সেনেটে সমঝোতা প্রস্তাব পাস
প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ১০ নভেম্বর ২০২৫ ১৯:৫৬ পিএম
দীর্ঘ ৪০ দিন ধরে চলা যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে দীর্ঘতম সরকারি অচলাবস্থা বা শাটডাউন অবসানের পথে। রবিবার গভীর রাতে সেনেটে একটি সমঝোতা প্রস্তাব পাস হয়েছে, যা কার্যত অচলাবস্থা নিরসনের প্রথম বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে হতাশা প্রকাশ করে অনেক ডেমোক্র্যাট সেনেটর একে ‘নীতিহীন আপস’ বলে অখ্যায়িত করেছেন।
যখন যুক্তরাষ্ট্রের আইনসভা বা কংগ্রেস সরকারের বিভিন্ন বিভাগ ও কর্মসূচির জন্য প্রয়োজনীয় বার্ষিক বাজেট বা তহবিল বিল সময়মতো অনুমোদন করতে ব্যর্থ হয়, তখন উদ্ভূত পরিস্থিতিকে শাটডাউন বলা হয়। এটি মূলত হয় রাজনৈতিক অচলাবস্থা বা রাজনৈতিক মতবিরোধের কারণে।
গত ১ অক্টোবর সরকারি অর্থ বরাদ্দ মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের সরকার আংশিকভাবে এই অবস্থার মধ্যে পড়ে।
প্রায় ১৪ লাখ ফেডারেল কর্মচারি বেতন ছাড়াই ছুটিতে বা বিনা বেতনে কাজ করছিলেন। বন্ধ ছিল অসংখ্য সরকারি সেবা, যার মধ্যে বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রণ, কৃষি সহায়তা, ভেটেরানস অ্যাফেয়ার্স (প্রাক্তন সামরিক সদস্যদের স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য সুবিধা), এমনকি নিম্নআয়ের নাগরিকদের খাদ্য ভর্তুকি কর্মসূচি- এসএনএপিও অন্তর্ভুক্ত।
দীর্ঘ টানাপোড়েন শেষে সমঝোতার সূত্রপাত
রিপাবলিকান সংখ্যাগরিষ্ঠ সেনেটে (৫৩-৪৭) গত সপ্তাহান্তে একাধিক দফা আলোচনার পর অবশেষে দুই দলের একাংশ একমত হয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ দলনেতা জন থুন ও হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা সরাসরি আলোচনায় অংশ নেন। আলোচনায় অংশ নেওয়া ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে ছিলেন নিউ হ্যাম্পশায়ারের সেনেটর জিন শাহিন ও ম্যাগি হাসান এবং মেইনের স্বতন্ত্র সেনেটর অ্যাঙ্গাস কিং, যিনি ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেন।
৬০ ভোটের বাধা অতিক্রম করতে রিপাবলিকানদের প্রয়োজন ছিল অন্তত ৮ জন ডেমোক্র্যাটের সমর্থন; এবং তারা তা অর্জন করেছে। তবে কেনটাকির রিপাবলিকান সেনেটর র্যান্ড পল বিরোধিতা করেছেন; কারণ তার মতে, এই প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণ আরও বাড়াবে।
স্বাস্থ্যভর্তুকি প্রশ্নে আপস
ডেমোক্র্যাটদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল- এই বছরেই শেষ হতে যাওয়া স্বাস্থ্যবিমা ভর্তুকি সম্প্রসারণে নিশ্চিত পদক্ষেপ নিতে হবে। এই ভর্তুকি কর্মসূচি সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবো আইনের (অ্যাফোর্ডেবল কেয়ার অ্যাক্ট-এসিএ) আওতায় প্রায় তিন কোটি মার্কিন নাগরিককে সাশ্রয়ী মূল্যে স্বাস্থ্যবিমা দেয়।
সমঝোতা প্রস্তাবে ডিসেম্বর মাসে এই বিষয়ে ভোটের আশ্বাস রাখা হয়েছে। সেনেট নেতা জন থুন বলেন, “আমরা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছি যেখানে দুই দলের সেনেটররাই স্বাস্থ্যসেবার সংকট নিরসনে আন্তরিকভাবে এগিয়ে আসতে চান। প্রেসিডেন্টও আলোচনায় বসতে রাজি আছেন।”
তবে তিনি সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করেননি প্রস্তাবিত স্বাস্থ্য বিলের বিষয়বস্তু কী হবে। এ কারণেই ডেমোক্র্যাটদের অনেকেই অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। সেনেটের ডেমোক্র্যাট নেতা চাক শুমার বলেন, “এই বিল স্বাস্থ্যসেবার সংকট সমাধানের কোনো নিশ্চয়তা দেয় না। তাই আমি এর বিপক্ষে ভোট দেব।”
দলীয় বিভাজন ও সমালোচনা
ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসম এই সমঝোতায় ডেমোক্র্যাট সেনেটরদের সমর্থনকে ‘হতাশাজনক ও নীতিহীন আপস’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডেমোক্র্যাটদের অভ্যন্তরে এ নিয়ে গভীর মতবিরোধ দেখা দিয়েছে; বিশেষ করে যারা মনে করছেন অচলাবস্থা সমাপ্তির বিনিময়ে স্বাস্থ্যনীতি ও সামাজিক সুরক্ষা বিষয়ে তারা পর্যাপ্ত নিশ্চয়তা আদায় করতে পারেননি।
চুক্তির মূল দিকগুলো
বিবিসি ও সিএনএন জানিয়েছে, এই সমঝোতা বিলটিতে তিনটি পূর্ণাঙ্গ বরাদ্দ বিল এবং একটি ধারাবাহিক প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যা সরকারের বাকি অংশকে আগামী ৩০ জানুয়ারি পর্যন্ত অর্থায়নের অনুমোদন দেয়। এতে আরও আছে- ১. ভেটেরানস অ্যাফেয়ার্স ও কৃষি মন্ত্রণালয়সহ গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাগুলোর বাজেট অনুমোদন, ২. সব ফেডারেল কর্মচারীর বকেয়া বেতন প্রদানের নিশ্চয়তা, এবং ৩. সম্পূরক পুষ্টি সহায়তা কর্মসূচি বা এসএনএপি’র অর্থায়ন আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো, যা বর্তমানে প্রায় ৪ কোটি ১০ লাখ নিম্নআয়ের আমেরিকানকে খাদ্য সহায়তা দেয়।
পরবর্তী ধাপ ও রাজনৈতিক তাৎপর্য
এখনো বিলটি চূড়ান্ত হতে বেশ কয়েকটি ধাপ বাকি। এটি এখন প্রতিনিধি পরিষদে (হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভ) উঠবে, যেখানে রিপাবলিকান নেতৃত্বাধীন সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও দলীয় বিভক্তি এখানেও স্পষ্ট।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নতুন অর্থবরাদ্দ পাস হলেও এই সমঝোতা কেবল সাময়িক স্বস্তি দেবে; আগামী জানুয়ারির শেষে আবারও নতুন অর্থ সংকট দেখা দিতে পারে।
ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের সিনিয়র ফেলো ড্যারেল ওয়েস্ট দ্য ওয়াশিংটন পোস্টকে বলেন, “এই চুক্তি মূলত একপ্রকার ‘বিরতি’। দুই দলই জনমতের চাপে এসে রাজনৈতিক ক্ষতি এড়াতে চাচ্ছে। কিন্তু মূল কাঠামোগত দ্বন্দ্ব এখনো অমীমাংসিত।”
দীর্ঘতম অচলাবস্থা: অর্থনীতি ও নাগরিক জীবনের প্রভাব
২০১৯ সালের ৩৫ দিনের অচলাবস্থাকে ছাড়িয়ে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে দীর্ঘতম সরকারি স্থবিরতা। শ্রম মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়েছে। বিমান চলাচলে বিলম্ব, খাদ্য নিরাপত্তা পরিদর্শনে ব্যাঘাত, এমনকি জাতীয় উদ্যানগুলোর নিরাপত্তা সংকট- সবই জনগণের দৈনন্দিন জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছে।
অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করেছেন, যদি জানুয়ারির পর পুনরায় অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়, তবে তা শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকেই নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক ঋণমানকেও (ক্রেডিট রেটিং) ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।