× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

জাতিসংঘের ‘গাজা পরিকল্পনা’ অনুমোদন

শান্তি ফিরবে, নাকি থাকবে অনিশ্চয়তা?

প্রবা প্রতিবেদন

প্রকাশ : ১৮ নভেম্বর ২০২৫ ২১:০৩ পিএম

আপডেট : ১৮ নভেম্বর ২০২৫ ২১:০৫ পিএম

ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব গত ১০ অক্টোবর কার্যকর হওয়ার পর থেকে গাজায় একটু একটু করে গুছিয়ে উঠতে শুরু করেছে ফিলিস্তিনিরা।

ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব গত ১০ অক্টোবর কার্যকর হওয়ার পর থেকে গাজায় একটু একটু করে গুছিয়ে উঠতে শুরু করেছে ফিলিস্তিনিরা।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গাজা যুদ্ধ-পরবর্তী পরিকল্পনাকে আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দিয়েছে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ। সোমবার অনুষ্ঠিত ভোটে ১৫ সদস্যের পরিষদের ১৩টি দেশ পক্ষে ভোট দেয় এবং রাশিয়া ও চীন বিরত থাকে। দীর্ঘ দুই বছরের অচলাবস্থা ভেঙে এ সিদ্ধান্ত মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কূটনৈতিক গতি সঞ্চারের ইঙ্গিত দিলেও এর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয় রয়ে গেছে ব্যাপকভাবে।

নিরাপত্তা পরিষদে মার্কিন দূত মাইক ওয়াল্টজ বলেন, এ প্রস্তাব “ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনিদের জন্য সমানভাবে একটি নতুন পথচলার সুযোগ তৈরি করছে।” এতে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় একটি বহুজাতিক বাহিনী মোতায়েনের পরিকল্পনা রয়েছে, পাশাপাশি সংস্কার-পরবর্তী ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের অধীনে ভবিষ্যৎ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

ইসরায়েলের আপত্তি, তবু ভোটে সমর্থন

রেজুলেশনটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো একটি সম্ভাব্য স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের উল্লেখ। ট্রাম্প প্রশাসন সমর্থন আদায়ের জন্য আরব-মুসলিম দেশগুলোর চাপে এই ভাষা অন্তর্ভুক্ত করেছে। তবে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, “ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা ইসরায়েল কোনোভাবেই বদলায়নি।”

ফলে ইসরায়েল নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদিত পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সহযোগিতা করবে কি না—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

জাতিসংঘের রায় ঘিরে ইসরায়েলে রাজনৈতিক চাপও বাড়ছে। নেতানিয়াহুর ডানপন্থী জোট ক্ষোভ প্রকাশ করেছে; অন্যদিকে বিরোধী নেতা অ্যাভিগডর লিবারম্যান বলেছেন, আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েন ইসরায়েলি সার্বভৌমত্বের প্রতি হুমকি এবং এটি “ব্রিটিশ ম্যান্ডেট আমলে ফিরে যাওয়ার শামিল।”

হামাসের প্রত্যাখ্যান: ‘আন্তর্জাতিক অভিভাবকত্ব মেনে নেওয়া হবে না’

গাজা নিয়ন্ত্রণকারী হামাস নিরাপত্তা পরিষদের রেজুলেশনকে প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, এটি গাজায় “আন্তর্জাতিক অভিভাবকত্ব আরোপের চেষ্টা” এবং ফিলিস্তিনিদের রাজনৈতিক ও মানবাধিকার দাবির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সংগঠনটি আবারও স্পষ্ট করে জানিয়েছে, তারা অস্ত্র সমর্পণ করবে না।

ট্রাম্পের ২০ দফা পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, যারা অস্ত্র ত্যাগ করে শান্তিতে বসবাসে সম্মত হবে, তাদের জন্য সাধারণ ক্ষমা বিবেচনা করা হবে। তবে পরিকল্পনাটি স্পষ্টভাবে হামাসের নির্বাসন বা বিলুপ্তির কথা উল্লেখ করে না। এই অস্পষ্টতা দুই পক্ষের মধ্যেই অবিশ্বাস বাড়িয়েছে।

আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী (আইএসএফ): ধারণা পরিষ্কার নয়

নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী—যাকে আইএসএফ বলা হচ্ছে—কীভাবে কাজ করবে, কোন দেশ বাহিনী পাঠাবে, সেক্ষেত্রে অস্পষ্টতা রয়ে গেছে। আর এটি জাতিসংঘের নীল হেলমেট মিশন নয়; বরং যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত বহুজাতিক বাহিনী, যা নিজস্ব নিয়মে কাজ করবে।

বিশ্লেষকদের মতে, বাহিনীর ম্যান্ডেটে হামাসসহ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে নিরস্ত্র করার কথা থাকলেও কোনো দেশই এমন সংঘাতময় অঞ্চলে সেনা পাঠাতে আগ্রহী নয়। হামাস স্পষ্ট জানিয়েছে—ওরা এ ধরনের বাহিনীকে নিরস্ত্রীকরণের দায়িত্ব নিতে দেবে না এবং একে নিরপেক্ষতার পরিপন্থী মনে করে। 

গাজার মধ্যাঞ্চলে আগুনের পাশে বসে আছে ফিলিস্তিনি শিশুরা। ১৭ নভেম্বর, রয়টার্সের ছবি  

গাজায় শঙ্কা ও সন্দেহ

গাজার ভেতরে রেজুলেশনকে স্বাগত জানানো তো দূরের কথা, তাদের প্রতিক্রিয়া বেশ নেতিবাচক। সাধারণ মানুষের প্রশ্ন—এই বাহিনী কি সত্যিই তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে, নাকি নতুন ধরনের দখলদারিত্ব তৈরি করবে?

গাজার রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, রেজুলেশন মানবিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও দমনমূলক কাঠামোর ওপর অধিক জোর দেওয়া হয়েছে।

গাজাবাসী এক ব্যবসায়ী ফোনে আল-জাজিরাকে বলেন, “আমরা চাই আন্তর্জাতিক বাহিনী আসুক- যদি তারা ইসরায়েলকে পুরোপুরি প্রত্যাহারে বাধ্য করতে পারে। কিন্তু অন্য এক দখলদারিত্বে ঢুকতে চাই না।”

আরব বিশ্ব ও ইউরোপীয় দেশগুলোর অবস্থান

আরব দেশগুলোর পক্ষে কথা বলা আলজেরিয়া বলেছে, রেজুলেশনটিতে সংশোধন এনে “ফিলিস্তিনি আত্মনিয়ন্ত্রণের বীজ বপন করা হয়েছে।” তারা রেজুলেশনটির প্রস্তাবিত যুদ্ধবিরতি ও পুনর্গঠনের ধাপগুলোকে সমর্থন করেছে।

ইন্দোনেশিয়া, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ কোরিয়া, ফ্রান্সসহ অনেক দেশ পরিকল্পনাটিকে শান্তির পথে অগ্রগতি হিসেবে স্বাগত জানিয়েছে।

যুক্তরাজ্য বলেছে- গাজায় সব প্রবেশপথ খুলে মানবিক সহায়তা অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করা এখন জরুরি। জার্মানি জানিয়েছে- গাজা পুনর্গঠনে তারা ‘গঠনমূলক ভূমিকা’ পালন করতে প্রস্তুত।

ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ বলেছে, শান্তির পথে ‘প্রথম ধাপ’

ম্যানিলায় এক সংবাদ সম্মেলনে ফিলিস্তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভার্সেন শাহিন বলেন, “এটি দীর্ঘ শান্তির পথে প্রথম ধাপ। যুদ্ধবিরতি ছাড়া আমরা কিছুই করতে পারতাম না।”

তবে তিনি সতর্ক করেছেন- গাজা থেকে ‘আল-মাজদ ইউরোপ’ নামের সংগঠনের বিতর্কিত বিমানযাত্রা ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক স্থানান্তরের অংশ হতে পারে, যা তিনি ‘জাতিগত নিধনের কৌশল’ বলে অভিহিত করেন।

রাশিয়া ও চীনের অস্বস্তি

রেজুলেশনে ভোটদানে বিরত থাকা রাশিয়ার প্রতিনিধি ভ্যাসিলি নেবেনজিয়া বলেন, আইএসএফের কাঠামো “ঔপনিবেশিক যুগের মতো,” যা ফিলিস্তিনিদের মতামতকে উপেক্ষা করে। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, আন্তর্জাতিক বাহিনী রামাল্লাহভিত্তিক ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় না করেই কাজ করতে পারে, যা গাজা ও পশ্চিম তীরের ভৌগোলিক বিভাজনকে আরও মজবুত করবে।

মাঠের বাস্তবতা: ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত

গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও ইসরায়েল এখনও মোট অঞ্চলটির ৫৩ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে রেখেছে। স্থানীয় সূত্র বলছে, খান ইউনিসের পূর্বাংশে হলুদ রেখার বাইরে নতুন করে বিমান হামলা হয়েছে; গাজা সিটির পূর্বাঞ্চলেও অভিযানের খবর পাওয়া গেছে।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে এ পর্যন্ত ইসরায়েলের হামলায় গাজায় প্রাণ হারিয়েছে অন্তত ৬৯ হাজার ৪০০ জন মানুষ। হামলায় আহত হয়েছেন ১ লাখ ৭০ হাজারের বেশি। অপরদিকে ইসরায়েলে হামাসের হামলায় নিহত হন ১,১৩৯ জন।

ট্রাম্পের উদযাপন

জাতিসংঘ ভোটের ফল ঘোষণার পর ট্রাম্প সোশাল মিডিয়ায় লেখেন, “এটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত।” তিনি জানান, শিগগিরই “বোর্ড অব পিস”-এ কারা থাকবেন, তা ঘোষণা করা হবে।

অনিশ্চয়তায় ঘেরা এক শান্তির রূপরেখা

জাতিসংঘের এই রেজুলেশন যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় নতুন কূটনৈতিক সমীকরণ তৈরি করলেও এর বাস্তবায়ন বিপরীতমুখী রাজনৈতিক অবস্থান, নিরাপত্তা জটিলতা এবং ইসরায়েল-হামাসের গভীর অবিশ্বাসের কারণে কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

শান্তির পথে এটি নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে এটি কার্যকর হবে কি না—তা নির্ভর করবে আন্তর্জাতিক বাহিনীর গঠন, ইসরায়েল ও হামাসের প্রতিক্রিয়া, এবং মানবিক পুনরুদ্ধারের বাস্তব অগ্রগতির ওপর। বর্তমান চিত্রে পরিষ্কার—মধ্যপ্রাচ্যে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলেও, সামনে পথ যথেষ্ট দীর্ঘ ও অনিশ্চয়তায় ভরা।

 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা