× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বারঘুতিকে ইসরায়েলের এত ভয় কেন

আজাদ-আল-আমিন

প্রকাশ : ২২ অক্টোবর ২০২৫ ১৩:৪০ পিএম

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

ফিলিস্তিনি রাজনীতির দীর্ঘ ইতিহাসে এমন কিছু নাম আছে, যেগুলো শুধু নেতৃত্ব নয়, প্রতিরোধ ও মর্যাদার প্রতীক হয়ে উঠেছে। মারওয়ান বারঘুতি সেই নামগুলোর শীর্ষে। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ইসরায়েলের কারাগারে বন্দি থেকেও তিনি আজ ফিলিস্তিনি জাতির কাছে সবচেয়ে জনপ্রিয় ও গ্রহণযোগ্য নেতা। তার উপস্থিতি রাজনীতিতে নেই, কিন্তু প্রভাব আছে প্রতিটি রাজনৈতিক সমীকরণে। এই কারণেই ইসরায়েল তাকে ভয় পায়; কারণ, বারঘুতি মুক্ত হলে ফিলিস্তিনের ভেতরকার বিভাজন ভেঙে, নতুনভাবে ঐক্যবদ্ধ ও বৈধ আন্দোলনের জন্ম হতে পারে।

প্যালেস্টিনিয়ান সেন্টার ফর পলিসি অ্যান্ড সার্ভে রিসার্সের (পিএসআর) একাধিক জরিপে দেখা গেছে, যদি আজ ফিলিস্তিনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তাহলে মারওয়ান বারঘুতি একাই মাহমুদ আব্বাস ও হামাসের যেকোনো নেতাকে বিপুল ব্যবধানে পরাজিত করতে পারেন। ২০২৪ সালের এক জরিপে তার জনপ্রিয়তা ছিল ৬০ শতাংশের ওপরে, যেখানে আব্বাসের ছিল মাত্র ২২ শতাংশ। গাজা ও পশ্চিম তীরÑ দুই অঞ্চলেই তিনি সমানভাবে গ্রহণযোগ্য।

এই জনপ্রিয়তা ইসরায়েলের জন্য কেবল রাজনৈতিক নয়, কৌশলগত উদ্বেগেরও কারণ। ফাতাহ ও হামাসের মধ্যে বছরের পর বছর ধরে চলা বিভাজন ইসরায়েলের জন্য এক ধরনের সুবিধাজনক অবস্থা তৈরি করেছে। বিভক্ত ফিলিস্তিন মানে দুর্বল প্রতিরোধ, বিভক্ত নেতৃত্ব এবং আলোচনার টেবিলে কোনো একক কণ্ঠ নেই। বারঘুতি মুক্ত হলে সেই বিভাজন ভেঙে যেতে পারে, যা ইসরায়েলের বহুদিনের ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ কৌশলকে অকার্যকর করে দেবে।

বারঘুতি জর্ডান নিয়ন্ত্রিত পশ্চিম তীরের কবার গ্রামে ১৯৫৯ সালে জন্মগ্রহণ করেন। ছোটবেলা থেকেই তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন এবং ছাত্র-আন্দোলনে অংশ নেন। শিক্ষাজীবনে তিনি ফিলিস্তিনের বিরজেইত বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন এবং ছাত্রসংগঠনেও সক্রিয় ভূমিকা নেন। ১৯৮০’র দশকে তিনি প্রথম কারাবন্দি হন রাজনৈতিক কারণে। তিনি ১৯৮৭ সালের প্রথম ইন্তিফাদার সময় ইসরায়েল কর্তৃক জর্ডানে নির্বাসিত হন। এই সময়ের মধ্য দিয়ে তিনি রাজনৈতিক দৃঢ়তা ও জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। ১৯৯৩ সালে অসলো চুক্তি স্বাক্ষরের পরই তাকে ফিলিস্তিনে (পশ্চিম তীর) ফিরে আসার অনুমতি দেওয়া হয়। ১৯৯৬ সালে তিনি ফিলিস্তিনি আইনসভায় নির্বাচিত হন। এরপর তিনি ফাতাহর তরুণ নেতৃত্ব হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন। দ্বিতীয় ইন্তিফাদা (২০০০-২০০৫) চলাকালীন তিনি ‘তানজিম’ নামে একটি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন, যা ফাতাহের যুবদল হিসেবে সক্রিয় ছিল। ২০০২ সালে ইসরায়েল বারঘুতিকে গ্রেপ্তার করে। 

ইসরায়েলি আদালত ২০০৪ সালে বারঘুতিকে দ্বিতীয় ইন্তিফাদায় ভূমিকার অভিযোগে একাধিক যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়। কিন্তু তিনি শুরু থেকেই বলেন, এটি রাজনৈতিক মামলা। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বারবার তার বিচারের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

তবে বারঘুতি কেবল একজন সাবেক যোদ্ধা নন। বন্দিজীবনে তিনি প্রতিরোধের অর্থ বদলে দিয়েছেন; সহিংসতার পরিবর্তে ঐক্য ও রাজনৈতিক লড়াইকে সামনে এনেছেন। ২০০৬ সালে তিনি কারাগার থেকেই ‘বন্দিদের দলিল’ নামে একটি ঐক্যঘোষণা লেখেন, যা পরবর্তীতে ফাতাহ ও হামাস উভয়ের মধ্যে সমঝোতার ভিত্তি হয়ে ওঠে। তার এই উদ্যোগ ইসরায়েলি নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের উদ্বিগ্ন করে, কারণ এটি প্রমাণ করেÑ বন্দি অবস্থাতেও বারঘুতি ফিলিস্তিনি রাজনীতির গতিপথে প্রভাব ফেলতে সক্ষম।

ফিলিস্তিনি রাজনীতিতে বারঘুতির এক বিশেষত্ব আছে; তিনি একই সঙ্গে ফাতাহ ও হামাস উভয় শিবিরেই সম্মানিত। ফাতাহ তাকে নিজের ঐতিহ্যবাহী ধারার উত্তরসূরি মনে করে, আর হামাস তাকে ‘জাতীয় ঐক্যের প্রতীক’ হিসেবে দেখে।

হামাসের রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য খালেদ মেশাল ২০২৩ সালে আলজাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘যদি কোনো একক নেতা ফিলিস্তিনিদের ঐক্যবদ্ধ করতে পারেন, তবে তিনি মারওয়ান বারঘুতি।’ এমন মন্তব্য হামাসের কাছ থেকে আসা ইসরায়েলের জন্য স্পষ্ট সতর্কবার্তা। কারণ, একজন নেতা যদি দুই প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীকেই এক ছাতার নিচে আনতে পারেন, তবে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনের দাবিটা নতুন মাত্রা পাবে।

বারঘুতিকে অনেক পশ্চিমা পর্যবেক্ষক ‘ফিলিস্তিনের নেলসন ম্যান্ডেলা’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। দ্য গার্ডিয়ান, লে মন্ডে এবং দি নিউইয়র্ক টাইমসÑ সবখানেই তার ওপর একাধিক বিশ্লেষণ প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে তাকে ‘দুই রাষ্ট্র সমাধানের সম্ভাব্য সেতুবন্ধকারী’ হিসেবে দেখা হয়।

তিনি অসলো চুক্তির সময়ে ফাতাহ আন্দোলনের অন্যতম কণ্ঠ ছিলেন এবং শান্তিপূর্ণ সমাধানের পক্ষে ছিলেন যতক্ষণ পর্যন্ত না ইসরায়েল সেই চুক্তির প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে। তার রাজনৈতিক ভাষা পশ্চিমা কূটনীতির কাছেও বোধগম্য। এজন্যই ইসরায়েল তাকে মুক্তি দিতে ভয় পায়; কারণ, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তাকে ‘মধ্যপন্থী ও বৈধ’ নেতা হিসেবে গ্রহণ করতে পারে, যিনি হামাসের মতো সংগঠনগুলোর বিকল্প হতে পারেন। ফলে ইসরায়েলের বর্তমান সরকারÑ বিশেষত, বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী জোট যেকোনো শক্তিশালী ফিলিস্তিনি নেতৃত্বের উত্থানকে হুমকি হিসেবে দেখে। বারঘুতির মুক্তি মানে নতুন করে ‘দুই রাষ্ট্র সমাধান’ ইস্যু আন্তর্জাতিকভাবে ফিরে আসা, যা ইসরায়েলের দখলনীতি ও বসতি সম্প্রসারণ প্রকল্পের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

২০২৪ সালের শেষ দিকে ইসরায়েলের ‘উদারপন্থী’ সংবাদপত্র হারেৎজ লিখেছিল, বারঘুতি একমাত্র ফিলিস্তিনি নেতা যিনি ইসরায়েল ও পশ্চিমা বিশ্বের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেতে পারেন এবং সেটিই তাকে সবচেয়ে বিপজ্জনক করে তুলেছে। ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থা শিন বেত ও সামরিক গোয়েন্দা বিভাগ আমানের মধ্যে বারঘুতির সম্ভাব্য মুক্তি নিয়ে বারবার আলোচনা হয়েছে। কিন্তু সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত ‘তাকে বন্দি রাখাইÑ ইসরায়েলের স্বার্থে’।

মারওয়ান বারঘুতির ভয়াবহতা তার অস্ত্র বা বাহিনীতে নয়, তার ধারণায়। তিনি প্রতিরোধের এমন এক নৈতিক রূপ দাঁড় করিয়েছেন, যা সহিংসতার বদলে মর্যাদা, ঐক্য ও মানবিক অধিকারের ভাষায় কথা বলে।

কারাগারে থেকেও তিনি শতাধিক বন্দি অনশন আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন, ফিলিস্তিনিদের উদ্দেশে চিঠি লিখেছেন, যেখানে বার্তা একটাইÑ ‘আমাদের শক্তি ঐক্যে, অস্ত্রে নয়।’

ইসরায়েল জানে, এমন এক প্রতীককে হত্যা করা তাকে শহীদ বানাবে, আর মুক্ত করা তাকে ইতিহাসের নায়ক করে তুলবে। তাই তাকে বন্দি রেখেই ‘নিয়ন্ত্রণে’ রাখার নীতি চলছে, যেন তিনি জীবিত থাকেন, কিন্তু সক্রিয় না হতে পারেন।

ইসরায়েল মারওয়ান বারঘুতিকে ভয় পায়Ñ কারণ, তিনি এমন এক সম্ভাবনার প্রতীক, যা ইসরায়েলি দখলনীতির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ঐক্য ও আন্তর্জাতিক সহানুভূতির ঢেউ তুলতে পারে। তিনি বন্দি হলেও, তার ভাবনা মুক্ত; তার নামই এখন এক রাজনৈতিক শক্তি।

যে নেতা বন্দিত্বের মধ্যেও জাতিকে একত্র করতে পারে, তাকে ভয় পাওয়াই স্বাভাবিক; বিশেষত, সেই রাষ্ট্রের জন্য, যে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে চায় বিভাজনের ওপর নির্ভর করে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা