সিএনএনকে কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট
প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ২৬ নভেম্বর ২০২৫ ২১:২৭ পিএম
সিএনএনের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো। ২৫ নভেম্বরের ছবি।
ক্যারিবিয়ান ও প্রশান্ত মহাসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তৎপরতা বাড়ার মধ্যে কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট অভিযোগ করেছেন, ভেনেজুয়েলার ওপর ট্রাম্প প্রশাসনের চাপ বাড়ানোর মূল কারণ মাদক দমন নয়, বরং দেশটির তেলে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা।
সিএনএনকে
দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে ভেনেজুয়েলায় বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণিত তেলভাণ্ডার রয়েছে
উল্লেখ করে গুস্তাভো পেত্রো বলেছেন, “তেলই এখানে মূল বিষয়। তাই এটা তেল নিয়ে দরকষাকষি।
আমার বিশ্বাস এটাই ট্রাম্পের যুক্তি। তিনি ভেনেজুয়েলার গণতন্ত্র নিয়ে ভাবছেন না। আর
মাদক কারবার নিয়ে তো নয়ই।”
পেত্রোর
যুক্তি, ভেনেজুয়েলাকে বড় কোনো মাদক উৎপাদক দেশ হিসেবে ধরা হয়নি, এবং বৈশ্বিক মাদক কারবার
তুলনামূলকভাবে খুব সামান্য অংশ ওই দেশ হয়ে যায়।
ডোনাল্ড
ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর থেকেই পেত্রোর সঙ্গে তার
মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। গত এক বছরে ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন নীতি, ইসরায়েলকে সমর্থন
এবং লাতিন আমেরিকার চারদিকে সামরিক তৎপরতা—এসব নিয়ে কড়া সমালোচনা করেছেন কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট।
মঙ্গলবার
(২৫ নভেম্বর) পেত্রো যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর নিজের ইচ্ছা চাপিয়ে
দেওয়ার চেষ্টা করার অভিযোগ করেন, যা তিনি সাম্রাজ্যবাদী আচরণের সঙ্গে তুলনা করেন। তিনি
বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রকে কোনো সাম্রাজ্য ভাবা যায় না; তারা অন্যদের মতোই একটি দেশ।”
এই
বিষয়ে মন্তব্য নিতে সিএনএন হোয়াইট হাউস এবং মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ
করেছে।
আমেরিকার
নাগরিকদের জন্য তার কোনো বার্তা আছে কি না—এমন প্রশ্নে পেত্রো বলেন, “আমার বার্তা সেই একই,
যা যুক্তরাষ্ট্রের স্পেশাল ফোর্সের সদস্যরা শপথে বলে- আপনাদের দায়িত্ব হচ্ছে নিপীড়নের বিরুদ্ধে লড়াই করা। আমি আমেরিকার
রাস্তায় দাঁড়িয়েও ওই কথাই বলেছিলাম, আর সেটার জন্য আমাকেও মূল্য দিতে হয়েছে।”
তিনি
ইঙ্গিত করেন, সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ অধিবেশন শেষে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর তার ভিসা বাতিল
করেছিল। কারণ তিনি প্রকাশ্যে মার্কিন সৈন্যদের আহ্বান জানিয়েছিলেন ট্রাম্পের নির্দেশ
অমান্য করতে এবং “মানবতার দিকে বন্দুক তাক না করতে।”
গত
কয়েক মাসে ট্রাম্প প্রশাসন কলম্বিয়ার এই নেতার বিরুদ্ধে অনেক পদক্ষেপ নিয়েছে।
অক্টোবরে,
মার্কিন ট্রেজারি পেত্রোর ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়, অভিযোগ করে যে তিনি বৈশ্বিক মাদক কারবারে
‘ভূমিকা’ রেখেছেন, যা পেত্রো সরাসরি অস্বীকার করেছেন।
এই
নিষেধাজ্ঞা জারি হয় তার কয়েক দিন পরই, যখন ট্রাম্প ঘোষণা করেন যুক্তরাষ্ট্র কলম্বিয়ায়
সব ধরনের আর্থিক সহায়তা বন্ধ করবে, দাবি করেন- পেত্রো
“তার দেশে মাদক উৎপাদন ঠেকাতে কিছুই করেন না।”
পেত্রো
সিএনএনকে বলেন, তার সরকার ইতিহাসে সর্বাধিক কোকেইন জব্দ করেছে। “এমনকি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে
আমি নিশ্চিত করেছি- ফসল উৎপাদনের যে বৃদ্ধি থেমে আছে, তার চেয়েও বেশি
গতিতে বেড়েছে জব্দের পরিমাণ,” বলেন তিনি।
ট্রাম্প
এগুলো স্বীকার করেন না কেন—এমন প্রশ্নে পেত্রো বলেন, “কারণ অহংকার। কারণ
তিনি আমাকে এক ধরনের বিদ্রোহী গুন্ডা, সন্ত্রাসী ভাবেন; শুধু আমি এম-১৯–এর সদস্য ছিলাম বলে।” এম-১৯ ছিল সত্তর ও আশির দশকের একটি কলম্বিয়ার গেরিলা সংগঠন।
পেত্রো
আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র তাকে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর সঙ্গে তুলনা
করছে—এমনই তার বিশ্বাস।
এই
মন্তব্যগুলো এমন এক সময় এলো, যখন যুক্তরাষ্ট্র ‘কার্টেল দে লস সোলেস’ নামের একটি কথিত
মাদক চক্রকে বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করেছে, যাকে মার্কিন দাবি অনুযায়ী মাদুরো নেতৃত্ব দেন। ভেনেজুয়েলা এই দাবি
অস্বীকার করেছে। আর বিশেষজ্ঞদের মতে,
ওই শব্দগুচ্ছ বরং দুর্নীতিগ্রস্ত
সরকারি কর্মকর্তাদের বোঝায়, কোনো সংগঠিত অপরাধচক্রকে নয়।
মাদুরোর
সমস্যা গণতন্ত্র নিয়ে—এ কথা স্বীকার করলেও, মাদক কারবারের সঙ্গে তার
যোগসাজশ নিয়ে পেত্রো ততটা নিশ্চিত নন।
তিনি
সিএনএনকে বলেন, “মাদুরোর সমস্যার নাম গণতন্ত্র… গণতন্ত্রের
অভাব।” তিনি যোগ করেন, “কোনো কলম্বিয়ান তদন্ত… আমাদের
সামনে মাদুরোর সঙ্গে কলম্বিয়ার মাদক কারবারের কোনো সম্পর্ক দেখায়নি।”
জাতিসংঘের
মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) অনুসারে, ভেনেজুয়েলা কোকা উৎপাদক দেশ নয়। বিশ্বে
উৎপাদিত ৩ হাজার ৭০০ টন কোকা পাতার মধ্যে ২ হাজার ৫০০ টনের বেশি আসে কলম্বিয়া থেকে।
ভেনেজুয়েলা এই মানচিত্রে নেই। ইউএনওডিসি বলছে, “কলম্বিয়ার বেশিরভাগ কোকেইন প্রশান্ত
মহাসাগরীয় উপকূল ধরে উত্তরমুখী পাচার হয়।”
যুক্তরাষ্ট্রের
মাদকদ্রব্য সম্পর্কিত আইন প্রয়োগ ও নিয়ন্ত্রণ সংস্থা (ডিইএ) গবেষকরা তাদের গত মার্চের
প্রতিবেদনেও একই তথ্য দেন—যুক্তরাষ্ট্রে জব্দ হওয়া ৮৪ শতাংশ কোকেইন আসে
কলম্বিয়া থেকে।
কলম্বিয়ার
সাপ্তাহিক সংবাদের অনুষ্ঠান ‘নোতিসিয়াস কারাকোল’ এক প্রতিবেদনে দাবি করে, কলম্বিয়ার কর্মকর্তাদের সঙ্গে এখন নিষ্ক্রিয় বিদ্রোহী সংগঠন ফার্কের
ভিন্নমতাবলম্বীদের যোগসূত্র রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, জ্যেষ্ঠ সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা
সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে গোপন তথ্য শেয়ার করেছেন এবং অস্ত্র সংগ্রহ ও নজরদারি এড়ানোর
পরামর্শ দিয়েছেন।
পেত্রো
এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন, তবে সিএনএনকে মঙ্গলবার স্বীকার করেন, কর্মকর্তাদের সঙ্গে মাদক কারবারিদের সম্পর্ক বহুদিন ধরেই ছিল, তার
(পেত্রো) ক্ষমতায় আসার আগেই।
মার্কিন
পররাষ্ট্র দপ্তরের এক মুখপাত্র বলেছেন, তারা সাম্প্রতিক অভিযোগ সম্পর্কে অবগত এবং পেত্রো
ও কলম্বিয়ার অন্যান্য প্রতিষ্ঠানকে আহ্বান জানিয়েছেন- “এই অভিযোগগুলো পূর্ণাঙ্গভাবে
তদন্ত” করে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে।
দীর্ঘদিন
ধরে নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা ইস্যুতে দক্ষিণ আমেরিকায় ওয়াশিংটনের সবচেয়ে বিশ্বস্ত মিত্র
হলো কলম্বিয়া। ২০২২ সালে বাইডেন প্রশাসন দেশটিকে ন্যাটোর বাইরে প্রধান মিত্র হিসেবে
ঘোষণা করে। আর শীর্ষ পর্যায়ে সাম্প্রতিক উত্তেজনা সত্ত্বেও, যুক্তরাষ্ট্র-কলম্বিয়া
সম্পর্ক অটুট রয়েছে।
মার্কিন
পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও প্রকাশ্যে বলেছেন, প্রশাসনের সমস্যাটা পেত্রোকে কেন্দ্র
করে, কলম্বিয়ার প্রতিষ্ঠানগুলোকে নয়।
রুবিও
বলেন, “কলম্বিয়ার জনগণ, তাদের অর্থনীতি, রাজনীতির মূলধারা এবং বিশেষত তাদের প্রতিরক্ষা
প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক দৃঢ় এবং দীর্ঘস্থায়ী; আর পেত্রো প্রেসিডেন্ট না থাকলেও এগুলো ঠিকই টিকে থাকবে।”