× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

মাইকেল কুগেলম্যানের বিশ্লেষণ

ট্রাম্প যুগে ওয়াশিংটন-ঢাকার সম্পর্কে যে সম্ভাবনা উঁকি দিচ্ছে

প্রবা প্রতিবেদন

প্রকাশ : ১০ নভেম্বর ২০২৫ ২২:১৭ পিএম

আপডেট : ১০ নভেম্বর ২০২৫ ২২:২১ পিএম

ট্রাম্প যুগে ওয়াশিংটন-ঢাকার সম্পর্কে যে সম্ভাবনা উঁকি দিচ্ছে

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত জানুয়ারিতে যখন ক্ষমতা গ্রহণ করেন, তখন এক ধরনের আশঙ্কা ছিল যে ওয়াশিংটন-ঢাকা সম্পর্ক কিছু অন্ধকার দিনের মুখোমুখি হবে। জো বাইডেন প্রশাসনের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে ট্রাম্প এমন একটি সম্পর্ক পান, যা বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে সহায়তা করার ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছিল। এটি মার্কিন উন্নয়ন সহায়তা এবং সংস্কারের জন্য কারিগরি সহায়তার মতো বিষয়গুলোকে ঘিরে ছিল। কিন্তু ট্রাম্পের আক্রমণাত্মক ও লেনদেনভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে এমন অংশীদারত্ব মানানসই নয়; এটা শুরু থেকেই স্পষ্ট ছিল। দায়িত্ব নেওয়ার পর অল্প সময়েই তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বিদেশি সাহায্যের বড় অংশ ছেঁটে ফেলেন। ফলে দীর্ঘদিনের উন্নয়ন সহযোগিতার ভিত্তি, যা আমেরিকা-বাংলাদেশ সম্পর্কের অন্যতম স্তম্ভ ছিল, অতীতের স্মৃতিস্তম্ভে পরিণত হয়।

ভারতের প্রতি ট্রাম্পের অনুরাগÑ যদিও তা অনেকাংশেই হিন্দু-আমেরিকান ভোটারদের টানার রাজনৈতিক কৌশল ছিলÑ বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিয়ে তার মন্তব্য উদ্বেগ সৃষ্টি করেছিল যে তার প্রশাসন হয়তো ঢাকার বিষয়ে নয়াদিল্লির অবস্থান অনুসরণ করবে। চীনের প্রতি তার কঠোর অবস্থান এবং ‘বুলিং ডিপ্লোমেসি’র খ্যাতি ইঙ্গিত দিয়েছিল, বাইডেন প্রশাসনের চেয়েও বেশি চাপ তিনি দিতে পারেন, যাতে বাংলাদেশ বেইজিংয়ের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক কমিয়ে আনে। 

অন্যদিকে বাণিজ্য ঘাটতির বিষয়ে ট্রাম্পের এমন এক কঠোর মনোভাব দেখা দিয়েছিল যে তার প্রশাসন বাংলাদেশকে আরও বেশি মার্কিন পণ্য কিনতে চাপ দিতে পারে, যা বাংলাদেশের মতো অর্থনৈতিক কাঠামোয় সহজ নয়, এবং অমান্য করলে শাস্তিমূলক পদক্ষেপও নিতে পারে। তবু আজকের প্রেক্ষাপটে চিত্রটা অনেক উজ্জ্বল। সম্পর্কটি এখন তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ও ইতিবাচক।

দুই দেশের মধ্যে উচ্চপর্যায়ে যোগাযোগে এটি হয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর ফোনালাপ এবং ট্রাম্পের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক দূত সার্জিও গরের সঙ্গে ইউনূসের সাক্ষাৎ বড় ভূমিকা রেখেছে। আর সামরিক মহড়াও চলমান রয়েছে। শান্তিতে নোবেলজয়ী ইউনূস, যিনি একসময় ট্রাম্পের কঠোর সমালোচক ছিলেন, এবার অনেক বেশি বাস্তববাদী ও কূটনৈতিক অবস্থান নিয়েছেন। তবে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের কারণে তিনি ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় আর বেশিদিন থাকছেন না।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলোÑ বাংলাদেশে নিযুক্ত হতে যাওয়া মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন এমন একজন কূটনীতিক যিনি দেশটিকে গভীরভাবে চেনেন, যেহেতু তিনি আগেও এখানে দায়িত্ব পালন করেছেন। সিনেট শুনানিতে তিনি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও কৌশলগত গুরুত্বের কথা উল্লেখ করে বলেন, এই দেশটি যথাযথ মনোযোগ পায় না, অথচ তা প্রাপ্য। 

বর্তমানে কোনো বড় দ্বিপাক্ষিক উত্তেজনার ইস্যু নেই। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির ওপর শুল্ক ৩৫ থেকে কমিয়ে ২০ শতাংশ করেছে, যা অন্যান্য প্রধান এশীয় প্রতিযোগীর সমতুল্য। বিদেশি সাহায্য কমিয়ে দেওয়ায় বাংলাদেশ কিছুটা চাপে পড়েছে, কিন্তু রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য জরুরি মানবিক সহায়তা অব্যাহত আছে।

