তানজানিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন
প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ০১ নভেম্বর ২০২৫ ২০:৪০ পিএম
তানজানিয়ার প্রেসিডেন্ট সামিয়া সুলুহু হাসান। ছবি: সংগৃহীত
তানজানিয়ার প্রেসিডেন্ট সামিয়া সুলুহু হাসান আবারও দেশটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন; তবে এবার তার বিজয় এসেছে এক বিতর্কিত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে।
শনিবার (১ নভেম্বর) দেশটির নির্বাচন কমিশন জানায়, গত বুধবার অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সামিয়া ৯৭ দশমিক ৬৬ শতাংশ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তবে মূল প্রতিদ্বন্দ্বী দল ও প্রার্থীরা নির্বাচনের আগেই প্রতিযোগিতা থেকে বাদ পড়ায় এ ফলকে বিরোধীরা ‘গণতান্ত্রিক প্রহসন’ হিসেবে অভিহিত করেছে।
প্রধান বিরোধী দল চাদেমা নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অনুমতি না পেয়ে ফলাফলকে প্রত্যাখ্যান করেছে। দলের মুখপাত্র জন কিতোকা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এএফপিকে বলেন, ‘এটি গণতন্ত্রের প্রতি চরম উপহাস। আমরা একটি নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক সংস্থার তত্ত্বাবধানে পুনর্নির্বাচনের দাবি জানাচ্ছি।’
ফল ঘোষণার পর রাজধানী দোদোমায় বক্তৃতায় প্রেসিডেন্ট হাসান বলেন, ‘যারা রাস্তায় নেমে সহিংসতা সৃষ্টি করেছে তারা দায়িত্বজ্ঞানহীন ও দেশবিরোধী আচরণ করছে। তানজানিয়ার নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো আপস নেই। দেশের নিরাপত্তা রক্ষায় সব ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
সহিংস প্রতিবাদ ও শতাধিক মৃত্যুর অভিযোগ
নির্বাচনের আগেই বিরোধীদের মাঠে নামা ঠেকাতে ব্যাপক দমন-পীড়ন চলেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ভোটের দিন রাজধানীসহ বেশ কিছু শহরে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। সরকারি ভবনে আগুন দেওয়া হয়, হাসানের নির্বাচনী ব্যানার ছিঁড়ে ফেলা হয়, আর নিরাপত্তা বাহিনীর টিয়ার গ্যাস ও গুলিতে বহু মানুষ আহত হয়।
ইন্টারনেট পর্যবেক্ষণ সংস্থা নেটব্লকস জানিয়েছে, ভোটের দিন ও পরদিন তানজানিয়ার বিভিন্ন শহরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও মোবাইল ইন্টারনেট সংযোগ সীমিত বা বন্ধ রাখা হয়।
চাদেমা দাবি করেছে, ‘হাসপাতাল ও ক্লিনিকভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী কমপক্ষে ৭০০ জন নিহত হয়েছেন।’ শনিবার দলটির মুখপাত্র জানান, দলীয় পর্যবেক্ষকদের তথ্যে নিহতের সংখ্যা ‘৮০০ জনের কম নয়’। তবে জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যালয় জানিয়েছে, তাদের কাছে পাওয়া ‘বিশ্বস্ত তথ্য’ অনুযায়ী তিনটি শহরে অন্তত ১০ জন নিহত হয়েছে।
সরকারের অস্বীকৃতি
পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাহমুদ থাবিত কম্বো আল জাজিরাকে বলেন, ‘নির্বাচনে অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করা হয়নি। সবকিছু ন্যায্যভাবেই সম্পন্ন হয়েছে। আমরা কোনো সরকারি তথ্য পাইনি যে শত শত মানুষ নিহত হয়েছেন। আমি কোথাও এই ৭০০ জনকে দেখিনি।’
আন্তর্জাতিক উদ্বেগ
ইউরোপীয় কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস (ইসিএফআর)-এর আফ্রিকা বিষয়ক পরিচালক অ্যালেক্স ভাইন্স বলেন, ‘বিরোধীদের বিরুদ্ধে হয়রানি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের ধারাবাহিক প্রচারণা চলেছে। এটি কোনোভাবেই বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন নয়।’
তিনি আরও বলেন, তানজানিয়ায় এত ব্যাপক সহিংসতা অপ্রত্যাশিত ছিল এবং অধিকাংশ বিক্ষোভকারী ছিলেন তরুণ প্রজন্মের মানুষ; মূলত জেনারেশন জেড। ‘তারা মনে করছে দেশ তাদের পিছনে ফেলে যাচ্ছে,’ বলেন ভাইন্স।
জাতিসংঘ মহাসচিব অন্তোনিও গুতেরেস তানজানিয়ার পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। জাতিসংঘের মুখপাত্র এক বিবৃতিতে বলেন, ‘বিক্ষোভে নিহত ও আহতদের খবর অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আমরা সব পক্ষকে সহিংসতা এড়িয়ে সংলাপের পথে আসার আহ্বান জানাই।’
বিরোধী নেতাদের কারাবন্দি
২০২১ সালে প্রেসিডেন্ট জন মাগুফুলির মৃত্যুর পর ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে সামিয়া সুলুহু হাসান ক্ষমতায় আসেন। এবারের নির্বাচনে তার বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার কথা ছিল প্রধান বিরোধী নেতা তুনদু লিসুর। কিন্তু তাকে কয়েক মাস আগে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে কারাগারে পাঠানো হয়, কারণ তিনি ভোট সংস্কারের দাবি জানিয়েছিলেন। আরেক নেতা, লুহাগা ম্পিনা, নির্বাচনে অংশগ্রহণের অনুমতিই পাননি।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দাবি, ভোটের আগে থেকেই সরকার বিরোধীদের ওপর ‘সন্ত্রাসের রাজত্ব’ কায়েম করে রেখেছিল। অপহরণ, নির্যাতন, এবং ভয়ভীতির একাধিক ঘটনা ঘটেছে। সরকার অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
তানজানিয়ার এই নির্বাচন এখন আফ্রিকার রাজনৈতিক মহলে নতুন এক আলোচনার জন্ম দিয়েছে, যেখানে ক্ষমতাসীনদের ‘অবাধ ভোটে বিজয়’ বারবার প্রশ্নের মুখে পড়ছে; আর শাসনব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতায় তরুণ প্রজন্মের হতাশা বাড়ছে।