প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ১১ নভেম্বর ২০২৫ ২১:৪৯ পিএম
আপডেট : ১১ নভেম্বর ২০২৫ ২২:১৩ পিএম
ভারতের পুরান দিল্লিতে গাড়ি বোমা হামলার এক দিন পরই পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে ঘটল একই ধরনের বিস্ফোরণ। পরপর দুই দেশে এই হামলা নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। হামলার ঘটনায় দুই দেশের সরকারই একে অপরকে দোষারোপ করেছে।
মঙ্গলবার দুপুরে ইসলামাবাদের জি-১১ এলাকার জেলা ও দায়রা জজ আদালত ভবনের বাইরে আত্মঘাতী বিস্ফোরণে অন্তত ১২ জন নিহত ও ৩০ জন আহত হন। ঘটনার সময় ইসলামাবাদে আন্তর্জাতিক সংসদীয় স্পিকার্স কনফারেন্স ও ষষ্ঠ মারগাল্লা ডায়ালগসহ বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠান চলছিল। পাশাপাশি রাওয়ালপিন্ডিতে পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার মধ্যে এক দিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচও চলছিল।
ইসলামাবাদ পুলিশের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সংবাদ মাধ্যম ডনকে বলেন, ‘এটি ছিল একটি পরিকল্পিত আত্মঘাতী হামলা।’ পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহসিন নকভি আদালতের বাইরে সাংবাদিকদের বলেন, ‘দুপুর ১২টা ৩৯ মিনিটে হামলাটি ঘটে। মরদেহ শনাক্তের কাজ চলছে এবং আহতদের চিকিৎসা তদারক করছেন প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ।’
নকভি বলেন, ‘হামলাকারী আদালতের বাইরে প্রায় ১২ মিনিট অবস্থান করেছিল। সে প্রথমে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু ব্যর্থ হয়ে পুলিশের গাড়িটিকে লক্ষ্য করে বিস্ফোরণ ঘটায়।’ তিনি আরও বলেন, ‘সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, হামলাকারী বিভিন্ন দিক থেকে আদালতে ঢোকার পথ খুঁজছিল। তাকে শনাক্ত করাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।’
মন্ত্রী বলেন, ‘এটি কোনো সাধারণ বিস্ফোরণ নয়। এর সময় ও স্থান এবং রাজধানী ইসলামাবাদ- দুটোই ইঙ্গিতবাহী। আমরা প্রমাণসহ সামনে আসব। স্থানীয় বা বিদেশি- যে-ই জড়িত থাকুক, ছাড় দেওয়া হবে না।’
পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্সেসের (পিমস) মুখপাত্র ড. মুবাশশির দাহা বলেন, ‘পিমসে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে, আহতদের চিকিৎসা চলছে।’ নিহতদের মধ্যে একজন আইনজীবীও আছেন।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে, আদালত ভবনের সামনে আগুন ও ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠছে। প্রত্যক্ষদর্শী আইনজীবী মোহাম্মদ শাহজাদ বাট বলেন, ‘বিস্ফোরণটি এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, সবাই আতঙ্কে দৌড়াতে থাকে। আমি অন্তত পাঁচটি মরদেহ দেখেছি।’
পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আসিফ আলি জারদারি নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে বলেন, ‘এটি জাতির জন্য এক গভীর আঘাত।’ প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ মন্তব্য করেন, ‘আজকের হামলা আমাদের জন্য এক জাগরণের ডাক। যারা ভাবছেন যুদ্ধ কেবল সীমান্ত অঞ্চলে সীমাবদ্ধ, তারা ভুল করছেন।’
