প্রবা ডেস্ক
প্রকাশ : ০৪ ডিসেম্বর ২০২২ ১৬:৪৫ পিএম
আপডেট : ০৪ ডিসেম্বর ২০২২ ১৮:১৭ পিএম
গণবিক্ষোভ ও আন্তর্জাতিক চাপের মুখে হিজাব আইন সংশোধনে বাধ্য হলো ইরান। ছবি : সংগৃহীত
ইরান সরকার অবশেষে বাধ্যতামূলক হিজাব আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে। নিপীড়নমূলক এ আইনবিরোধী আড়াই মাসের বিক্ষোভ ও আন্তর্জাতিক চাপের মুখে দেশটির সরকার তা করতে বাধ্য হলো।
শনিবার (৩ ডিসেম্বর) ইরানের অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ জাফর মোন্তাজেরি বলেন, ‘আইনসভা ও বিচার বিভাগ (হিজাব ইস্যুতে) যৌথভাবে কাজ করছে। ইতোমধ্যে বিচার বিভাগের একটি পর্যালোচনা কমিটি গঠন করা হয়েছে। তারা বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে বুধবার (৩০ নভেম্বর) আইনসভার সাংস্কৃতিক কমিশনের সঙ্গে বৈঠকও করেছেন। দু-এক সপ্তাহের মধ্যে একটি চূড়ান্ত ফল আসতে পারে।’
হিজাব আইন শিথিলের বিষয়ে শনিবার দেশটির প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসিও ইঙ্গিত দিয়েছেন। রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রাইসি বলেন, ‘আমাদের দেশের প্রজাতন্ত্র ও ইসলামিক ভিত্তি সংবিধানের ওপর প্রতিষ্ঠিত। তবে হ্যাঁ, সংবিধান শিথিলেরও পদ্ধতি রয়েছে।’
আন্দোলন শুরুর পর থেকে হিজাব আইন সংশোধনের দাবি জানাচ্ছিল ইরানের তুলানমূলক উদার রাজনৈতিক দল দ্য ইউনিয়ন অব ইসলামিক ইরান পিপল পার্টি। শনিবার দলটির প্রেসিডেন্ট মুহাম্মদ খাতামি বলেন, সরকারকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘বাধ্যতামূলক হিজাব বাতিলের জন্য আইনগত প্রস্তুতি শুরু করুন।’
মাহসা আমিনি নামের এক কুর্দি তরুণী গত ১৩ সেপ্টেম্বর রাজধানী তেহরানে দেশটির নৈতিকতা বিষয়ক পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন। যথাযথভাবে হিজাব না পরার অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রেপ্তারের তিন দিন পর মাহসা আমিনিকে মৃত ঘোষণা করে পুলিশ।
পরের দিন ১৭ সেপ্টেম্বর থেকে তেহরান, ইস্পাহানসহ ইরানের উল্লেখযোগ্য সব শহরে বিক্ষোভ শুরু হয়। দ্রুত তা সবকটি তথা ৩১ প্রদেশে ছড়িয়ে পড়ে। দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে সমাজের নানান গ্রুপ ও শ্রেণির মধ্যে। তরুণীরা রাস্তায় হিজাব খুলে তাতে আগুন ধরিয়ে দেন। মাথার চুল কেটে প্রতিবাদ জানান।
শুরুর দিকে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণীরাই আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন। পরবর্তী সময়ে তরুণী ও নারীদের পাশাপাশি তরুণ ও বিভিন্ন বয়সের পুরুষও আন্দোলনে যোগ দেন। যোগ দেন ব্যবসায়ী, কলকারখানার কর্মচারী ও শ্রমিক, অভিনেতা-অভিনেত্রী, ফুটবলারসহ নানান পর্যায়ের তারকারা। সম্প্রতি বোরকা পরা নারীরাও হিজাব আন্দোলনের পক্ষে রাস্তায় নামেন।
শুরু থেকেই কঠোর হাতে বিক্ষোভ দমনের চেষ্টা করে সরকার। গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বিক্ষোভে ২০০-এর বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন বলে শনিবার জানিয়েছে ইরানের স্টেট সিকিউরিটি কাউন্সিল। কিন্তু তার আগে বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনীর কিছু সদস্যসহ ৩০০-এর বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন বলে মন্তব্য করেন দেশটির রেভল্যুশনারি গার্ডসের প্রধান আমিরালি হাজিজাদেহ।
অন্যদিকে, অসলোভিত্তিক ইরান বিষয়ক এনজিও ইরান হিউম্যান রাইটস মঙ্গলবার (২৯ নভেম্বর) বিক্ষোভে ৪৪৬ সাধারণ মানুষ নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন। জাতিসংঘের তথ্য মতে, একই সময়ে আটক হয়েছেন প্রায় ১৪ হাজার।
বিক্ষোভকারীদের নিপীড়নের অভিযোগে ইরানের ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন। তা ছাড়া জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিল ইরান সরকারের মানবাধিকার লঙ্ঘনকে নিন্দা করে একটি প্রস্তাব পাস করে।
১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর ১৯৮৩ সালে জনসম্মুখে হিজাব বা স্কার্ফ বাধ্যতামূলক করে ইরান। তখনই সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গণবিক্ষোভ হয়। গত বছর ক্ষমতা গ্রহণের পর হিজাব আইন আরও কঠোর করেন রাইসি।