প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ০৪ নভেম্বর ২০২৫ ০০:৫২ এএম
মুখোমুখি বিতর্কে নিউইয়র্কের মেয়র নির্বাচনের দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী অ্যান্ড্রু কুয়োমো ও জোহরান মামদানি। ছবি: সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ব্যস্ত ও বৈচিত্র্যময় নগরী নিউইয়র্কে আজ মঙ্গলবার (৪ নভেম্বর) অনুষ্ঠিত হচ্ছে বহুল আলোচিত সিটি মেয়র নির্বাচন। এ প্রতিদ্বন্দ্বিতায় মুখোমুখি হয়েছেন তিন ভিন্নধারার তিন প্রার্থী। প্রগতিশীল ডেমোক্র্যাট জোহরান মামদানি, সাবেক গভর্নর অ্যান্ড্রু কুয়োমো (স্বতন্ত্র) ও রিপাবলিকান নেতা কার্টিস স্লিওয়া। তরুণ প্রজন্মের প্রেরণার প্রতীক হিসেবে মামদানি এগিয়ে থাকলেও কুয়োমোর স্বতন্ত্র প্রার্থিতা ভোটের ফলকে অনিশ্চিত করে তুলেছে বলে বিশ্লেষকদের মত।
নিউইয়র্ক সিটির নির্বাচন ব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল কাঠামোর অংশ হলেও এর স্থানীয় রূপ আলাদা। শহরটি প্রশাসনিকভাবে পাঁচটি বরোÑ ম্যানহাটন, ব্রুকলিন, কুইন্স, ব্রঙ্কস ও স্ট্যাটেন আইল্যান্ডে বিভক্ত। প্রতিটি বরো নিজস্ব প্রশাসনিক বোর্ড ও সিটি কাউন্সিলের মাধ্যমে পরিচালিত হলেও মেয়র নির্বাচন হয় শহরজুড়ে একক জনপ্রিয় ভোটে।
নির্বাচনের শেষ দিন সোমবার ছিল উত্তপ্ত প্রচারণায় মুখর। কুইন্সের হিলসাইড এভিনিউয়ে অনুষ্ঠিত নির্বাচনী জমায়েতে বাংলায় মুখরিত হয় জনসভা। জোহরান মামদানি সেখানে বলে ওঠেন, ‘আমার মেয়র, তোমার মেয়র’Ñ তখন জনতা উচ্চৈঃস্বরে জবাব দেয়, ‘মামদানি, মামদানি!’ এই দৃশ্য অভিবাসী বাঙালি সমাজে তুলেছে গভীর প্রতিধ্বনি। কুইন্সে আরেক জনসভায় তিনি বলেন, ‘নিউইয়র্ক শুধু ধনীদের নয়, বরং তাদের জন্য; যারা প্রতিদিন পরিশ্রম করে এই শহরকে সচল রাখে।’ তার প্রচারণার মূল ইস্যুÑ সাশ্রয়ী আবাসন, বিনামূল্যে গণপরিবহন ও করপোরেট কর সংস্কার, যা তরুণ ও অভিবাসী ভোটারদের মধ্যে প্রবল সাড়া ফেলেছে।
অন্যদিকে সাবেক গভর্নর অ্যান্ড্রু কুয়োমো ডেমোক্রেটিক প্রাইমারিতে পরাজয়ের পর স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে নেমেছেন। শেষ দিনের ম্যানহাটন র্যালিতে তিনি বলেন, ‘নিউইয়র্ককে আবার স্থিতিশীল নেতৃত্ব দিতে আমি ফিরে এসেছি।’ অভিজ্ঞ প্রশাসক হিসেবে কুয়োমো প্রতিশ্রুতি দিয়েছেনÑ অপরাধ দমন, অর্থনৈতিক ভারসাম্য ও অবকাঠামো উন্নয়নে ‘বাস্তবসম্মত নীতি’ গ্রহণ করবেন। তার প্রার্থিতা মূলত মধ্যপন্থী ভোটারদের টানছে, তবে এতে মামদানির প্রগতিশীল ভোটভিত্তি বিভক্ত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রিপাবলিকান নেতা কার্টিস স্লিওয়া, যিনি ‘গার্ডিয়ান অ্যাঞ্জেলস’ সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা, দীর্ঘদিন ধরেই আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা ইস্যুতে পরিচিত মুখ। ব্রুকলিনে শেষ দিনের সভায় তিনি বলেন, ‘ডেমোক্রেটিক শাসনে নিউইয়র্ক অনিরাপদ হয়েছে, এখন সময় এসেছে শক্ত নেতৃত্ব ফিরিয়ে আনার।’ তবে ঐতিহ্যগতভাবে ডেমোক্র্যাট প্রভাবিত এই নগরীতে তার সম্ভাবনা সীমিত বলেই ধরা হচ্ছে।
এবারের নির্বাচনে ভোটারদের প্রধান উদ্বেগÑ বাসস্থানের ব্যয়, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, করনীতি ও গণপরিবহনের সংকট। সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, মামদানি এগিয়ে আছেন প্রায় পাঁচ পয়েন্টে; তবে কুয়োমোর প্রার্থিতা ফলাফলকে অনিশ্চিত করেছে। নিউইয়র্ক টাইমস ও কুইন্স পাবলিক রেডিও জানিয়েছে, তরুণ ও অভিবাসী ভোটারদের উচ্চ অংশগ্রহণ ঘটলে শহরের রাজনীতিতে নতুন যুগের সূচনা ঘটতে পারে।
ভোট ব্যবস্থা
নিউইয়র্কের ভোটাররা সরাসরি জনপ্রিয় ভোটে মেয়র নির্বাচন করেন। ২০২১ সাল থেকে এখানে চালু হয়েছে ‘র্যাঙ্কড চয়েস ভোটিং’, যেখানে ভোটাররা সর্বোচ্চ পাঁচজন প্রার্থীকে পছন্দক্রমে (১ থেকে ৫) র্যাঙ্ক দিতে পারেন। কোনো প্রার্থী প্রথম পছন্দে ৫০ শতাংশের বেশি ভোট না পেলে সর্বনিম্ন ভোটপ্রাপ্ত প্রার্থী বাদ পড়ে যান এবং তার ভোট দ্বিতীয় পছন্দ অনুযায়ী পুনর্বণ্টিত হয়; এভাবে ধাপে ধাপে গণনা চলতে থাকে যতক্ষণ না একজন প্রার্থী সংখ্যাগরিষ্ঠতা পান।
ভোট পরিচালনা করছে নিউইয়র্ক সিটি বোর্ড অব ইলেকশনস; যা ভোটার নিবন্ধন, কেন্দ্র নির্ধারণ, ব্যালট বিতরণ ও গণনা সম্পন্ন করে। সকাল ৬টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ চলবে। মেয়রের পাশাপাশি নাগরিকরা সিটি কাউন্সিল সদস্য, বরো প্রেসিডেন্ট, পাবলিক অ্যাডভোকেট ও কম্পট্রোলারসহ অন্যান্য স্থানীয় কর্মকর্তাকেও সরাসরি ভোটে নির্বাচিত করেন।
নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের মতে, আজকের ভোট কেবল মেয়র নির্বাচন নয়, এটি নিউইয়র্কের প্রগতিশীল রাজনীতি বনাম প্রথাগত নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নির্ধারণের এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত।