আইআরআইয়ের প্রতিবেদন
প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ০৬ নভেম্বর ২০২৫ ২২:১৬ পিএম
আগামী ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের এক ‘গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা’ হিসেবে উল্লেখ করেছে ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট (আইআরআই)। তারা ২০ থেকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত ঢাকা ও অন্যান্য শহরে সরকারের অন্তর্বর্তী প্রশাসন, নির্বাচন কমিশন, রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করে এক প্রাক-নির্বাচনী মূল্যায়ন প্রতিবেদন বুধবার (৫ নভেম্বর) প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে আইআরআই বলেছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও নির্বাচন কমিশন বেশকিছু প্রশংসনীয় পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে সরকারের প্রচেষ্টার পরও প্রাক-নির্বাচনী পরিবেশ এখনও নাজুক। এই পরিস্থিতিতে নির্বাচনকে শান্তিপূর্ণ ও বিশ্বাসযোগ্য করতে প্রতিবেদনে আটটি সুপারিশ তুলে ধরেছে সংস্থাটি।
সংস্থাটি ‘জুলাই জাতীয় সনদ’কার্যকরের ব্যাপারে সুস্পষ্ট অঙ্গীকার কথা বললেও সতর্ক করেছেÑ যদি আইনি ও কাঠামোগত সংস্কারগুলো অসম্পূর্ণ থাকে, তাহলে নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে গণতন্ত্রের স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আইআরআই মনে করেÑ যদি রাজনৈতিক দল, নির্বাচন কমিশন ও নাগরিক সমাজ একসঙ্গে স্বচ্ছ, শান্তিপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করতে পারে, তবে বাংলাদেশের গণতন্ত্র আরও দৃঢ় ভিত্তি পাবে।
১৯৮৩ সাল থেকে ২৫৮টিরও বেশি নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করা আইআরআই’র প্রতিবেদনে বলা হয়, গত বছরের আগস্ট-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে মতপ্রকাশ ও নাগরিক অংশগ্রহণের পরিবেশ ‘উল্লেখযোগ্যভাবে উন্মুক্ত’ হয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ১১টি কমিশনের মাধ্যমে একটি সংস্কারমুখী কর্মপরিকল্পনা নিয়েছে, যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ‘জাতীয় ঐকমত্য কমিশন’ ও এর প্রণীত ‘জুলাই জাতীয় সনদ’।
জুলাই সনদ বা চার্টারে রাষ্ট্রীয় সংস্কারের ৮৪ দফা সংস্কার প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে ৪৭টি বিষয়কে ‘সংবিধান সংশোধন সাপেক্ষে সংস্কার’ এবং বাকি ৩৭টি বিষয়কে ‘আইন/অধ্যাদেশ, বিধি ও নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে সংস্কার’ হিসাবে চিহ্নিত করেছে ঐকমত্য কমিশন।
আইআরআই জানিয়েছে, নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকা হালনাগাদ, প্রবাসী ভোটের জন্য প্রস্তুতি, ব্যালট মুদ্রণ ও কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণসহ নানা দিক থেকে অগ্রগতি দেখিয়েছে। নাগরিক পর্যবেক্ষণ সংস্থাগুলোর স্বীকৃতি প্রক্রিয়াও আগের তুলনায় খোলামেলা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।
তবে ইতিবাচক অগ্রগতির পাশাপাশি কিছু গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতা তুলে ধরেছে আইআরআই। সংস্থাটি বলছে, নির্বাচনের আইনি ভিত্তি এখনও অসম্পূর্ণ; নতুন গণপ্রতিনিধিত্ব আইন (আরপিও) এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে পাস হয়নি, যা প্রার্থিতা ও তদারকির স্বচ্ছতা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।
এ ছাড়া রাজনৈতিক দলগুলোর প্রার্থী মনোনয়নে স্বচ্ছতার অভাব, নারীর অংশগ্রহণের সীমাবদ্ধতা এবং নিরাপত্তা বাহিনীর নির্বাচনী ভূমিকা নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে আইআরআই। প্রতিবেদনে বলা হয়, সামরিক বাহিনীর অংশগ্রহণকে অনেকেই কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে দেখছেন, তবে এটি ‘নাগরিক প্রশাসনের ভারসাম্যে প্রশ্ন তুলতে পারে।’
প্রবাসী ভোটাধিকার উদ্যোগকেও ‘সাহসী কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে বর্ণনা করেছে আইআরআই। সংস্থাটি বলছে, ডাকযোগে ভোট পাঠানো ও যাচাইয়ের প্রক্রিয়া এখনও পর্যাপ্তভাবে স্পষ্ট নয়, যা ফলাফলের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে।
নির্বাচনকে এগিয়ে নিতে সুপারিশ
নির্বাচন কমিশন, সরকারি প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক দল এবং অন্যান্য নির্বাচনী অংশীদারদের বিবেচনার জন্য প্রতিবেদনে আট দফা সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে। নির্বাচন-পূর্ববর্তী বাকি সময়কালে এবং তার পরেও যদি এই ব্যবস্থাগুলো বাস্তবায়িত হয়, তাহলে তা বিশ্বাসযোগ্য ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করতে পারে বলে সংস্থাটি মনে করছে।
১. জুলাই সনদের বাস্তবায়ন চূড়ান্ত করা
রাজনৈতিক দলগুলোকে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’কার্যকর করার ব্যাপারে সুস্পষ্ট অঙ্গীকার করতে হবে। সময়সীমা নির্ধারণ, অমীমাংসিত বিধানগুলোর সমাধান এবং গণতান্ত্রিক সংস্কার বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি প্রকাশ্যে জানানো প্রয়োজন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে একযোগে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে কাজ করে গণভোটের জন্য আইনগতভাবে শক্তিশালী কাঠামো তৈরি করতে হবে। গণভোটের সময়সূচি ও পদ্ধতি স্বচ্ছ আইনগত ব্যাখ্যা এবং রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা উচিত, যাতে সংস্কার প্রক্রিয়া ও নির্বাচনের প্রতি জনআস্থা বজায় থাকে।
২. নাগরিক শিক্ষা জোরদার করা ও গণতান্ত্রিক সংস্কারকে সমর্থন দেওয়া
জুলাই সনদ ও প্রস্তাবিত সংস্কার সম্পর্কে জনগণের স্পষ্ট ধারণা নিশ্চিত করতে শক্তিশালী নাগরিক শিক্ষা অপরিহার্য। নির্বাচন কমিশন, রাজনৈতিক দল, গণমাধ্যম ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উচিত যৌথভাবে দেশব্যাপী প্রচারণা চালানো, যাতে ভোটাররা সাংবিধানিক পরিবর্তন ও নতুন নির্বাচনী পদ্ধতি সম্পর্কে জানেন। এই কার্যক্রমগুলো এমনভাবে পরিচালিত হওয়া দরকার, যাতে প্রথমবারের মতো ভোটার, তরুণ, নারী এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠী সহজে এর আওতায় আসে।
৩. নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়ানো
রাজনৈতিক ক্ষেত্রের প্রতিটি স্তরে নারীর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো জরুরি। রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত নারী প্রার্থীদের মনোনয়ন দেওয়া, নেতৃত্ব প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং সংরক্ষিত আসনের বাইরেও তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
দলগুলোকে মনোনয়ন ও প্রচারণার সময় নারীদের নিরাপত্তা ও অংশগ্রহণে জোর দিতে হবে।
৪. প্রার্থী নির্বাচনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা
রাজনৈতিক দলগুলোকে প্রার্থী মনোনয়নে স্বচ্ছ, ন্যায্য ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। বলপ্রয়োগ, অর্থপ্রভাব বা পক্ষপাতিত্বমুক্ত মনোনয়ন নিশ্চিত করতে দলীয় গণতন্ত্র জোরদার করা প্রয়োজন। মনোনয়ন পর্বে স্থানীয় সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ ও নারী প্রার্থীদের অংশগ্রহণে বিশেষ মনোযোগ দেওয়া উচিত।
৫. সমন্বিত নিরাপত্তা পরিকল্পনা গ্রহণ করা
নির্বাচন কমিশনের উচিত সেনাবাহিনী ও পুলিশের সঙ্গে সমন্বিত নিরাপত্তা পরিকল্পনা গ্রহণ করা, যাতে নির্বাচনী সহিংসতা প্রতিরোধ ও স্থানীয় উত্তেজনা প্রশমিত হয়। নির্বাচনের আগে ও চলাকালে জননিরাপত্তা রক্ষায় স্পষ্ট যোগাযোগব্যবস্থা, যৌথ প্রতিক্রিয়া কাঠামো এবং দায়িত্ব বণ্টন থাকা প্রয়োজন।
৬. নাগরিক নির্বাচন পর্যবেক্ষণে স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ানো
নির্বাচন কমিশনকে নাগরিক পর্যবেক্ষক সংস্থার অনুমোদনের জন্য স্পষ্ট, সহজলভ্য ও সময় সীমাবদ্ধ মানদণ্ড প্রকাশ করতে হবে। যদি কোনো সংস্থাকে অনুমোদন না দেওয়া হয়, তাহলে কারণ লিখিতভাবে জানাতে হবে, যাতে জবাবদিহিতা ও আস্থা বৃদ্ধি পায়। স্বীকৃত পর্যবেক্ষকদের নিরপেক্ষতা ও স্বাধীনতা বজায় রাখতে তাদের অঙ্গীকার প্রকাশ্যে পুনর্ব্যক্ত করা জরুরি। নির্বাচনের আগে কমিশনের উচিত পর্যবেক্ষক সংগঠনগুলোর সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক করে তা জানানো ও সর্বোত্তম চর্চা নিশ্চিত করা।
৭. রাজনৈতিক অর্থায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা
নির্বাচন কমিশনের উচিত রাজনৈতিক তহবিল সংগ্রহ ও ব্যয়ের তথ্য জনসম্মুখে প্রকাশ বাধ্যতামূলক করার আইনি উদ্যোগ নেওয়া। এতে নাগরিক ও গণমাধ্যম সহজেই অর্থের উৎস ও ব্যবহার পর্যবেক্ষণ করতে পারবে। তহবিল সম্পর্কিত ভুল তথ্য প্রদান বা গোপন রাখার ক্ষেত্রে কঠোর শাস্তি নির্ধারণ এবং স্বাধীন নিরীক্ষা ও নাগরিক সমাজের তদারকি উৎসাহিত করা উচিত।
৮. অবাধ, স্বাধীন ও বিশ্বাসযোগ্য তথ্য পরিবেশ নিশ্চিত করা
গণমাধ্যমের উচিত দলীয় পক্ষপাতিত্ব এড়িয়ে নিরপেক্ষতা বজায় রাখা এবং সম্পাদকীয় স্বাধীনতা রক্ষা করা।
সাংবাদিকদের ওপর রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক চাপমুক্তভাবে কাজ করার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
নাগরিক সমাজ ও নির্বাচন কমিশন একসঙ্গে ভোটার শিক্ষার মাধ্যমে মানুষকে ভুয়া বা বিভ্রান্তিকর তথ্য চিহ্নিত করতে সহায়তা করতে পারে, যাতে নির্বাচন প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ ও আস্থাযোগ্য হয়।