প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ০২ নভেম্বর ২০২৫ ২১:৫০ পিএম
আপডেট : ০২ নভেম্বর ২০২৫ ২১:৫০ পিএম
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার পরিচালক তুলসি গ্যাবার্ড।
ল্যাটিন আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে এখনও অতীতের কৌশল যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড চালালেও দেশটির জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার পরিচালক তুলসি গ্যাবার্ড বলেছেন, মার্কিন ‘শাসক বদল’ নীতি এখন অতীত।
গত শুক্রবার (৩১ অক্টোবর) বাহরাইনে ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর সিকিউরিটি স্টাডিজ কর্তৃক আয়োজিত বার্ষিক নিরাপত্তা শীর্ষ সম্মেলন ‘মানামা সংলাপ’ এর আগে তুলসি গ্যাবার্ডের এই মন্তব্য, এই বছরের শুরুতে মধ্যপ্রাচ্য সফরে ট্রাম্পের দেওয়া মন্তব্যের প্রতিধ্বনি।
এপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে মধ্যপ্রাচ্যে মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের প্রচারের পূর্ববর্তী মার্কিন লক্ষ্যগুলো- অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার উপর জোর দিয়ে প্রতিস্থাপিত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে- গাজায় ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধ বন্ধ করে দেওয়া, যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করা, সেইসঙ্গে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলিতে আক্রমণ করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বোমারু বিমান পাঠানোর পর ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের ১২ দিনের যুদ্ধের অবসান ঘটাতে বাধ্য করা।
গ্যাবার্ডের মন্তব্য ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের ঘোষিত নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তুলসি গ্যাবার্ড বলেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি এক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে, যেখানে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে।
চলতি বছরের শুরুর দিকে মধ্যপ্রাচ্য সফরে ট্রাম্পও ঘোষণা দিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র আর অন্য দেশের সরকার পরিবর্তনে হস্তক্ষেপ করবে না, বরং ‘স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিক অংশীদারিত্ব’ বাড়ানোই হবে প্রধান লক্ষ্য।
তুলসি গ্যাবার্ড, যিনি সাবেক কংগ্রেস সদস্য ও যুক্তরাষ্ট্রের আর্মি ন্যাশনাল গার্ডের সাবেক কর্মকর্তা, বলেন, “দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে আমাদের পররাষ্ট্রনীতি এক ব্যর্থ ও অকার্যকর চক্রে আটকে ছিল—শাসক বদল ও জাতি গঠনের নামে।”
তিনি বলেন, “একই ধাঁচের একমুখী নীতি চালিয়ে যাওয়া হয়েছে—অন্য দেশের সরকার উৎখাত, নিজের শাসন ব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়া, এমন সব সংঘাতে হস্তক্ষেপ করা যেগুলোর বাস্তবতা ঠিকমতো বোঝাই হয়নি। শেষ পর্যন্ত আমরা পেয়েছি—অসংখ্য প্রাণহানি, অগণিত ট্রিলিয়ন ডলার ক্ষয় আর শত্রুর সংখ্যা বেড়ে যাওয়া।”
গ্যাবার্ডের এই বক্তব্য ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর শুরু হওয়া মার্কিন যুদ্ধনীতি নিয়ে ট্রাম্পের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন ঘটায়। ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদেই আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের চুক্তি করেন, যা পরবর্তী বাইডেন প্রশাসনে ২০২১ সালে বিশৃঙ্খলভাবে শেষ হয়।
এদিকে, সিরিয়ার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট আহমদ আল-শারা, যিনি একসময় ইরাকে মার্কিন বন্দী ছিলেন ও আল-কায়েদার সাবেক যোদ্ধা—তার সঙ্গেও ট্রাম্প প্রশাসন ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
গ্যাবার্ড তার বক্তব্যে বলেন, “গাজা উপত্যকায় যুদ্ধবিরতি এখনো ভঙ্গুর। ইরানও রয়ে গেছে উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দুতে। আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার প্রধানের সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে নতুন করে কার্যক্রম শুরু হয়েছে।”
গ্যাবার্ড আরও বলেন, “আগামীর পথ সহজ নয়, কিন্তু প্রেসিডেন্ট এই দিকেই দৃঢ়ভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ।”
তবে গ্যাবার্ড তার বক্তব্যে দক্ষিণ আমেরিকার প্রসঙ্গ উত্থাপন করেননি, যেখানে ট্রাম্প প্রশাসন সম্প্রতি যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন, মাদকবাহী নৌকা ধ্বংস এবং ভেনেজুয়েলাকে লক্ষ্য করে সিআইএ’র গোপন অভিযানের নির্দেশ দিয়েছেন। এসব পদক্ষেপকে ঘিরে অঞ্চলটিতে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হস্তক্ষেপ ও শাসন পরিবর্তনের আশঙ্কা বেড়েছে।
বাহরাইনে আয়োজিত এই সম্মেলনকে ঘিরেও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি)-এর এক সাংবাদিককে অনুষ্ঠানে কভার করার জন্য পূর্বে অনুমোদন ও ভিসা দেওয়া হলেও গত ২৯ অক্টোবর (বুধবার) বাহরাইন সরকার সেই অনুমতি রহস্যজনকভাবে বাতিল করে দেয়। একই দিনে এপি প্রকাশ করে একটি প্রতিবেদন, যেখানে দীর্ঘদিন ধরে আটক মানবাধিকার কর্মী আবদুলহাদি আল-খাওয়াজার অনশন ধর্মঘটের কথা উল্লেখ ছিল।
তবে শুক্রবার রাতে খাওয়াজা তার অনশন স্থগিত করেন। তার মেয়ে মরিয়ম আল-খাওয়াজা জানান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ডেনমার্ক সরকারের প্রতিনিধিদের চিঠি পাওয়ার পর তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
তুলসি গ্যাবার্ডের বক্তব্যে স্পষ্ট যে, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নীতির কেন্দ্রবিন্দুতে এখন আর রাজনৈতিক পুনর্গঠন নয়, বরং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা। তবে এই পরিবর্তনের বাস্তব প্রভাব কতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে, তা নির্ভর করছে গাজা যুদ্ধবিরতি ও ইরানের পারমাণবিক ইস্যুর পরবর্তী গতিপ্রকৃতির ওপর।