বিশ্লেষণ
প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ১২ নভেম্বর ২০২৫ ২২:৪১ পিএম
আপডেট : ১২ নভেম্বর ২০২৫ ২৩:০৩ পিএম
ব্রাজিলের অর্থমন্ত্রী ফেরনান্দো হাদাদ, জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন সংস্থা (ইউএনএফসিসিসি)-এর নির্বাহী সচিব সাইমন স্টিল এবং ব্রাজিলের কপ৩০ সভাপতি আন্দ্রে আরানহা কোরেয়া দো লাগো ব্রাসিলিয়ায় কপ৩০ এর প্রস্তুতিমূলক বৈঠকে বক্তব্য দিচ্ছেন। ১৩ অক্টোবর, ২০২৫। ছবি: রয়টার্স
কনফারেন্স অব দ্য পার্টিস বা কপ নামে পরিচিত জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলনের ৩০তম আসর ১০ থেকে ২১ নভেম্বর ব্রাজিলের বেলেমে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। কপ৩০ বৈশ্বিক জলবায়ু কূটনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হতে যাচ্ছে।
কারণ, এটি শুধু জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার প্রতিশ্রুতির বিষয় নয়; বরং এটি এখন বিশ্ব রাজনীতি, অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও ন্যায্যতার এক পরীক্ষার ক্ষণ। এক অনিশ্চিত বৈশ্বিক পরিস্থিতির মধ্যে সেখানে প্রতিটি দেশ তাদের অবস্থান পুনর্নির্ধারণ করবে।
জলবায়ু নেতৃত্বে
চীনের উচ্চাকাঙ্ক্ষা
চীন এখন পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তি ও নবায়নযোগ্য শক্তিকে জাতীয় উন্নয়নের মূল হাতিয়ার হিসেবে
দেখছে। বৈদ্যুতিক গাড়ি, সৌর ও বায়ু শক্তি, ব্যাটারি উৎপাদন- সবকিছুই তাদের শিল্প পরিকল্পনার কেন্দ্রে। ‘বিশ্বের প্রধান ইলেকট্রোস্টেট’
বা সবুজ প্রযুক্তির মহাশক্তি হওয়ার লক্ষ্যেই এই প্রচেষ্টা। তবে চীনের জন্য পথটা পুরোপুরি
সহজ নয়। নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে লাভ কমে যাওয়া, বিদেশে প্রযুক্তি স্থানান্তর নিয়ে
বিতর্ক, এবং ব্যাটারি রপ্তানিতে নিয়ন্ত্রণ-
এসবই নতুন চ্যালেঞ্জ। কপ৩০-এ চীন
তার সাফল্য তুলে ধরবে, কিন্তু একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠবে- এই নেতৃত্ব কতটা বাস্তব ও টেকসই?
যুক্তরাষ্ট্র ও জলবায়ু
ন্যায়ের সংকট
যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান এখন জলবায়ু ন্যায়ের বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছে। ট্রাম্প প্রশাসন বৈশ্বিক
সবুজ অর্থনীতির নেতৃত্ব না দিয়ে বরং এর বিরোধী ভূমিকা নিচ্ছে এবং অন্য দেশগুলোকে ডিকার্বনাইজেশন
বা কার্বন-মুক্ত উন্নয়ন থেকে নিরুৎসাহিত করছে। অথচ, জলবায়ু বিপর্যয়ে আক্রান্ত দেশগুলোর
জন্য এটি জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন।
ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ল্যানসেটের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাপজনিত মৃত্যুর
হার ১৯৯০ দশকের তুলনায় ৬৩ শতাংশ বেড়েছে; বছরে প্রায় সাড়ে ৫ লাখ মানুষ মারা যাচ্ছে।
কপ২৮-এ যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল-
ফসিল জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো, তা এখন বাস্তবায়নের অপেক্ষায়। কপ৩০ এই প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিয়ে যেতে
পারে, যদি ‘বেলেম অ্যাকশন মেকানিজম’ নামে নতুন কাঠামো গৃহীত হয়, যা তেল, গ্যাস ও কয়লা
থেকে দ্রুত, ন্যায্য ও অর্থায়িত রূপান্তর নিশ্চিত করবে।
ব্রাজিলের বন সংরক্ষণ
অভিযান
আয়োজক দেশ হিসেবে ব্রাজিলের মূল বার্তা হবে-
বন রক্ষা ছাড়া জলবায়ু রক্ষা সম্ভব
নয়। প্রেসিডেন্ট লুলা দা সিলভার নেতৃত্বে ২০২১ সালের পর থেকে আমাজন ও সের্রাডো অঞ্চলে
বন ধ্বংস কিছুটা কমেছে। সরকার ‘ট্রপিকাল ফরেস্টস ফরএভার ফ্যাসিলিটি’ নামে একটি আন্তর্জাতিক
তহবিল গঠন করেছে, যার লক্ষ্য হলো ট্রপিকাল বনগুলোকে রক্ষা করা। তবে এই উদ্যোগ এখনও
অর্থসংকটে ভুগছে এবং মাঠ পর্যায়ের বাস্তবায়নে নানা বাধা আছে। অবৈধ কাঠ ও খনির ব্যবসা,
স্থানীয় রাজনীতির প্রভাব এবং অপরাধচক্রের সম্পৃক্ততা পরিস্থিতি জটিল করে তুলেছে।

ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা, জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এবং অন্যান্য প্রতিনিধিরা ২০২৫ সালের ৭ নভেম্বর বেলেমে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘ জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলন- কপ৩০-এর পূর্ববর্তী বেলেম ক্লাইমেট সামিটে পারিবারিক ছবির জন্য হাত উঁচিয়ে পোজ দিচ্ছেন। ছবি: রয়টার্স
বাস্তব চুক্তিই মূল
লক্ষ্য
কপ৩০ হলো প্যারিস চুক্তির দশম বর্ষপূর্তি। এবার দেশগুলো তৃতীয়বারের মতো তাদের গ্রিনহাউস
গ্যাস নিঃসরণ কমানোর অঙ্গীকার পুনর্নবায়ন করবে। কিন্তু বৈশ্বিক পরিস্থিতি কঠিন- যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি থেকে সরে গেছে, ইউরোপ জ্বালানি সংকটে, আর অর্থনীতি
এখন প্রতিযোগিতা বনাম সবুজ রূপান্তরের দ্বিধায়। তবুও, অনেকে আশাবাদী যে কপ৩০ থেকে বাস্তব
বিনিয়োগ ও সহযোগিতা বাড়বে। এনার্জি সিকিউরিটি বাড়ায় এবং নবায়নযোগ্য শক্তির দাম কম হওয়ায়
তা অনেক দেশের কাছে আকর্ষণীয় বিকল্প।
সামাজে সেবা-সহায়তা
অভিযোজনে গুরুত্বপূর্ণ
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত সমাজে যত্ন-সেবা ও সামাজিক সহায়তা ব্যবস্থা অত্যন্ত
গুরুত্বপূর্ণ। শিশু যত্ন, প্রবীণ যত্ন ও স্বাস্থ্য অবকাঠামোকে জলবায়ু অভিযোজন কৌশলে
অন্তর্ভুক্ত করা হলে পরিবার ও সম্প্রদায় আরও সহনশীল হতে পারবে। বর্তমানে এই খাতের ঘাটতি
নারীদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে এবং তাদের অর্থনৈতিক ভূমিকা সীমিত করছে। কপ৩০ এই বিষয়টিকে
জলবায়ু আলোচনায় আনতে পারলে
তা হবে একটি মানবকেন্দ্রিক রূপান্তরের
সূচনা।
কপ: নতুন যুগের জাতিসংঘ
সভা
যেমন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ একসময় বৈশ্বিক কূটনীতির প্রতীক ছিল, এখন কপ সেই ভূমিকা নিচ্ছে।
এখানে ছোট দ্বীপ রাষ্ট্র থেকে শুরু করে বৃহৎ কার্বন নিঃসরণকারী দেশ- সবাই সমানভাবে কথা বলার সুযোগ পায়। বেসরকারি খাতও এখন এই আলোচনার
অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিশেষ করে নবায়নযোগ্য শক্তি, প্রযুক্তি ও অর্থনীতির বড় কোম্পানিগুলো
কপ আসরে অংশ নিচ্ছে। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের অনুপস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসাগুলোর
প্রতিনিধিত্ব কম থাকবে।
অর্থায়নের সংকট ও
ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা
কপ৩০-এর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন-
অর্থ কোথা থেকে আসবে? কপ২৯-এ বার্ষিক
৩০০ বিলিয়ন ডলারের জলবায়ু তহবিলের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে সেই অর্থ
এখনো আসেনি। ব্রাজিল নিজস্ব তহবিল ‘ট্রপিকাল ফরেস্ট ফরএভার ফ্যাসিলিটি’ থেকে ২৫ বিলিয়ন
ডলার সংগ্রহের লক্ষ্য নিয়েছে। তবে বৈশ্বিক অর্থনীতি দুর্বল, এবং নতুন তহবিল নিয়ে সমালোচনা
বাড়ছে।
সবশেষে, কপ৩০-এর সাফল্য মাপা হবে এই প্রশ্নে-
বিশ্ব কি আরেকটি প্রতিশ্রুতিমূলক
সম্মেলন করবে, নাকি বাস্তব সমাধানের দিকে এগোবে? প্যারিস চুক্তির মতো আরেকটি ‘প্রতিশ্রুতির
উৎসব’ নাকি সত্যিকারের রূপান্তরের সূচনা-
সেটিই এখন দেখার বিষয়।
নতুন অধ্যায় নাকি বড় ধাক্কা
কপ৩০ একদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের
ইতিহাসে একটি মাইলফলক, অন্যদিকে এটি একটি পরীক্ষার মুহূর্ত। চীনের প্রযুক্তি নেতৃত্ব,
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অবস্থান, ব্রাজিলের বন সংরক্ষণ প্রচেষ্টা, এবং সামাজিক যত্ন
ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্তি-
সবকিছু মিলেই নির্ধারণ করবে ভবিষ্যতের
জলবায়ু নীতি কোন পথে যাবে।
বেলেমের এই সম্মেলন সফল হলে তা হবে এক নতুন অধ্যায়- যেখানে
জলবায়ু নীতি শুধু পরিবেশ নয়, বরং অর্থনীতি, সমাজ ও মানবতার মধ্যেও ভারসাম্য আনবে। আর
যদি ব্যর্থ হয়, তবে সেটি হবে বৈশ্বিক জলবায়ু আশার এক বড় ধাক্কা।