ইসলামাবাদে নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার জেন ম্যারিয়ট এক্সে লেখেন, ‘ইসলামাবাদে বিস্ফোরণের ঘটনায় আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। ব্রিটিশ নাগরিকদের ভ্রমণ নির্দেশিকা নিয়মিত পর্যবেক্ষণের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।’
ইসলামাবাদের ঘটনার আগের দিন, সোমবার সন্ধ্যায় ভারতের পুরান দিল্লির লালকেল্লা মেট্রো স্টেশনের কাছে এক গাড়ি বিস্ফোরণে অন্তত ১৩ জন নিহত ও ২৪ জনের বেশি আহত হন। স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৭টার দিকে ট্রাফিক সিগন্যালে থেমে থাকা একটি গাড়ি মুহূর্তেই আগুনে জ্বলে ওঠে। আশপাশের গাড়ি ও ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ভারতের জাতীয় তদন্ত সংস্থা (এনআইএ) ঘটনাটির তদন্তভার গ্রহণ করেছে। সংস্থাটির ধারণা, এটি ছিল একটি আত্মঘাতী গাড়ি বোমা হামলা, যার পেছনে কোনো সুসংগঠিত সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক কাজ করছে। এনডিটিভির খবরে বলা হয়, এনআইএ কর্মকর্তারা মঙ্গলবার সকালে হরিয়ানার ফরিদাবাদের আল-ফালাহ বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করেছেন এবং সম্ভাব্য সন্দেহভাজনদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করছেন।
দিল্লিতে বিস্ফোরণের পরপরই কিছু ভারতীয় মিডিয়া প্রশাসনের আনুষ্ঠানিক বিবৃতির আগেই মুসলিমদের দায়ী করে রিপোর্ট করে। একটি বড় মিডিয়া নেটওয়ার্কের সম্পাদক সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘সন্ত্রাসের ধর্ম আছে’ বলে মন্তব্য করেন। অন্য একজন সাংবাদিক বিস্ফোরণের স্থানকে জৈন মন্দিরের বিপরীতে বলে ভুলভাবে তুলে ধরেন, যদিও সেখানে অনেক মসজিদ রয়েছে। এই ঘটনায় মূলধারার মিডিয়ার বিরুদ্ধে ইসলামোফোবিয়া এবং মুসলিম-বিরোধী প্রচারণার পুরনো অভিযোগ আবারও উঠেছে। আর কেন্দ্রীয় সরকার-নিয়ন্ত্রিত দিল্লি পুলিশ সন্দেহ করছে- এই হামলার সঙ্গে পাকিস্তান-ভিত্তিক সশস্ত্র গোষ্ঠীর যোগসূত্র থাকতে পারে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দুঃখ প্রকাশ করে বলেছেন, ‘এর পেছনের ষড়যন্ত্রকারীদের রেহাই দেওয়া হবে না। এই ঘটনার জন্য দায়ী সবাইকে বিচারের আওতায় আনা হবে।’
দিল্লির এই বিস্ফোরণের ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহেরই হাত থাকতে পারে— এমনই অভিযোগ তুলেছে কংগ্রেস। দলটির নেতৃস্থানীয়দের দাবি ‘ভোট চুরির জন্য ব্যবস্থা করা হয়েছে’, কিন্তু নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য কিছুই করা হয়নি।
প্রসঙ্গত, বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে একই ভোটার নানা রাজ্যের তালিকায় তুলে জালিয়াতিসহ নানা তৎপরতার অভিযোগ তুলে আসছে কংগ্রেস। আর দিল্লির এই বিস্ফোরণের পরের দিন মঙ্গলবার (১১ নভেম্বর) বিহারে অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় দফার বিধানসভা ভোট।
দিল্লি ও ইসলামাবাদ- দুই দেশের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ‘আত্মঘাতী’ বিস্ফোরণের ঘটনায় দুই দেশই একে অপরকে দোষারোপ, উদ্বেগ প্রকাশ ও নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করেছে। এই ধারাবাহিক হামলা দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন এক নিরাপত্তা সংকটের ইঙ্গিত বহন করছে বলে সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেক পর্যবেক্ষক মন্তব্য করেছেন।