এক্সপ্লেইনার
প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ০৮ নভেম্বর ২০২৫ ২২:৩০ পিএম
আপডেট : ০৮ নভেম্বর ২০২৫ ২২:৪৭ পিএম
ডোনাল্ড ট্রাম্প ও জোহরান মামদানি।
জোহরান মামদানি ইতিহাস গড়া জয়ে নিউ ইয়র্কের মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পরেই তার প্রথম রাজনৈতিক সংঘাত শুরু হয় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে। বিজয় ভাষণেই মামদানি সরাসরি ট্রাম্পের উদ্দেশে বলেন, “ডোনাল্ড ট্রাম্প, আমি জানি আপনি দেখছেন, আমার চারটি কথা- টার্ন দ্য ভলিউম আপ (ভলিউমটা বাড়িয়ে দিন)।”
শত বছরের মধ্যে সবচেয়ে
কনিষ্ঠ মেয়র পেয়েছে ৮৪ লাখ মানুষের নগরী নিউ ইয়র্ক। শুধু তারুণ্যে নয়; প্রথমবারের মতো
একজন দক্ষিণ এশীয়, মুসলিম ও প্রগতিশীল বামপন্থী রাজনীতিক এই নগরীর মেয়র হলেন। আর জয়ের
মধ্যে দিয়ে হতাশায় পড়া ডেমোক্র্যাটরা দিশা খুঁজে পেয়েছেন। এটা মেনে নিতে পারছেন না
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।
৩৪ বছর বয়সী মামদানির
মন্তব্যের জবাবে ৭৯ বছর বয়সী ট্রাম্প নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যালে
লেখেন, “...এখনই শুরু হচ্ছে!”

নতুন রাজনৈতিক সংঘাত
ট্রাম্প শুরু থেকেই
মামদানিকে ‘ডেমোক্র্যাটিক পার্টির কমিউনিস্ট ভবিষ্যৎ’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। সিটি নির্বাচনের
প্রচারণার সময় ট্রাম্প স্বতন্ত্র প্রার্থী সাবেক গভর্নর অ্যান্ড্রু কুয়োমোকে সমর্থন
দেন এবং হুমকি দেন- যদি নিউ ইয়র্ক মামদানিকে বেছে নেয়, তাহলে তিনি
শহরের কেন্দ্রীয় অনুদান বন্ধ করে দেবেন।
নির্বাচনের পরদিনই ট্রাম্প
সতর্ক করে বলেন, মামদানির নেতৃত্বে “মানুষ নিউ ইয়র্ক ছেড়ে পালাবে।”
এটাই প্রথম নয়। অতীতেও তিনি নিউইয়র্কে নানা ভাবে হস্তক্ষেপ করেছেন; কখনো অভিবাসন রেইড বাড়িয়ে, কখনো যানজট নিয়ন্ত্রণমূলক প্রকল্পের জন্য
তহবিল আটকে।
কিন্তু মামদানি শান্তভাবে
জবাব দিয়েছেন, “ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাতে প্রতারিত একটি জাতিকে যদি কেউ দেখাতে পারে কীভাবে
তাকে (ট্রাম্প) পরাভূত করতে হয়, তবে সেই পথ দেখানোর ক্ষমতা আছে একমাত্র সেই শহরের,
যা তাকে জন্ম দিয়েছিল।”
ফেডারেল অর্থ আটকে
দেওয়ার হুমকি
গত অক্টোবর থেকে মার্কিন
সরকারের বাজেট বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর ট্রাম্প প্রশাসন ইতোমধ্যেই নিউ ইয়র্কসহ বেশ কয়েকটি
ডেমোক্র্যাট নিয়ন্ত্রিত শহরের জন্য বিলিয়ন ডলার ফেডারেল অনুদান বন্ধ করে দিয়েছে। এর
মধ্যে নিউ ইয়র্কের ১৮ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ স্থগিত রাখা হয়েছে, যা বড় অবকাঠামো প্রকল্পে
ব্যয় হওয়ার কথা ছিল।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের
মতে, ট্রাম্প চাইলে আরও অর্থ ছাঁট করতে পারেন, যা মামদানির
শহুরে সংস্কার পরিকল্পনাকে সরাসরি বিপর্যস্ত করবে। মামদানির প্রতিশ্রুতিগুলোর মধ্যে
ছিল- ভাড়ানিয়ন্ত্রিত বাসাবাড়ির ভাড়া স্থির রাখা, ফ্রি
ও দ্রুতগতির বাস সার্ভিস, সার্বজনীন শিশু যত্ন ব্যবস্থা, এবং পৌর মালিকানাধীন মুদি
দোকান প্রতিষ্ঠা।
প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের
ইতিহাসবিদ জুলিয়ান জেলিজার বলেন, “মেয়র-নির্বাচিত মামদানিকে এখন ট্রাম্পের আক্রমণ
ঠেকাতেই অনেক মনোযোগ দিতে হবে। এতে তার মূল সামাজিক কর্মসূচিগুলো বিলম্বিত হতে পারে।”
রাজস্ব ঘাটতি ও রাজনৈতিক
বাধা
মামদানির পরিকল্পনা
অনুযায়ী, ধনীদের ওপর কর বাড়িয়ে ১০ বিলিয়ন ডলার রাজস্ব আদায়ের প্রস্তাব রয়েছে। কিন্তু
এ অনুমোদন দিতে হবে অঙ্গরাজ্যের গভর্নর ক্যাথি হকুলকে, যিনি নিজেও পুনর্নির্বাচনের
কঠিন লড়াইয়ে আছেন এবং এখন পর্যন্ত কর বাড়ানোর প্রস্তাবে খুব একটা আগ্রহ দেখাননি।
ফেডারেল সরকার গত বছর
নিউ ইয়র্কে মোট ৮.৫ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ দেয়, যা শহরের মোট বাজেটের প্রায় ৭ শতাংশ।
এই অর্থ দিয়ে পরিচালিত হয় গৃহহীন আশ্রয়কেন্দ্র, শিশু সেবা, নিম্নআয়ের শিক্ষার্থীদের
শিক্ষা সহায়তা ও স্কুল মিল প্রোগ্রামসহ নানা জনকল্যাণমূলক খাত।
যদি ট্রাম্প এই অর্থ বন্ধ করেন, তবে শহর ও রাজ্য সরকারকেই ঘাটতি পূরণে বাধ্য হতে হবে; ফলে অন্য খাতে চাপ পড়বে।

আইনি লড়াই ও ‘ন্যাশনাল
গার্ড’ হুমকি
ট্রাম্প প্রশাসন ডেমোক্র্যাট
নিয়ন্ত্রিত শহরগুলোতে আইনশৃঙ্খলার অজুহাতে ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েন করেছে। এখনো নিউ
ইয়র্কে তা হয়নি, তবে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, এই চাপ এখানেও আসতে পারে। মামদানি বলেছেন,
এমন হলে তিনি আইনি পথে লড়াই করবেন।
অভিবাসন নীতিতে সংঘাত
১৯৮০-এর দশক থেকে নিউ
ইয়র্ক ‘অভিবাসীবান্ধব শহর’ হিসেবে পরিচিত। কিন্তু ট্রাম্পের কড়া অভিবাসন নীতির ফলে
শহরের আদালতগুলোতে ইতোমধ্যে শত শত অভিবাসী গ্রেপ্তার হয়েছেন। বর্তমান মেয়র এরিক অ্যাডামস
এ ক্ষেত্রে প্রশাসনের সঙ্গে সহযোগিতা করেছেন। কিন্তু মামদানি স্পষ্ট করেছেন, তার প্রশাসন
সেই পথে হাঁটবে না।
তিনি বলেছেন, “নিউইয়র্ক
অভিবাসীদের শহর; অভিবাসীদের দ্বারা গড়া, চালিত ও এখন একজন অভিবাসীর
নেতৃত্বে।”
ট্রাম্পকে উদ্দেশ করে তিনি যোগ করেন, “আমাদের কাছে আসতে চাইলে আপনাকে আমাদের সবার মধ্য
দিয়ে যেতে হবে।”
‘ট্রাম্প-প্রুফ’
নিউইয়র্কের পরিকল্পনা
কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের
অধ্যাপক বব শ্যাপিরো মনে করেন, জানুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়ার আগে মামদানি ‘ট্রাম্পের প্রথম
পদক্ষেপ’ ঠেকাতে কৌশল সাজাবেন।
তিনি বোস্টনের মেয়র মিশেল উ বা সান ফ্রান্সিসকোর মেয়র ড্যানিয়েল লুরির মতো অন্য শহরগুলোর
অভিজ্ঞতা থেকেও শিখতে পারেন। কেউ ট্রাম্পের সঙ্গে সরাসরি রাজনৈতিক লড়াই করেছেন, কেউ
আবার করপোরেট চাপ ব্যবহার করে হস্তক্ষেপ ঠেকিয়েছেন।
মামদানি নিজের এশতেহারে
ঘোষণা দিয়েছেন- ‘ট্রাম্প-প্রুফ নিউইয়র্ক’ গড়তে তিনি শহরের আইন
বিভাগে অতিরিক্ত ২০০ জন আইনজীবী নিয়োগ করবেন, যেন প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ‘অতিরিক্ত
ক্ষমতা’ মোকাবিলা করা যায়।
সামনে কী অপেক্ষা
করছে
মামদানি একদিকে সামাজিক
ন্যায়, সমতা ও নাগরিক সুরক্ষার অঙ্গীকার করেছেন; অন্যদিকে তাকে সামলাতে হবে এক শক্তিশালী
ফেডারেল প্রতিপক্ষকে- ডোনাল্ড ট্রাম্পকে।
হার্ভার্ডের জননীতি অধ্যাপক জাস্টিন ডে বেনেডিকটিস-কেসনার বলেন, “মামদানি জানেন কখন
ট্রাম্পের সঙ্গে লড়াই করা তার রাজনৈতিক লক্ষ্য পূরণে সহায়ক, আর কখন তা শুধু সময়ের অপচয়।”
অর্থাৎ নিউ ইয়র্কের
নতুন মেয়রের জন্য সামনে পথ কঠিন হলেও তিনি যেন সেই শহরের প্রতীক- যে শহরের বিপরীতে দাঁড়িয়ে নিজেকে নতুনভাবে তৈরি করতে জানে।