প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ০৯ নভেম্বর ২০২৫ ২১:৫৮ পিএম
ফিলিপিন্সে সুপার টাইফুন ফাং-ওং আঘাত হানার আগেই দেশটির বিভিন্ন প্রদেশে প্রায় ১২ লাখ মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়।
ফিলিপিন্সে পূর্ব সমুদ্র উপকূলে সুপার টাইফুন ফাং-ওং (স্থানীয়ভাবে পরিচিত ‘উওয়ান’) আঘাত হানার পর বন্যায় অন্তত দুজনের মৃত্যু হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে দেশটির সিভিল ডিফেন্স অফিস। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ভারি বৃষ্টিপাত ও তীব্র বাতাসের কারণে বিকোল অঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
ঘূর্ণিঝড়টি ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে দেশটির পূর্ব উপকূলজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। দেশের বিভিন্ন প্রদেশে প্রায় ১২ লাখ মানুষকে আগে থেকেই সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন সিভিল ডিফেন্সের ডেপুটি অ্যাডমিনিস্ট্রেটর রাফায়েলিতো আলেহান্দ্রো।
প্রায় পুরো ফিলিপিন্সজুড়ে বিস্তৃত এই ঝড়টি স্থানীয় সময় রবিবার রাত ৯:১০ মিনিটে লুজনের প্রধান দ্বীপের অরোরা প্রদেশে স্থলভাগে আঘাত হানে।
‘ফাং-ওং’-এর প্রভাবে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে কাতান্দুয়ানেস দ্বীপ এবং ক্যাটবালোগান সিটি। কাতান্দুয়ানেসে এক ব্যক্তি বন্যার পানিতে ডুবে মারা যান। আর ক্যাটবালোগান শহরে ধসে পড়া বাড়ির নিচে চাপা পড়ে প্রাণ হারান এক নারী, যিনি সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতির সময় আবার ঘরে ফিরে গিয়েছিলেন।
স্থানীয় উদ্ধারকর্মী জুনিয়েল তাগারিনো বলেন, “গতরাতে বাতাস এতটাই প্রবল ছিল যে, কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। পরিবারের সদস্যরা বলছিলেন, তিনি (ওই নারী) হয়তো কিছু নিতে ঘরে ফিরে গিয়েছিলেন, আর তখনই ধস নামে।”
ফিলিপিন্সের সবচেয়ে জনবহুল দ্বীপ লুজনের কিছু অংশে ১৮৫ কিলোমিটার (১১৫ মাইল) বেগে বাতাস এবং ২৩০ কিলোমিটার (১৪০ মাইল) বেগে ঝোড়ো হাওয়া আঘাত হানে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াজুড়ে ঘূর্ণিঝড় কালমায়েগির তাণ্ডবে ফিলিপাইনে ২০৪ জন এবং ভিয়েতনামে কমপক্ষে পাঁচজনের মৃত্যু হওয়ার কয়েকদিন পর নতুন এই ঘূর্ণিঝড়টি আঘাত হানল।
লুজনের আরও অনেক এলাকা সর্বোচ্চ এবং দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ঝড় সতর্কতা স্তরের অধীনে রাখা হয়েছে, যখন মেট্রো ম্যানিলা এবং কাছাকাছি প্রদেশগুলো ৩ স্তরে রয়ে গেছে।

ফিলিপিন্সের রাজধানী ম্যানিলাসহ পুরো লুজন অঞ্চলে সোমবার স্কুল, সরকারি অফিস ও বিমান চলাচল বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। শুধু ম্যানিলাতেই প্রায় ৩০০ ফ্লাইট বাতিল হয়েছে।
দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী গিলবার্তো তেওদোরো জনগণকে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ মেনে চলার আহ্বান জানিয়ে বলেন, “সরকারি নির্দেশ অমান্য করা শুধু বিপজ্জনক নয়, বেআইনি। আমরা চাই মানুষ আগেভাগে নিরাপদে চলে যাক; না হলে শেষ মুহূর্তের উদ্ধার অভিযান আমাদের কর্মীদের জীবনকেও ঝুঁকিতে ফেলবে।”
রবিবার সকালে থেকেই কাতান্দুয়ানেস দ্বীপে প্রবল জলোচ্ছ্বাস ও ঝোড়ো বাতাস বইতে শুরু করে। সরকারি আবহাওয়া দপ্তর জানিয়েছে, ঝড়ের চোখ সবচেয়ে কাছাকাছি থাকায় দ্বীপটি ‘সরাসরি আঘাত’ পেতে পারে।
স্থানীয় বাসিন্দা এডসন কাসারিনো (৩৩) বলেন, “সকাল সাতটার দিকে থেকেই ঢেউ গর্জন শুরু করে। সাগর থেকে উঠে আসা ঢেউ যখন সি-ওয়ালে আছড়ে পড়ছিল, তখন মনে হচ্ছিল মাটি কাঁপছে।”
সরকারি সম্প্রচারমাধ্যমে প্রচারিত ভিডিওতে দেখা গেছে- অনেক ঘরবাড়ি ছাদের সমান পর্যন্ত পানিতে ডুবে গেছে। আলবায় প্রদেশের গুইনোবাতান শহরে রাস্তাগুলো পরিণত হয়েছে উত্তাল স্রোতে।
সরকারি আবহাওয়া বিভাগ জানিয়েছে, ‘ফাং-ওং’ দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে অন্তত ২০০ মিলিমিটার (প্রায় ৮ ইঞ্চি) বৃষ্টিপাত ঘটাতে পারে। এটি চলতি বছরে ফিলিপিন্সে আঘাত হানা ২১তম প্রধান ঘূর্ণিঝড়। সাধারণত বছরে গড়ে ২০টি ঝড় দেশটিতে আঘাত হানে। ফলে ইতোমধ্যেই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় ব্যাপক চাপ রয়েছে।
বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এমন ঘূর্ণিঝড়গুলোর শক্তি ও তীব্রতা বাড়ছে। উষ্ণ সমুদ্রপৃষ্ঠ ঝড়কে দ্রুত শক্তিশালী করে তোলে, আর উষ্ণ বায়ুমণ্ডল ধারণ করে বেশি আর্দ্রতা- ফলে বাড়ে বৃষ্টিপাতের পরিমাণও।
কর্তৃপক্ষ সতর্ক করে দিয়েছে যে ফাং-ওং প্রায় পুরো দেশকে গ্রাস করতে পারে। কর্মকর্তারা উপকূলীয় এবং নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। রাষ্ট্রপতি ফার্ডিনান্ড মার্কোস জুনিয়র জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন।
সিভিল ডিফেন্স অফিসের তথ্য অনুযায়ী, কালমায়েগিতে পাঁচ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন । সাড়ে ৪ লাখ মানুষ উদ্ধার কেন্দ্রে অথবা আত্মীয়স্বজনের কাছে আশ্রয় চান, কারণ উদ্ধারকারী দল ১০০ জনেরও বেশি নিখোঁজ ব্যক্তির সন্ধান এখনও চালিয়ে যাচ্ছে।
ভিয়েতনামে, রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম পাঁচজনের মৃত্যুর খবর দিয়েছে, যার মধ্যে ডাক লাক প্রদেশে তিনজন এবং গিয়া লাইতে দুজন এবং কোয়াং এনগাই শহরে তিনজন নিখোঁজ রয়েছে। ঝড়ের ফলে প্রায় ২,৬০০টি বাড়ি ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ১৬ লাখের বেশি পরিবারের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। কুই নহোনে, বাসিন্দারা রাস্তায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ধাতব ছাদ এবং আসবাবপত্র দেখতে পান, যখন দোকানদাররা ভিজে জিনিসপত্র শুকানোর জন্য রেখেছিলেন।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কালমায়েগি ঝড় আঘাত হানার আগেই ৫ লাখ ৩৭ হাজারের বেশি ভিয়েতনামিকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। ৬০০ মিমি (২৪ ইঞ্চি) পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হয়েছিল। পরে দুর্বল হয়ে একটি গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঝড়ে পরিণত হয়ে কম্বোডিয়ায় চলে গিয়েছিল।
বিশ্বের সবচেয়ে দুর্যোগপ্রবণ দুটি দেশ- ফিলিপিন্স ও ভিয়েতনাম প্রায় প্রতি বছরই টাইফুনের মুখোমুখি হয়। কিন্তু বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন যে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আরও শক্তিশালী এবং ঘন ঘন ঝড় হচ্ছে।
তথ্যসূত্র: এএফপি, রয়টার্স, আল-জাজিরা, দ্য গার্ডিয়ান