প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ১১ অক্টোবর ২০২৫ ০৯:০৫ এএম
গাজার উত্তরাঞ্চলে ফিরতে শুরু করেছে হাজার হাজার ফিলিস্তিনি। ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর গতকাল শুক্রবার গাজাবাসী তাদের বিধ্বস্ত বাড়িঘরে ফিরতে শুরু করে। ইসরায়েলি সেনারা গাজার কিছু এলাকা থেকে পিছু হটা শুরু করলে তারা হেঁটে দলে দলে তাদের জন্মভূমিতে ফিরতে থাকে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের বিশেষ প্রতিনিধি স্টিভ উইটকফ এক্সে বলেন, ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী গাজা থেকে প্রথম পর্যায়ের সেনা প্রত্যাহার শেষ করেছে। আর জিম্মি ও বন্দি মুক্তির ৭২ ঘণ্টা সময়সীমা শুরু হয়েছে। যুদ্ধবিরতি চুক্তির আওতায় আগামী সোমবারের মধ্যে ইসরায়েলি জিম্মিদের মুক্তি দিতে হবে হামাসকে। আর ইসরায়েল দুই শতাধিক ফিলিস্তিনি বন্দিকে মুক্তি দেবে। ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি ও জিম্মি মুক্তির পরিকল্পনা ইসরায়েল সরকার অনুমোদন করার পর এসব বিষয় সামনে আসে। চুক্তি অনুযায়ী, গাজার ২০ লাখ মানুষকে সহায়তার জন্য ত্রাণবাহী ট্রাকগুলো সেদিকে রওনা দেবে বলে আশা করা হচ্ছে। গাজার এসব মানুষের বেশিরভাগই বাস্তুচ্যুত হয়েছিল।
যুদ্ধবিরতির মধ্যেই শুক্রবার সকালে গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় নিহত সাতজনের মরদেহ বিভিন্ন এলাকা থেকে উদ্ধার হয়েছে বলে আল-আহলি হাসপাতাল সূত্র জানায়।
এদিকে বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করা চিত্রে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) প্রত্যাহারের প্রমাণ পাওয়া গেছে। ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করা এক ক্লিপে দেখা গেছে, ভারী যন্ত্রপাতি দক্ষিণ দিকে নেওয়া হচ্ছে। গাজার শহরের তেল আল-হাওয়ার জর্দানীয় অস্থায়ী হাসপাতাল থেকে ভিডিওটি ধারণ করা হয়েছে। গাজা শহর দখলে আইডিএফের অভিযানে গত আগস্টে এখানে বেশ সামরিক তৎপরতা দেখা গেছে। এ ছাড়া উত্তর গাজা থেকে ট্যাংক ও অন্যান্য সামরিক যানবাহনকে ইসরায়েলে ফিরে যেতে দেখা গেছে। স্যাটেলাইটের চিত্রের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা গেছে, উপকূলের নিকটবর্তী ওয়েস্টার্ন ইরেজ সীমান্ত ব্যবহার করছে এগুলো।
এদিকে ৪৮ জিম্মিকে মুক্তির জন্য ৭২ ঘণ্টা সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে। ইসরায়েলের ধারণা, এখনও ২০ জিম্মি জীবিত রয়েছে। আর ইসরায়েল ২৫০ ফিলিস্তিনি বন্দিকে মুক্তি দেবে, যাদের তালিকা তারা প্রকাশ করেছে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর সংবাদ অনুযায়ী, ২৫০ জনের মধ্যে পাঁচজনকে পূর্ব জেরুজালেমে, ১০০ জনকে পশ্চিম তীরে এবং ১৪৫ জনকে ফেরত পাঠানো হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
