সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের প্রতিবেদন
প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ১৭ নভেম্বর ২০২৪ ০০:৩০ এএম
আপডেট : ১৭ নভেম্বর ২০২৪ ০০:৩২ এএম
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে দূরত্ব ঘোচাতে পারবেন এবং নতুন মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে কাজ করতে পারবেন বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। শনিবার (১৬ নভেম্বর) হংকংভিত্তিক সংবাদমাধ্যম সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের এক প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্পের সঙ্গে ইউনূসের বিরোধপূর্ণ সম্পর্ক একটি ‘ওপেন সিক্রেট’। তবে চীন ও ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের যেহেতু কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে, তাই ঢাকার সিদ্ধান্তকে অবশ্যই গুরুত্ব দেবে যুক্তরাষ্ট্র।
ওয়াশিংটনভিত্তিক পর্যবেক্ষক সংস্থা উইলসন সেন্টারের দক্ষিণ এশিয়া ইনস্টিটিউটের পরিচালক মাইকেল কুগেলম্যান বলেছেন, ‘আমি মনে করি ড. ইউনূস শিগগিরই ট্রাম্পের সঙ্গে দ্বন্দ্ব মিটিয়ে ফেলবেন। কারণ, ট্রাম্প এমন সময়ে ক্ষমতায় এসেছেন যখন শেখ হাসিনা পরবর্তী বাংলাদেশ পুনর্গঠন ও স্থিতিশীল করার চেষ্টা করছেন ড. ইউনূস।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি মনে করি, ড. ইউনূস আর ট্রাম্পের সমালোচনা করবেন না। ট্রাম্প জয়ী হওয়ার পরপরই ড. ইউনূসের পক্ষ থেকে উষ্ণ অভিনন্দন জানানো সেই ইঙ্গিতই দেয়।’
ছাত্র-জনতার নজিরবিহীন গণঅভ্যুত্থানের মুখে গত ৫ আগস্ট দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
গত ৫ নভেম্বর মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্প বিজয়ী হওয়ার অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই ড. ইউনূস তাকে উষ্ণ অভিনন্দন জানান। তিনি ট্রাম্পের উদ্দেশে বলেন, বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ককে এগিয়ে নিতে তিনি উন্মুখ হয়ে আছেন। ট্রাম্পের সঙ্গে ড. ইউনূসের দ্বন্দ্বের শুরু ২০১৬ সালে। ওই সময় ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথম মেয়াদে যুক্তরাষ্টের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর ড. ইউনূস তার সমালোচনা করেছিলেন এবং ট্রাম্পের জয়কে ‘একটি সূর্যগ্রহণ’ বলে মন্তব্য করেছিলেন।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্র্যাট পার্টির নেতাদের সঙ্গে ড. ইউনূসের সম্পর্ক বরাবরই হৃদ্যতাপূর্ণ। তিনি সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন এবং তার স্ত্রী সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনের খুব ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক লাইলুফার ইয়াসমিন বলেন, ‘সেই সময়ের পরিস্থিতি আর এখনকার পরিস্থিতি এক নয়। ড. ইউনূস এখন ১৭ কোটি মানুষের একটি দেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন, যে দেশটির ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে দক্ষিণ এশিয়া এবং এর বাইরেও।’ ড. মুহাম্মদ ইউনূস বুদ্ধি খাটিয়ে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিষয়টি দেখভাল করছেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
অধ্যাপক ইয়াসমিন বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রতি ট্রাম্পের নীতি পরিবর্তনের চেয়ে আরও বেশি চলমান থাকবে বলেই আমার ধারণা। কারণ তিনি যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। এজন্য মার্কিন নীতিনির্ধারকদের কাছে বাংলাদেশের একটি কৌশলগত প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। ফলে বাংলাদেশকে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ হিসেবেই দেখে ওয়াশিংটন। যুক্তরাষ্ট্র অবশ্যই চাইবে বাংলাদেশের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যসহ অন্যান্য সম্পর্ক সম্প্রসারণ করতে।’
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক সংস্থা আইপিএজি এশিয়া-প্যাসিফিক, অস্ট্রেলিয়ার চেয়ারম্যান সৈয়দ মুনির খসরু বলেন, ২০১৬ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হিলারি ক্লিনটনের পক্ষে ড. ইউনূস অর্থ ‘ডোনেট’ করেছিলেন; যা ইউনূস-ট্রাম্প সম্পর্ককে জটিল করেছে। তবে এ বিষয়টি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতির প্রতিনিধিত্ব করে না। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশ পারস্পরিক লাভজনক ক্ষেত্রÑ যেমন ব্যবসা, উন্নয়ন ও প্রযুক্তিতে ভালো সম্পর্ক বজায় রেখেছে।
আন্তর্জাতিক এই বিশ্লেষক আরও বলেন, ‘ট্রাম্পের নতুন প্রশাসনের সঙ্গে বাংলাদেশের ইউনূস সরকার নিঃসন্দেহে সম্পর্ক আরও জোরদার করবে। বিশেষ করে ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রে। কারণ আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।’ খসরুর মতে, সন্ত্রাসবাদ দমন, মানবাধিকার রক্ষা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার প্রয়োজনেই যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখবে।
ট্রাম্প গত ৩১ অক্টোবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ একটি পোস্ট করেছিলেন। সেখানে বাংলাদেশি সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের নিন্দা করেছিলেন তিনি। ওই পোস্টের প্রসঙ্গ টেনে মাইকেল কুলেগম্যান বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে ট্রাম্প বাংলাদেশকে নিয়ে যে পোস্ট দিয়েছিলেন সেটি তার নীতির প্রতিনিধিত্বমূলক নয়, সেটি তার নির্বাচনী প্রচারের অংশ ছিল।’
অধ্যাপক ইয়াসমিন বলেন, ‘বাংলাদেশের উচিত একজন লবিস্ট নিয়োগ করা, যিনি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নীতি ও মার্কিন নীতিনির্ধারকদের কাছে বাংলাদেশের আবেদন বৃদ্ধি করতে পারবেন।’ তিনি আরও বলেন, ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারেরও উচিত এই মুহূর্তে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি গ্রহণ করা। এতে দুই দেশের সম্পর্ক আরও গভীর হবে।