একই সঙ্গে সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনও ঢাকার জন্য সহায়ক। যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সম্পর্কের টানাপড়েনের কারণে ট্রাম্প প্রশাসন নয়াদিল্লির দিকনির্দেশনা অনুযায়ী ঢাকা নীতি নির্ধারণের ঝুঁকি কম।

দক্ষিণ এশিয়ার বিশেষ দূত সার্জিও গর একই সঙ্গে ভারতের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দিল্লিতে অবস্থান করবেন, তবে এটিও ঢাকার জন্য সুযোগ হতে পারে, কারণ তার ভৌগোলিক নিকটতা বাংলাদেশ সফর সহজ করবে।

অন্যদিকে ট্রাম্প এখনও চীন নীতি স্পষ্ট করেননি। বরং তিনি কিছুটা উত্তেজনা প্রশমনের ইঙ্গিত দিয়েছেন; সম্ভবত ভবিষ্যৎ সংঘাতের ঝুঁকি কমাতে এবং চীনের অর্থনৈতিক প্রভাব যেন মার্কিন বাণিজ্যিক স্বার্থ ক্ষুণ্ন না করে তা নিশ্চিত করতে। এমন প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক নীতির ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত। 

ফলে অনুমান করা যায়, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখে পড়বে না, বরং তার দীর্ঘদিনের ভারসাম্যনীতিÑ ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা অবিকৃত থাকবে।

এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ সম্পর্কের এক নতুন সম্ভাবনাময় দিক উঁকি দিচ্ছে, যা এতদিন বাস্তবায়িত হয়নি। এটি হলো ইউএস ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ফাইন্যান্স করপোরেশন (ডিএফসি)- যা বেসরকারি বিনিয়োগকে কাজে লাগিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থ রক্ষা করে। এটি ট্রাম্প প্রশাসনের মূলনীতির সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ।

দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য অঞ্চলে, বিশেষত ভারতে, ডিএফসি বড় বিনিয়োগ করেছে। কিন্তু শ্রম অধিকার সংক্রান্ত উদ্বেগের কারণে বাংলাদেশে তারা এখনও বিনিয়োগ করেনি। তবে এ বিষয়ে অগ্রগতি হয়েছে এবং বাংলাদেশের সঙ্গে ডিএফসির যোগাযোগ শুরু হয়েছেÑ এ বিষয়ে বাইডেন প্রশাসনের শেষদিক থেকেই ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। 

যদি ডিএফসি বাংলাদেশে বিনিয়োগ করে, তবে দুই দেশই লাভবান হবে। এটি বাংলাদেশের কৃষি, জ্বালানি ও স্বাস্থ্য খাতে নতুন বিনিয়োগ আনবে, যা বিদেশি সহায়তার ঘাটতি পূরণে সহায়ক হবে। একই সঙ্গে এটি চীনের বিনিয়োগ প্রভাব কিছুটা হলেও প্রতিহত করবে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশি প্রবাসী উদ্যোক্তাদের সম্পদ ও দক্ষতা কাজে লাগানোর নতুন সুযোগ তৈরি করবে। এতে বাংলাদেশের দীর্ঘস্থায়ী বৈদেশিক বিনিয়োগ ঘাটতিও কিছুটা পূরণ হতে পারে।

অবশ্যই বলা যায় না যে যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ সম্পর্কের এই উন্নতি নাটকীয়। ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে বাংলাদেশ এখনও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত নয়। মধ্যপ্রাচ্যের মতো যুক্তরাষ্ট্রের নজরকাড়া অঞ্চলগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্ব তাদের চোখে কম। আবার বাংলাদেশের প্রধান উদ্বেগের বিষয়গুলোÑ আঞ্চলিক সংযোগ, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, মানবিক সহায়তা ট্রাম্পের ওয়াশিংটনে খুব একটা প্রতিধ্বনি পায় না। আর কমানো সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক এখনও বাংলাদেশের জন্য বোঝা। তবু যখন দেখা যায় ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া থেকে শুরু করে ন্যাটো মিত্রদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক নানা কারণে টালমাটাল, তখন বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের এই স্থিতিশীলতা বিস্ময়করই বলা যায়।

বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র নয়, তবু একেবারে অনিশ্চিত ও অপ্রথাগত ট্রাম্প প্রশাসনের সময়েও সম্পর্কটা মোটামুটি ভালো জায়গায় আছেÑ এটাই বড় বিষয়।

[মূল লেখা কাউন্টারপয়েন্টবিডি ডটকমে প্রকাশিত। মাইকেল কুগেলম্যান কানাডার এশিয়া প্যাসিফিক ফাউন্ডেশনের অনাবাসী সিনিয়র ফেলো এবং ওয়াশিংটন ডিসির উইলসন সেন্টারের দক্ষিণ এশিয়া ইনস্টিটিউটের প্রাক্তন পরিচালক।]

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা