বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার বিক্ষোভের
মুখে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। পদত্যাগের পর অনেকটা বাধ্য হয়েই তাকে ভারতে পালাতে হয়।
ভারত থেকে তিনি যুক্তরাজ্যে রাজনৈতিক আশ্রয়ের চেষ্টা করলেও তা সম্ভব হয়নি। শেখ হাসিনার
দেশত্যাগ ইতিহাসের প্রথম ঘটনা নয়। এর আগেও অন্তত ছয়জন শাসককে পদত্যাগের পর দেশত্যাগ
করতে হয়েছে। রাজনৈতিক অস্থিরতায় দেশত্যাগী এই শাসকদের নিয়েই আজকের বিশেষ আয়োজন।
গোতাবায়া রাজাপাকশে (শ্রীলঙ্কা)
২০১৯ সালের নভেম্বর থেকে ২০২২ সালের জুলাই পর্যন্ত শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেন রাজাপাকশে। কিন্তু ২০২২ সালে দেশটি দেউলিয়া ঘোষণা করলে সারা দেশ বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। প্রবল আন্দোলনের মুখে তাকে দেশত্যাগ করতে হয়। দেশের অর্থনৈতিক ভঙ্গুর সময়ে জ্বালানি, খাদ্য ও চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হওয়ার বিষয়টি সাধারণ মানুষ মেনে নিতে পারেনি। প্রেসিডেন্ট রাজাপাকশে এবং দেশটির প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংহে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার অনেক চেষ্টা করেন। কিন্তু প্রবল আন্দোলনের মুখে তাকে তার সরকারি বাসভবন ত্যাগ করতে হয়। তিনি প্রথমে মালদ্বীপে আশ্রয় নেন এবং পরে সিঙ্গাপুর রাজনৈতিক আশ্রয় নেন। সিঙ্গাপুরেই তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করেন। চলতি বছর অবশ্য শ্রীলঙ্কায় আবার রাজনীতিতে ফেরার চেষ্টা করছেন।
আশরাফ ঘানি (আফগানিস্তান)
২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২১ সালের আগস্ট পর্যন্ত আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্টের দায়িত্বপালন করেন আশরাফ ঘানি। ২০২১ সালের গ্রীষ্মে তালেবানরা আস্তে আস্তে সারা দেশের দখল নিতে শুরু করে। ফলে ঘানি সরকারের ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি হয়। ২০২১ সালের ১৫ আগস্ট তালেবানরা কাবুলের দখল নেয়। কাবুলে অস্থিতিশীল এই পরিবেশে ঘানি দেশত্যাগে বাধ্য হন। বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, ‘দেশ ছাড়ার জন্য আমি দুই মিনিট সময়ও পাইনি’। আফগানিস্তান ছেড়ে তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাতে রাজনৈতিক আশ্রয় নেন। ঘানির ক্ষমতাচ্যুতির দিন কয়েক আগেই মার্কিন সেনারা তালেবানদের দখলের বিষয়টি অনুমান করতে পেরেছিল। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তারা দখল নিয়ে নেবে এমনটি কেউ ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারেনি।
পারভেজ মোশাররফ (পাকিস্তান)
জেনারেল পারভেজ মোশাররফ ২০০১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টের
দায়িত্বপালন করেন। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার মুখে বাধ্য হয়ে দেশত্যাগ করা নেতাদের মধ্যে
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য নামও বোধ হয় তার। মোশাররফ ১৯৯৯ সালে সামরিক ক্যুর মাধ্যমে পাকিস্তানের
ক্ষমতায় আসেন। তার ক্ষমতায় আসার বিষয়টি ব্যাপক বিতর্ক তৈরি করে। বিশেষত, পাকিস্তানে
তার শাসনামলে মানবাধিকার লঙ্ঘন, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং বিচার বিভাগে
অযাচিত হস্তক্ষেপের অভিযোগ উঠে আসতে শুরু করে। ২০০৭ সালে পাকিস্তানে তিনি জরুরি অবস্থা
ঘোষণা করেন এবং সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতিকে পদচ্যুত করেন। এমন পরিস্থিতিতে পারভেজ
মোশাররফের অভিশংসনের শঙ্কা দেখা দিলে তিনি ২০০৮ সালে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন এবং লন্ডনে
নির্বাসনে চলে যান। পরে তিনি লন্ডন থেকে দুবাই আসেন। তার ওপর সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজির
ভুট্টোকে হত্যাচেষ্টার মামলা থাকার পরও ২০১৩ সালের সাধারণ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা
করেন। কিন্তু তার এই ফেরা দীর্ঘায়িত হয়নি। তাকে গৃহবন্দি করে ফেলা হয়। আইনি বিচার প্রক্রিয়ার
লড়াই তাকে চালিয়ে যেতে হয় এবং শারীরিকভাবে ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েন। ২০২৩ সালে দুবাইয়ে
তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
সুহার্তো (ইন্দোনেশিয়া)
১৯৬৭ থেকে ১৯৯৮Ñ প্রায় ৩১ বছর ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট ছিলেন মোহাম্মদ
সুহার্তো। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার জন্য যে কজন রাজনীতিককে দায়ী করা
হয়, তাদের একজন তিনি। সুহার্তো নিজেও সামরিক ক্যু পরিচালনার মাধ্যমে ক্ষমতায় আসেন।
ক্ষমতায় আসার পর ইন্দোনেশিয়ায় ব্যাপক দুর্নীতি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ আসে তার
ওপর। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদন অনুসারে, তার শাসনামলে অন্তত ৫০ হাজার
মানুষকে রাজনৈতিক মামলায় বন্দি করে রাখা হয়। তার মধ্যে মাত্র এক হাজার মানুষ ন্যায়বিচার
পেয়েছিলেন। নব্বইয়ের দশকে ইন্দোনেশিয়ার অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। আর এমন পরিস্থিতিতে
দেশটিতে বিক্ষোভ ও আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৯৮ সালের মে মাসে গণঅভ্যুত্থানের মুখে এই স্বৈরশাসকের
৩১ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। পদত্যাগের পর সুহার্তো জাকার্তায় অনেকটা বন্দি হিসেবেই
দিনযাপন করেন। তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ মৃত্যুর আগ পর্যন্ত অস্বীকার করেছেন। ২০০৮
সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
সাদিক আল মাহদি (সুদান)
সাদিক আল মাহদি ১৯৬৬-৬৭ এই এক বছর এবং পরবর্তীকালে ১৯৮৬-৮৯ সালে দ্বিতীয়
মেয়াদে সুদানের প্রধানমন্ত্রী হন। তার শাসনামলে সুদানে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক
প্রতিবন্ধকতা বেড়ে চলে। দেশটির অভ্যন্তরে নানাবিধ সংকট ছিল। এমনকি অনেক আন্দোলনও গড়ে
উঠতে শুরু করেছে। তার দ্বিতীয় মেয়াদের সময় জোট সরকার গঠন করা হয়। উম্মা পার্টি এবং
তার শ্যালকের দল ন্যাশনাল ইসলামিক ফ্রন্টের সঙ্গে জোট বেঁধে তিনি সরকার গঠন করেন। কিন্তু
এই জোট সরকার সুদানের পরিস্থিতির কোনো উন্নতি করতে পারেননি। ১৯৮৯ সালের জুনে ব্রিগেডিয়ার
ওমার আল বাশির মিলিটারি ক্যু পরিচালনা করে আল মাহদিকে ক্ষমতাচ্যুত করেন। এরপর আল মাহদিকে
একাধিক দেশে রাজনৈতিক আশ্রয় নিতে হয়। ২০১৮ সালে স্বদেশে ফেরার আগ পর্যন্ত তাকে অনেকটা
পলাতকই থাকতে হয়। দেশে ফেরার পর তাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং ২০১৯ সালে তিনি আবার দেশ
থেকে পালিয়ে যান। ২০২০ সালে কোভিড সংক্রমণে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
আরিস্তিদ (হাইতি)
জিন বার্ট্রান্ড আরিস্তিদ। হাইতির সর্বপ্রথম গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে
নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে রাজনৈতিক নির্বাসনে যেতে হবেÑ এমনটি কেউ ঘুণাক্ষরেও ভাবতে
পারেনি। ১৯৯১ সালে সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর তার বিরুদ্ধে মিলিটারি ক্যু হয়। ওই
বছরই তিনি যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় নেন। হাইতির পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে
মধ্যস্থতা করতেই হয়। ১৯৯৪ সালে তিনি আবার স্বদেশ ফিরে এসে ক্ষমতা নেন। ২০০১ সালে দ্বিতীয়
মেয়াদে তিনি ক্ষমতা পান। কিন্তু হাইতির অবস্থা ততদিনে বেহাল। ২০০৪ সালের ফেব্রুয়ারি
মাসে দেশটিতে ভয়াবহ বিদ্রোহ দেখা দেয়। এই বিক্ষোভের সময় তিনি মধ্য আফ্রিকা প্রজাতন্ত্রে
পালিয়ে যান। সেখান থেকে দক্ষিণ আফ্রিকায় আশ্রয় নেন। দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রায় ৭ বছর তাকে
নির্বাসনে থাকতে হয়। ২০১১ সালে তিনি আবার স্বদেশ ফিরে আসেন।