চুক্তির একটি অংশ হলো গাজায় শর্তহীন ত্রাণ প্রবেশ। কিন্তু প্রবেশের বিষয়ে একটি শব্দও নেই- প্রতিদিন প্রায় ৬০০ ট্রাক প্রবেশ করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জাতিসংঘের ত্রাণ সংস্থা জানায়, তারা গাজায় ত্রাণ নিয়ে যেতে প্রস্তুত। কিন্তু কীভাবে তারা সেখানে কার্যক্রম চালাবে, এটা অস্পষ্ট। বৃহস্পতিবার জাতিসংঘের মানবিক কার্যক্রমের সমন্বয়ক টম ফ্লেচার ত্রাণ বিতরণে ৬০ দিনের কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেন। এই পরিকল্পনায় রয়েছে হাসপাতাল ও বিদ্যালয় পুনর্গঠন এবং জ্বালানি। কিন্তু শুক্রবার জেনেভায় সাহায্য সংস্থা স্বীকার করেছে, তাদের ভূমিকা কী হবে, এ বিষয়ে যুদ্ধবিরতিতে জড়িত কোনো পক্ষই তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেনি।
সব সংস্থা জানিয়েছে, তাদের সরবরাহ প্রস্তুত রয়েছে এবং যেকোনো সময় যেতে প্রস্তুত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে, ‘সামনে অনেক কাজ।’ এদিকে ইউনিসেফ আশা করছে, যুদ্ধবিরতি হওয়ায় স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবে শিশুরা। সংস্থার মুখপাত্র টেস ইনগ্রাম বলেন, গাজার শিশুরা স্বাভাবিক জীবনে ফেরা নিয়ে ব্যাপক উৎসাহী। তিনি বলেন, ‘শিশুরা লাফালাফি করছে, উদযাপন করছে; এক শিশু আমাকে জড়িয়ে ধরে বলেছে, আপনাকে ধন্যবাদ।
অনেকেই ২০ কিমি পথ পাড়ি দিয়ে হেঁটে গাজায় ফিরছে। তাদের যেটুকু সহায়-সম্বল অবশিষ্ট আছে, সেগুলো পিঠে নিয়ে তার রওনা হয়েছে। আর যাদের সামর্থ্য আছে, তারা বেশি ভাড়ায় গাধার গাড়ি বা ছোট ট্রাকে করে উত্তরের পথে কঠিন যাত্রা শুরু করেছে। সাগরের পাশের ক্ষতিগ্রস্ত সরু সড়ক ধরে তারা রওনা হয়েছে। কেউ কেউ ফিলিস্তিনি পতাকা ওড়াচ্ছে, কেউ ‘ভি’ চিহ্ন দেখাচ্ছে। কিন্তু তাদের চেহারায় ক্লান্তির ছাপ। ক্ষুধা, ভয় ও বাস্তুচ্যুতের ফলে তারা অপুষ্টি ও দুর্বল হয়ে পড়েছে।
গাজা শহর থেকে খান ইউনিসে স্ত্রী ও ছয় সন্তানসহ পালিয়ে যাওয়া স্কুলশিক্ষক আলা সালেহ বলেন, ‘পানি ও খাবার নেই। অনেক কঠিন ও দীর্ঘপথ।’ তিনি বলেন, ‘আমি আমার পরিবার রেখে এসেছি এবং উত্তরে হাঁটা শুরু করেছি। আমার চারপাশে অনেকেই কষ্ট করছে। একটা কার ভাড়া করতে চার হাজার শেকেল (১২২৭ ডলার) প্রয়োজন, যা বেশিরভাগ মানুষের সামর্থ্য নাই।’
যারা ফিরছেন, তারা বলছেন, নিরাপত্তায় বিশ্বাস নেই তাদের। বরং ভয় ও শঙ্কা তাদের তাড়া করছে। অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে, উত্তরের শেখ রাদওযান, দক্ষিণ ও পূর্বের সাব্রা ও জয়তুন মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। গাজার কয়েকটি শহর থেকে ইসরায়েলি বাহিনী প্রত্যাহার করা হলেও, কয়েকটি এলাকায় প্রবেশে কড়াকড়ি রয়েছে। ভয় জেঁকে বসেছে।
গাজার উত্তরাঞ্চলের জাবালিয়ায় ফিরছিলেন ওয়ায়েল আল-নাজ্জার। তিনি বলেন, যুদ্ধ চলাকালে তিনবার বাস্তুচ্যুত হয়েছি। যুদ্ধবিরতি চুক্তি ঘোষণা হওয়ার পরপরই বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি নেন। তিনি বিবিসির এক ফ্রিল্যান্সারকে বলেন, ‘ক্রসিংয়ে বসে আমরা অপেক্ষা করছি। বাড়ি ফেরার অপেক্ষায় গত রাতে আমি ও আমার সন্তান এখানে শীতের মধ্যে ফুটপাতে ঘুমিয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা আমাদের লোকজনের কাছে ফিরে যাব। যদিও বাড়িঘর বিধ্বস্ত হয়ে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। আমরা ফিরে গিয়ে তাঁবু টানাব।’
গাজা সিটির শেখ রাদওয়ান এলাকার বাসিন্দা ইসমাইল জায়দা (৪০) বলেন, ‘আমার বাড়িটা এখনও দাঁড়িয়ে আছে। এজন্য আল্লাহকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। কিন্তু চারপাশের সব শেষ। আমার প্রতিবেশীদের বাড়ি ধ্বংস হয়ে গেছে; পুরো পাড়াপড়শি নিশ্চিহ্ন।’
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, শুক্রবার স্থানীয় সময় দুপুরে যুদ্ধবিরতি আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হয়েছে। ইসরায়েল সরকার ভোরের দিকে হামাসের সঙ্গে এই যুদ্ধবিরতি চুক্তি অনুমোদন করে, যার ফলে আংশিকভাবে সেনা প্রত্যাহার এবং ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পুরোপুরি যুদ্ধবিরতি কার্যকর করার পথ খুলে যায়।
গাজায় দুই বছর ধরে চলা যুদ্ধের অবসান ঘটাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের উদ্যোগের প্রথম ধাপে ইসরায়েলি বাহিনীকে গাজার প্রধান শহরগুলো থেকে সরে আসতে বলা হয়েছে। যদিও তারা উপত্যকার প্রায় অর্ধেক এলাকার নিয়ন্ত্রণে থাকবে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু শুক্রবার সকালে এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বলেছেন, সরকার সব ফিলিস্তিনি জিম্মিকে মুক্তি দিতে একটি প্রক্রিয়া অনুমোদন করেছে। গাজার দক্ষিণাঞ্চলীয় খান ইউনিস শহরের বাসিন্দাদের বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, কিছু ইসরায়েলি সেনা গাজার পূর্ব দিকে সীমান্তসংলগ্ন এলাকা থেকে পিছু হটেছে; যদিও সেখানে ট্যাংক থেকে গোলাবর্ষণের শব্দ শোনা গেছে।
গাজার কেন্দ্রস্থল নুসেইরাত শরণার্থী শিবিরে কিছু ইসরায়েলি সেনা তাদের সামরিক অবস্থান গুটিয়ে ইসরায়েলি সীমান্তের দিকে চলে যায়। তবে ভোরের দিকে গোলাগুলির শব্দ শোনার পর বাকি সেনারা সেই এলাকাতেই থেকে যায়।
ভূমধ্যসাগরীয় উপকূল ধরে গাজা সিটির দিকে যাওয়ার রাস্তা থেকে ইসরায়েলি বাহিনী সরে এসেছে। গত মাসজুড়ে ইসরায়েলি আক্রমণের শিকার এই অঞ্চলে ফিরে যাওয়ার আশায় সেখানে শত শত মানুষ জড়ো হয়। তবে কাছাকাছি গোলাগুলির শব্দ শুনে অনেকে সামনে এগোনোর বিষয়ে দ্বিধান্বিত ছিল। বাসিন্দারা জানায়, হাতেগোনা কয়েকজন হেঁটে রাস্তা পার হওয়ার চেষ্টা করছিল।
দীর্ঘ দুই বছর পর বাড়ি ফেরার অনুভূতি জানিয়ে মাহদি সাকলা (৪০) বলেন, ‘আমরা যুদ্ধবিরতি এবং অস্ত্রবিরতির খবর শোনার সঙ্গে সঙ্গেই খুব খুশি হয়েছিলাম। গাজা সিটিতে আমাদের বাড়িতে ফিরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়েছিলাম। অবশ্য এখন আর বাড়ি নেই; সব ধ্বংস হয়ে গেছে। কিন্তু ধ্বংসস্তূপ হলেও সেখানে ফিরে যেতে পারলে আমরা খুশি। এটাও এক দারুণ আনন্দ। গত দুই বছর আমরা এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় বাস্তুচ্যুত হয়ে কষ্ট সহ্য করেছি।’