× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

সিরিয়ায় বাশারেরও ছিল ‘আয়নাঘর’

প্রবা প্রতিবেদন

প্রকাশ : ১০ ডিসেম্বর ২০২৪ ১৩:৫০ পিএম

আপডেট : ১০ ডিসেম্বর ২০২৪ ১৩:৫১ পিএম

সিরিয়ার সাবেক পলাতক প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ। ছবি : সংগৃহীত

সিরিয়ার সাবেক পলাতক প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ। ছবি : সংগৃহীত

বিদ্রোহীদের আক্রমণের মুখে পালিয়ে জীবন বাঁচিয়েছেন বাশার আল-আসাদ। দীর্ঘসময় ক্ষমতা ধরে রাখতে হাজারো নিরপরাধ মানুষকে বন্দি করে কারাগারে পাঠিয়েছিলেন দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া সাবেক এই প্রেসিডেন্ট। তার কারাগারে বন্দি ছিল লাখো মানুষ। কারাগারে নির্যাতনে অনেকে হয়েছে পঙ্গু। সম্প্রতি বিদ্রোহীরা দামেস্ক দখল করার পর বিভিন্ন কারাগার থেকে হাজারো মানুষকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। মুক্তি পেয়ে অনেকে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের কাছে যেভাবে নিজেদের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছে, যা আয়নাঘরকে মনে করিয়ে দিয়েছে।

কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়াদের একজন হলেন হালা। অনেক দিন বন্দি থাকায় স্বাভাবিক হতে পারেননি, কাটেনি তার ভয়। ফলে মুক্তি পাওয়া এই নারী আসল নাম প্রকাশ করেননি। হালা আলজাজিরাকে বলেন, ২০১৯ সালে তাকে একটি চেকপয়েন্ট থেকে আটক করা হয়। অন্যদের মতো তার বিপক্ষেও ‘সন্ত্রাসবাদের’ অভিযোগ আনা হয়। সে সময় হাজার হাজার সরকারবিরোধীর ওপর এই অভিযোগ আরোপ করা হয়েছিল। এরপর তাকে আলেপ্পোতে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানেই তিনি বিভিন্ন কারাগারে বন্দি ছিলেন।

কারাবন্দি জীবনের নির্মম স্মৃতিচারণ করে হালা বলেন, ‘কারাগারে আমার কোনো নাম ছিল না, একটা নম্বর ছিল। সেখানে আমাকে আমার নাম ধরে ডাকা হতো না, স্রেফ নম্বর দিয়ে ডাকা হতো।’ হালা বলেন, ‘আমরা বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না যে বাশারের পতন হয়েছে। আমরা আলোর মুখ দেখতে পাব, তা বিশ্বাসই হচ্ছিল না।’

আসাদবিরোধী আন্দোলনকারী গোষ্ঠী হায়াত তাহরির আল-শামের (এইচটিএস) প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে হালা বলেন, ‘আমাদের আনন্দ ছিল সীমাহীন, আমরা জোরে জোরে চিৎকার করছিলাম।’ মুক্তিদাতাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে হালা বলেন, ‘ইচ্ছা করছিল তাদের যদি আলিঙ্গন করতে পারতাম! পরিবারের কাছে পৌঁছানোর পর আনন্দ আরও বেড়ে গেল। এটা যেন আমার নতুন জন্ম।’

আলেপ্পোর যে কারাগার থেকে হালাকে মুক্তি দেয় এইচটিএস, সেটি বাশার আল-আসাদের সরকারের পরিচালিত কয়েকটি কারাগারের একটি মাত্র। মানবাধিকার সংগঠন সিরিয়ান নেটওয়ার্ক ফর হিউম্যান রাইটসের তথ্য অনুযায়ী, হালাসহ আল-আসাদের কারাগারে অন্তত ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬১৪ জন বন্দি ছিল।

হালা তার কারাবন্দি জীবনের স্মৃতি থেকে জানান, তারই সঙ্গে বন্দি ছিল এক কিশোরী। যে বাশার আল-আসাদ বাহিনীর নির্যাতনের কারণে মাত্র ১৬ বছর বয়সেই মারা যায়। হালা বলেন, ওই তরুণীকে তার বিয়ের মাত্র দুই মাস পরে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। পুলিশের অভিযোগ ছিল, ওই তরুণী, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী, এক বৃদ্ধা ও দুজন চিকিৎসক বিপ্লবীদের চিকিৎসাসেবা দিয়েছিল।

বাশার আল-আসাদের কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়া আরেক বন্দি ৪৯ বছর বয়সি সাফি আল-ইয়াসিন। তিনিও আলেপ্পোর কারাগার থেকেই মুক্তি পেয়েছেন। সাফি বলেন, ‘এটা যেন আমার জন্মদিনের মতো ছিল, যেন আমার জীবনের প্রথম দিন।’ তিনি আরও বলেন, ‘এই আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।’

সাফি আল-ইয়াসিন বলেন, গত ২৯ নভেম্বরের আগে কারাগারের কাছাকাছি গোলাগুলির শব্দ শুনে তারা সতর্ক হয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘তারপর হঠাৎ শান্তি নেমে এলো ও আমরা বিজয়ী বিদ্রোহীদের গানের শব্দ শুনতে পেলাম। প্রায় ৫ হাজার বন্দি ছিল। আমরা দরজা-জানালা ভাঙতে শুরু করি বেরোনোর জন্য। এমনকি কারাগারের কর্মকর্তা ও প্রহরীরা সাধারণ পোশাকে আমাদের সঙ্গে বেরিয়ে যায়, যাতে বিদ্রোহীরা ধরতে না পারে।’

সাফিকে বিভিন্ন কারাগারে স্থানান্তরিত করা হয়েছিল ও প্রত্যেক কারাগারে আলাদা আলাদা পদ্ধতিতে নির্যাতন চালিয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল। তিনি সেইদনায়া কুখ্যাত কারাগারে এক বছর কাটিয়েছেন। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ২০১৭ সালে এই কারাগারকে ‘মানব কসাইখানা’ বলে আখ্যায়িত করেছিল। এরপর তাকে সুইদা ও পরে আলেপ্পোতে স্থানান্তর করা হয়।

সেইদনায়া কারাগারে যে অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন, তা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয় বলেও উল্লেখ করেন সাফি আল-ইয়াসিন। তিনি বলেন, ‘আমার দেখা দৃশ্যগুলো মৃত্যুর পরও আমার স্মৃতি থেকে মুছে যাবে না।’ এ সময় তিনি জানান, তার সামনেই এক বৃদ্ধকে নির্যাতন করে সারা শরীর রক্তাক্ত করে ফেলা হয়েছিল। সেই বৃদ্ধ নির্যাতনের ধকল সইতে না পেরে অবশেষে মারা যান।

আল-আসাদ পরিবারের ৫৪ বছরের শাসনের জাঁতাকল থেকে সিরিয়া মুক্তি পাওয়ার পর কারাগার থেকে মুক্তি পান মাহের। তিনি ভয়ে এখনও নিজের পুরো নাম প্রকাশ করতে চান না। ২০১৭ সালে ‘সন্ত্রাসে অর্থায়নের’ অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয় তাকে। এরপর বিনা বিচারে তাকে সাত বছর বন্দি করে রাখা হয়। মাহের বলেন, ‘আমি ভেবেছিলাম, কর্তৃপক্ষ যেন আমাকে ভুলে গেছে। যেন আমি মানুষ নই, কেবলই একটি সংখ্যা।’

কারাগারের নির্মম ও ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে মাহের বলেন, ‘প্রতিটি মিনিট যেন মৃত্যুর কাছাকাছি ছিল, নির্যাতনের যে তীব্রতা ও নির্মম পদ্ধতি ছিল, তা কোনো পশুও সহ্য করতে পারত না।’ মাহের জানান, তার বন্দিদশায় এরচেয়েও ভয়াবহ অভিজ্ঞতা হলোÑ তিনি যখন দামেস্কের কুখ্যাত মেজ্জেহ কারাগারে এক আত্মীয়ের দেখা পান।

মাহের বলেন, ‘কারাগারের বাইরে হঠাৎ একটি বাস এলো ও কয়েকজন বন্দিকে ঠেলে আমার সেলে পাঠানো হলো। তাদের মধ্যে একজনকে আমার ভগ্নিপতির মতো দেখাচ্ছিল। আমি প্রথমে দ্বিধায় ছিলাম ও ভাবছিলাম, এটা তো আয়মান (মাহেরের ভগ্নিপতি) হতে পারে না, সে তো পা হারায়নি!’

মাহের তার সন্দেহ ঘোচাতে সেই বন্দির কাছে যান ও দেখতে পান, তার ভগ্নিপতি কেবল পা হারাননি, পাশাপাশি মানসিক ভারসাম্যও হারিয়েছেন। মাহের মূলত একটি ট্যাটু দেখে তার ভগ্নিপতিকে চিনতে পারেন।

মাহেরকে যেসব কারাগারে রাখা হয়েছিল, মেজ্জেহ ছিল তার মধ্যে একটি। বছরের পর বছর বিনা বিচারে বন্দি থেকে নির্যাতনের শিকার হওয়ার পর একসময় তিনি ভাবতে শুরু করেনÑ তিনি কখনই আর কারাগার থেকে বের হতে পারবেন না।

তবে দেরি হলেও মাহের, হালা ও সাফির জীবনে ভালো কিছু ঘটেছে। তারা মুক্তি পেয়েছেন আল-আসাদ পরিবারের বন্দিশালা থেকে ও একেবারে অপ্রত্যাশিতভাবেই। মাহের বলেন, ‘কারাগারের কাছাকাছি গোলাগুলির শব্দ শুনে আমরা সবাই আল্লাহু আকবার স্লোগান দিতে শুরু করি। আমরা বিশ্বাস করতে পারছিলাম না যে এই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেবে।’

মাহের বলেন, ‘আমরা দরজা ভেঙে কারাগার থেকে বেরিয়ে এলাম, বিপ্লবীদের আলিঙ্গন করলাম, সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতায় সিজদাহ করলাম ও নিরাপদে আমার বোনের বাড়িতে পৌঁছালাম।’ 

সূত্র : বিবিসি

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা