প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ১৩ নভেম্বর ২০২৫ ২২:০০ পিএম
আপডেট : ১৩ নভেম্বর ২০২৫ ২২:০৪ পিএম
কু ক্লাক্স ক্ল্যান প্যারেড। ছবি: সংগৃহীত
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকেই শুরু, কিন্তু সেখান থেকেই জন্ম নিল এক দানবীয় জনপ্রিয়তা। যুক্তরাষ্ট্রের বর্ণবাদী সংগঠন কু ক্লাক্স ক্ল্যান ১৯২০-এর দশকে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। আশ্চর্যজনকভাবে, সেই উত্থানের পেছনে ভূমিকা ছিল সংবাদপত্রেরই।
কু ক্লাক্স কালচার বইয়ের লেখক ইতিহাসবিদ ড. ফেলিক্স হারকোর্ট বলেন, এটা ছিল ‘পারস্পরিক লাভের সম্পর্ক’, যেখানে ক্ল্যান পায় সদস্য, আর সংবাদপত্র পায় পাঠক ও বিক্রি।
সংবাদপত্রের আলোতেই
ঘৃণার উত্থান
১৯২১ সালে নিউ ইয়র্ক ওয়ার্ল্ড তিন সপ্তাহব্যাপী ধারাবাহিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
চালায়। তাদের প্রথম পাতায় প্রতিদিন প্রকাশিত হয় কু ক্লাক্স ক্ল্যানের সহিংসতা, গোপনীয়তা
ও ঘৃণার আদর্শের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা। এতে কংগ্রেস পর্যন্ত গড়ায় আলোচনা, পত্রিকার
সার্কুলেশন বেড়ে যায় এক লাখেরও বেশি, এবং প্রতিবেদনটি ছড়িয়ে পড়ে যুক্তরাষ্ট্রের ১৭টি
বড় দৈনিকে।
কিন্তু অনিচ্ছায়ই সেই প্রচার ক্ল্যানকে আরও পরিচিত করে তোলে। অনেকে প্রথমবার সংগঠনটির নাম শুনে কৌতূহলবশত যোগ দেয়। ওয়ার্ল্ড পত্রিকার প্রতিবেদনে প্রকাশিত সদস্যপদ ফরম কেটে রেখে আবেদনপত্র হিসেবে পাঠানো হয়েছিল; ঘৃণার প্রচার এভাবেই জনপ্রিয়তার রূপ নেয়।
মিডিয়া কাভারেজে
নাটকীয়তা
ড. হারকোর্টের মতে, ১৯২০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদপত্রে শুরু হয় `ব্যালিহু’ বা
চটকদার সাংবাদিকতার যুগ। ক্ল্যান সেই ধারা ব্যবহার করে নিজেদের আলোচনায় রাখে। তারা
জানত, বড় মিছিল, আগুনে জ্বলন্ত ক্রস, বা বিমান থেকে ঝুলন্ত প্রতীক- সবই প্রথম পাতার ছবি হতে পারে। তাই তারা নিজেরাই এমন আয়োজন সাজাত,
সাংবাদিকদের আমন্ত্রণ জানাত, আবার দূরেও রাখত যেন `রহস্য’ অক্ষুণ্ণ থাকে।
সংবাদমাধ্যমকে
নিয়ন্ত্রণের কৌশল
প্রথমদিকে অনেক সংবাদপত্র ক্ল্যানবিরোধী অবস্থান নিলেও, পরে ক্ল্যান তাদের প্রভাব খাটাতে
শুরু করে। আফ্রিকান-আমেরিকান পত্রিকা দ্য মেসেঞ্জার-এর সম্পাদকের কাছে পাঠানো
হয় কাটা হাতের টুকরো, অন্যদিকে বড় বড় দৈনিকে বিজ্ঞাপন দেওয়ার আশ্বাসে তাদের মন জয় করার
চেষ্টা চলে।
এই বিজ্ঞাপন ও বয়কট-কৌশল কার্যকর হয়। শ্বেতাঙ্গ মূলধারার অনেক পত্রিকা নিরপেক্ষতার
নামে ক্ল্যানকে স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য সংগঠন হিসেবে উপস্থাপন করে। হারকোর্ট বলেন,
“সংবাদপত্র মনে করেছিল তারা নিরপেক্ষ, কিন্তু আসলে তারা ঘৃণাকে স্বাভাবিক করে তুলছিল।”
বিরোধিতার কণ্ঠ ও প্রতিবাদী প্রেস
ক্যাথলিক, ইহুদি ও আফ্রিকান-আমেরিকান সংবাদপত্রগুলো ক্ল্যানবিরোধী প্রচার চালায়। কেউ
কেউ বিশ্বাস করত, ক্ল্যানকে উপেক্ষা করাই উত্তম; আবার কেউ মনে করত, নীরবতা মানে আত্মসমর্পণ।
পিটসবার্গ কুরিয়ার এবং অন্য অনেক কৃষ্ণাঙ্গ পত্রিকা ক্ল্যানের সহিংসতা, দাঙ্গা
ও হত্যার খবর প্রকাশ করে সেই ঘৃণার মুখোশ উন্মোচন করে।
উপহাসের ফাঁদে প্রভাবহীন ব্যঙ্গচিত্র
সেই সময়ের অনেক রাজনৈতিক কার্টুনে ক্ল্যানকে বিদ্রূপ করা হলেও, তাতে সদস্যসংখ্যা কমেনি।
বরং ক্ল্যান সদস্যরা ভাবত, তারা সঠিক পথে আছে, কারণ শত্রুরা তাদের আক্রমণ করছে। এই
আত্মতুষ্টি তাদের আরও শক্ত করে তোলে।
কু ক্লাক্স ক্ল্যানের
নিজস্ব সংবাদমাধ্যম
১৯২৫ সালের মধ্যে ক্ল্যান গড়ে তোলে নিজস্ব সংবাদসংস্থা দ্য কুরিয়ার ; যার দাবিকৃত
পাঠকসংখ্যা ছিল ১৫ লাখ। পত্রিকাটিতে স্থানীয় ও জাতীয় খবরের পাশাপাশি রেসিপি, ধাঁধা,
এমনকি ‘ফায়ারি ক্রসওয়ার্ড’ নামে পাজলও প্রকাশিত হতো। সব খবরই পরিবেশিত হতো বর্ণবাদী
দৃষ্টিভঙ্গিতে।
পতন, কিন্তু শেষ নয়
১৯২০-এর দশকের মাঝামাঝি একাধিক কেলেঙ্কারি-
বিশেষ করে ইন্ডিয়ানার এক ক্ল্যান
নেতার ধর্ষণ-সংক্রান্ত কাণ্ড
সংগঠনটিকে দুর্বল করে। তবে হারকোর্ট
মনে করেন, “ক্ল্যান হারায় সংগঠন, কিন্তু টিকে থাকে মতবাদ।” ১৯২৪ সালের অভিবাসন আইন
পাসের পর সংগঠনটি যেমন ভেঙে পড়ে, তেমনি তার সমর্থকরা সমাজের নানা স্তরে থেকে যায়।
ইতিহাসের ভুল পুনরাবৃত্তি
হারকোর্ট বলেন, সংবাদমাধ্যম এই অভিজ্ঞতা থেকে কোনো শিক্ষা নেয়নি। অনেক পত্রিকা পরবর্তীকালে
নিজেদের পুরস্কারজয়ী অনুসন্ধান নিয়ে গর্ব করেছে, কিন্তু ভুলে গেছে তাদের প্রতিবেদনই একসময় ঘৃণার আগুনকে জ্বালানি জুগিয়েছিল।
“ক্ল্যান ও সংবাদমাধ্যমের সম্পর্ক ছিল পরস্পর শোষণ ও স্বার্থের, যেখানে উভয়েই লাভবান হয়, সমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়,” বলেন হারকোর্ট।
আজও প্রাসঙ্গিক
সেই প্রশ্ন
এক শতাব্দী পরও প্রশ্নটি একই-
ঘৃণার রাজনীতি নিয়ে সংবাদমাধ্যমের
ভূমিকা কী হওয়া উচিত? অতিরিক্ত প্রচার কি উল্টো ঘৃণাকে বৈধ্যতা দেয়? নাকি নীরবতা আরও
ভয়াবহ?
১৯২০-এর দশকের এই বিতর্ক আজও যুক্তরাষ্ট্রের বর্ণবাদ, কিংবা অন্য দেশে ধর্ম ও জাতিগত
রাজনীতির আলোচনায় ফিরে আসে।