানাডা, ফ্রান্স ও জাপানসহ প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ওইসিডি দেশে সর্বোচ্চ সংখ্যক অভিবাসন রেকর্ড করা হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রে ১২ লাখ স্থায়ী আইনি অভিবাসী গেছে, যদিও ডোনাল্ড ট্রাম্প তার ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের ওপর জোর দিয়েছিলেন।

বিশ্বখ্যাত বিনিয়োগ ব্যাংক গোল্ডম্যান স্যাকসের গবেষণা অনুসারে, রাজনৈতিক বিতর্ক সত্ত্বেও ২০২৩ সালে কানাডা, নিউজিল্যান্ড, সুইডেন, জার্মানি ও যুক্তরাজ্যে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির বেশিরভাগটাই ছিল অভিবাসনের কারণে। যুক্তরাষ্ট্রেও অভিবাসন ৪০ লাখের বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে।

ভবিষ্যতের পূর্বাভাস কী?

ওইসিডির আন্তর্জাতিক অভিবাসন বিভাগের প্রধান ডুমন্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন, ২০২৫ সালে ওইসিডির দেশগুলোতে সামগ্রিক অভিবাসন কিছুটা কমতে পারে, তবে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অভিবাসন নীতি সত্ত্বেও এটি ঐতিহাসিকভাবে উচ্চ থাকবে।

তিনি আরও তুলে ধরেছেন, শ্রমবাজারগুলোতে অভিবাসীদের মধ্যে কর্মসংস্থানের হার এখনও শক্তিশালী। উদাহরণস্বরূপ- অন্যদেশে জন্ম নেওয়া কর্মীদের মধ্যে যুক্তরাজ্যে কর্মসংস্থানের হার ছিল প্রায় ৭৬ শতাংশ, যা দেশটিতে জন্ম নেওয়াদের হারের চেয়ে সামান্য বেশি। এর কারণ হিসেবে উচ্চ-দক্ষতার বিষয়টি লক্ষ্য রেখে তৈরি ভিসা স্কিম এবং যুক্তরাজ্যবাসীদের করতে না চাওয়া কাজগুলোতে স্বল্প-দক্ষ অভিবাসীরা ‘ফাঁক পূরণ’ করতে ইচ্ছুক থাকাকে তিনি দায়ী করেছেন।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) অভিবাসন বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ফাবিওলা মিয়েরেস বলেছেন, ‘আমাদের কৃষি, নির্মাণ এবং স্বাস্থ্যসেবার মতো ক্ষেত্রগুলোতে (যেখানে অভিবাসী কর্মীরা বেশি কেন্দ্রীভূত) স্থানীয় শ্রমিকের ঘাটতি সম্পর্কিত কিছু বিষয় নিয়ে নতুন করে ভাবা দরকার।’ 

তিনি মনে করেন, ন্যূনতম মজুরি ও কাজের পরিবেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তিনি আরও যোগ করেন, ‘অভিবাসন সম্ভবত বিশ্বজুড়ে নির্বাচনী রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে থাকবে, বিশেষ করে ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। এটি অনেক ‘আবেগ’ সৃষ্টি করে।’

ওইসিডি কী?

ওইসিডি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৪৮ সালে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে পশ্চিম ইউরোপের পুনর্গঠনের জন্য মার্কিন মার্শাল প্ল্যান সমন্বয় করতে। সেই সময়ে এটি অর্থনৈতিক পরিকল্পনা এবং তার ইউরোপীয় সদস্যদের মধ্যে বাণিজ্য বাধা অপসারণের জন্য একটি প্ল্যাটফর্ম সরবরাহ করেছিল।

১৯৬০-এর দশকে সংস্থাটি তার সদস্য হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডাকে অন্তর্ভুক্ত করে, এবং পরবর্তী দশকগুলোতে এশিয়া প্যাসিফিক, ল্যাটিন আমেরিকা এবং মধ্য ও পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোকে যুক্ত করে। এটি একটি আন্তঃআটলান্টিক গোষ্ঠী থেকে উন্নত ও উদীয়মান দেশগুলোর একটি বৃহত্তর সম্প্রদায়ে পরিণত হয়।

বর্তমানে ওইসিডি অর্থনৈতিক গবেষণা, নীতি বিশ্লেষণ এবং শাসনের মানদণ্ড তৈরির একটি কেন্দ্রীয় কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। এটি শিক্ষা, শ্রমবাজার ও পরিবেশ নীতি নিয়ে তার কাজ ও গবেষণার জন্য ব্যাপকভাবে স্বীকৃত।

২০১৯ সালে ওইসিডি বড় বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর ওপর কমপক্ষে ১৫ শতাংশ কর আরোপের প্রস্তাবের নেতৃত্ব দিয়েছিল। এটি জি২০ দ্বারা ২০২১ সালের অক্টোবরে গৃহীত হয়। এর ফলে গুগল, অ্যামাজন, ফেসবুক, মাইক্রোসফট ও অ্যাপলের মতো বড় আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর জন্য কম করের এখতিয়ারে অফিস স্থাপন করে কর ফাঁকি দেওয়া কঠিন হয়েছে। 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা