প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ২৯ নভেম্বর ২০২৫ ২২:১৯ পিএম
আপডেট : ২৯ নভেম্বর ২০২৫ ২২:২০ পিএম
কলম্বোর উপকণ্ঠে কাদুওয়েলায় ভারী বৃষ্টিপাতের পর একজন ব্যক্তি তার বাড়ির বাইরে বন্যার জলের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন।
দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বিরল ঘূর্ণিঝড়-সৃষ্ট বন্যা ও ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। গত এক সপ্তাহ ধরে মালাক্কা প্রণালীর ওপর সৃষ্টি হওয়া শক্তিশালী ঝড় ও টানা বর্ষণের ফলে ইন্দোনেশিয়া ও শ্রীলঙ্কায় অন্তত ৪৩৫ জনের মৃত্যুর খবর জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এখনও নিখোঁজ আছেন আরও শতাধিক মানুষ।
ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা দ্বীপজুড়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি রয়ে গেছে। দেশটির জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা (বিএনপিবি) শনিবার জানায়,ঘূর্ণিঝড়-পরবর্তী টানা বৃষ্টিতে সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩০৩ জনে দাঁড়িয়েছে। শতাধিক মানুষ এখনও নিখোঁজ। আহত হয়েছেন অন্তত ৫০০ মানুষ।
বিএনপিবি প্রধান সুহারিয়ান্তো জানান, অনেক গ্রাম এখনও উদ্ধারকর্মীদের নাগালের বাইরে। তিনি বলেন, ‘নিখোঁজদের বেশিরভাগকেই এখনও খুঁজে পাওয়া যায়নি। মৃতের সংখ্যা বাড়তে পারে।’
পশ্চিম সুমাত্রা আঞ্চলিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা শুক্রবার রাতে জানায়, শুধু ওই প্রদেশেই মৃতের সংখ্যা ২৩ থেকে বেড়ে ৬১ জনে পৌঁছেছে। নিখোঁজ রয়েছে আরও ৯০ জন। প্রদেশজুড়ে অন্তত ৭৫ হাজার মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে রয়েছেন, আর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ১ লাখ ৬ হাজারের বেশি মানুষ।
উত্তর সুমাত্রায় আরও ১১৬ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হয়েছে। আচেহ প্রদেশে মৃত্যু হয়েছে কমপক্ষে ৩৫ জনের।
মালাক্কা প্রণালীতে সৃষ্ট বিরল ট্রপিক্যাল স্টর্মটি ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ড জুড়ে ব্যাপক বন্যা ডেকে আনে। থাইল্যান্ডে নিহত ১৪৫ এবং মালয়েশিয়ায় দুইজন। তিন দেশ মিলিয়ে নিহত হয়েছেন প্রায় ৪০০ মানুষেরও বেশি।
থাইল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলের আটটি প্রদেশে শুক্রবার রাত পর্যন্ত মৃত্যু বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪৫ জনে। দেশটিতে ৩৫ লাখের বেশি মানুষ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত।
ইন্দোনেশিয়ায় শুক্রবার রাতে বৃষ্টি কমলেও বহু অঞ্চল এখনও জলমগ্ন। নদীর পানি বেড়ে উত্তর সুমাত্রার বহু গ্রাম ভেসে যায়। পাহাড়ি ঢাল ভেঙে মাটির স্রোতে বাড়িঘর চাপা পড়ে। ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলে বহু সড়ক ও সেতু ভেঙে পড়ায় উদ্ধার অভিযান মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সহায়তা পৌঁছাতেও দেরি হচ্ছে।
উত্তর সুমাত্রার সেন্ট্রাল তাপানুলিতে ত্রাণ সরবরাহে এখনও বিমানই প্রধান ভরসা। দূরবর্তী কিছু এলাকা বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে।

ঘূর্ণিঝড় ‘দিতওয়া’ ভারতে অগ্রসর হলেও শ্রীলঙ্কায় রেখে গেছে ভয়ংকর বন্যা ও ভূমিধস। দেশটির দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র (ডিএমসি) শনিবার জানায়, সারা দেশে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩২ জনে দাঁড়িয়েছে; নিখোঁজ রয়েছেন আরও ১৭৬ জন।
ঝড়ের তাণ্ডবে প্রায় ১৫ হাজার বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। ৪৪ হাজারের বেশি মানুষ আশ্রয় নিয়েছে সরকারি অস্থায়ী ক্যাম্পে।
কলম্বোর পূর্বে ১১৫
কিলোমিটার দূরের ক্যান্ডি জেলায় নতুন ভূমিধসের খবর পাওয়া গেছে। প্রধান সড়কের বহু অংশ
এখনও পানির নিচে।
ডিএমসির মহাপরিচালক সম্পথ কোটুওয়েগোডা জানান, সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর হাজারো সদস্যকে ত্রাণ কার্যক্রমে পাঠানো হয়েছে। তিনি বলেন, ‘সামরিক বাহিনীর সহায়তায় উদ্ধার ও ত্রাণ অভিযান চলছে।’
শ্রীলঙ্কা রেড ক্রস জানায়, বহু এলাকায় মানুষ এখনও আটকে রয়েছে। পানি কমার বদলে আরও ফুলে উঠছে কিছু স্থানে।
কেলানি নদী উপচে পড়ায় রাজধানী কলম্বোর পাশের বহু এলাকায় বাধ্যতামূলক সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। শুক্রবার রাতে নদীর পানি বেড়ে শত শত মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বাধ্য করে।
শ্রীলঙ্কা সরকার আন্তর্জাতিক সহায়তার আবেদন জানিয়েছে এবং বিদেশে থাকা লঙ্কানদের নগদ সহায়তা পাঠাতে আহ্বান করেছে। প্রধানমন্ত্রী হারিনি আমরাসুরিয়া কলম্বো–নিয়োজিত কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠক করে সহায়তা চেয়েছেন।
ভারত দ্রুত সাড়া দিয়েছে—দুটি বিমানে ত্রাণ পাঠিয়েছে এবং কলম্বোয় অবস্থানরত ভারতীয় যুদ্ধজাহাজও নিজের মজুদ রেশন দান করেছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি শোক বার্তায় আরও সহায়তা পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
শনিবার রাজধানীতে বৃষ্টিপাত কমলেও দেশের উত্তরাঞ্চলের কিছু এলাকায় এখনও ঘন বৃষ্টি হচ্ছে। ডিএমসি আশঙ্কা করছে—এবারের বন্যা ২০১৬ সালের তুলনায়ও বড় হতে পারে, যখন ৭১ জন নিহত হয়েছিল।
গত বছরের জুনে ভারী বৃষ্টিতে ২৬ জন মারা গিয়েছিল। এবার তার চেয়েও অধিক প্রাণহানি হওয়ায় দেশজুড়ে সতর্কতা ও উদ্ধার তৎপরতা জোরদার করা হয়েছে।
ঝড় কিছুটা দুর্বল হলেও ক্ষতিগ্রস্ত দুই দেশে পরিস্থিতি এখনও সংকটপূর্ণ। নিখোঁজদের সন্ধানে তৎপরতা চলছে এবং আন্তর্জাতিক সহায়তা আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।