অনন্ত-রাধিকা জুটি
প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ১২ জুলাই ২০২৪ ২১:৫১ পিএম
ভারতের ইতিহাসের ‘বিগেস্ট অ্যান্ড ফ্যাটেস্ট’ বিবাহবাসরটি অনুষ্ঠিত হয়েছে গতকাল শুক্রবার মুম্বাইয়ে জিরো ওয়ার্ল্ড কনভেনশন সেন্টারে। বিয়ের অনুষ্ঠানে আম্বানি পরিবার একসঙ্গে ফটোশুট সেরেছেন (এএফপি)
‘বিগ ফ্যাট ওয়েডিং’-এর দেশ হিসেবে ভারত অনেক আগে থেকেই পরিচিত। ভারতের ধনকুবের থেকে শুরু করে সেলিব্রেটিরা চোখ ধাঁধানো আড়ম্বরে পরিবারের বিয়ে আয়োজন করতে ভালোবাসেন। বিয়ের আয়োজনে একের পর এক রেকর্ড হয়। ফ্যাশন ট্রেন্ড শুরু হয়। আলোচনায় আসে খরচের কথা, ভারতের ব্র্যান্ডিং কতটাÑ তারও বড় হিসাব কষা হয়। ভারতের ইতিহাসের ‘বিগেস্ট অ্যান্ড ফ্যাটেস্ট’ সেই বিবাহবাসরটিই অনুষ্ঠিত হচ্ছে মুম্বাইয়ে জিরো ওয়ার্ল্ড কনভেনশন সেন্টারে। কয়েক মাস ধরেই আয়োজন চলছিল। প্রাকবিবাহ অনুষ্ঠানমালা থেকেই শুরু হয়েছিল মানুষের উৎসাহ ও চমকের পালা। মুকেশ আম্বানির ছোট ছেলে অনন্ত আম্বানি আর তার দীর্ঘদিনের বান্ধবী রাধিকা মার্চেন্টের বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে।
গত মার্চের শুরুতে গুজরাটে আম্বানিদের পৈতৃকভিটা জামনগরে
বিয়ের তোড়জোড় শুরু হয়েছিল। খরচের বহরে, ধুমধামের মাত্রায় কিংবা অতিথি
তারকাদের দ্যুতিতে উজ্জ্বল এমন অবিস্মরণীয় বিয়ের আসর ভারতেও কেউ কস্মিনকালেও
দেখেনি! সিএনএন লিখেছে,
গোটা ভারত যেন বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে হাত-পা নাড়াতেও ভুলে
গেছে। বিয়েতে অতিথি হিসেবে ছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, কংগ্রেস
নেত্রী সোনিয়া গান্ধী থেকে শুরু করে দেশের সব নামি-দামি রাজনীতিবিদ।
শাহরুখ-আমির-সালমানের মতো বলিউডের ‘খান ত্রয়ী’ থেকে শুরু করে হালের রণবীর কাপুর-আলিয়া
ভাটের মতো তারকারাও বাদ পড়েননি। ভারতের বাইরে থেকে ব্যবসায়ী, হলিউড তারকা
এমনকি ইনফ্লুয়েন্সাররাও এসেছেন বিয়েতে। কীভাবে যেন ক্রিকেটও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। আম্বানি
পরিবার আইপিএল ফ্র্যাঞ্জাইজি মুম্বাই ইন্ডিয়ানসের মালিক। সংগতই রোহিত শর্মা ও দলের
অন্য সতীর্থরা উপস্থিত ছিলেন। মুম্বাইয়ে একশেখানা প্রাইভেট জেট এসেছে।
ভারতের মতো গরিব এক রাষ্ট্রে এভাবে দেদারসে খরচ করে ছেলের বিয়ে দিয়ে মুকেশ আম্বানি
কুরুচিকর কাজ করলেন নাকি ভারতের অর্থনীতিতে নতুন পথ দেখাচ্ছেনÑ এমন তর্ক এখনও চলছে
নেটিজেনদের মধ্যে। প্রবাসী ভারতীয়দের একটি প্ল্যাটফর্ম ‘ইন্ডিয়াফোরামস’-এ
নরওয়েপ্রবাসী একজন নারীও লিখেছেনÑ যেভাবে আম্বানি এখানে টাকা ওড়াচ্ছেন তা শুধু দৃষ্টিকটু
ও ‘ভালগার’ই নয়,
গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা ভারতীয়দের জন্য চরম অমর্যাদাকরও
বটে! ভারতেও অনেকে এভাবে ‘টাকা ওড়ানো’র নিন্দা করেছে, তাদের
সুরে সুরে মিলিয়েছেন পাকিস্তানের সিনেমা অভিনেত্রী ও তারকা জোয়া নাসিরও! অনেক ভারতীয়র মতো জোয়া নাসিরও লিখেছেনÑ যে দেশে বহু মানুষের দুবেলা
আজও ভরপেট খাবার জোটে না,
সেখানে এ রকম আচরণ মেনে নেওয়া যায় না। এই
বিয়ের জন্য গুজরাটের ছোট শহর জামনগরের ততধিক ছোট এয়ারপোর্টকে যেভাবে
সাময়িকভাবে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মর্যাদা দেওয়া হয়েছিল, তারও
তীব্র সমালোচনা করেছে অনেকে।
গত বৃহস্পতিবার মধ্যরাত থেকে এই বিয়ের মঞ্চ, মুম্বাইয়ের
‘জিও কনভেনশন সেন্টার’ অভিমুখী সমস্ত রাস্তা যে শহরের পুলিশ তিন দিনের জন্য বন্ধ করে
দিয়েছে, তা নিয়েও অনেকে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। মুম্বাই পুলিশ জানিয়েছে,
পাবলিক ইভেন্ট বলেই এমন করা হয়েছে। খরচখরচা বা আড়ম্বর নিয়ে যাই
বিতর্ক হোকÑ এই বিয়ের অনুষ্ঠান অনেকগুলো খাতেই ভারতের জন্য লাভদায়ক হতে পারে। অনেকে
মনে করছে এভাবে ভারতের ঐতিহ্যের ব্র্যান্ডিং হবে। অনেকটা জাঁকজমক আয়োজনের মাধ্যমে ইভেন্ট
ম্যানেজমেন্টের কাজ বাড়বে। কিন্তু ভারতে এই বিয়ের জাঁকজমক নিয়ে
জনমত স্পষ্টতই বিভক্ত।
পৃথিবীর সব দেশেই বাবা-মারা নিজেদের সন্তানের বিয়েতে সাধ্যমতো খরচ করেন, কোথাও আবার সাধ্যের অতিরিক্ত। ভারতের মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত শ্রেণি সাধারণত দ্বিতীয় পর্যায়েই পড়ে। গত মাসেই জেফারিজের একটি আন্তর্জাতিক রিপোর্টে বলা হয়েছেÑ ভারত নিজেদের সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ সম্পর্কে এমনিতেই সচেতন। কোনো পণ্যের দাম বেশি ধরা হচ্ছে কি না সে ব্যাপারে তারা খুবই সচেতন। কিন্তু বিয়েটা এখানে ব্যতিক্রম। কারণ তারা বিয়েতে খরচ করতে ভালোবাসে। তারা আরও জানায়Ñ কোভিড মহামারির সময়কার মন্দা কাটিয়ে উঠে ভারতের ‘ওয়েডিং ইন্ডাস্ট্রি’র টার্নওভার এখন আবার ১৩০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেছে। ভারতের সচ্ছল একটি পরিবার সন্তানের বিয়ের জন্য সাধারণত ১২ লাখ রুপি (১৫,০০০ ডলার) খরচ করে থাকে, যেটা গড়পড়তা একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের বার্ষিক আয়ের প্রায় তিন গুণ! এই হিসাব মাথায় রাখলে অবশ্য বলতেই হবেÑ মুকেশ আম্বানি তার ছোট ছেলের বিয়েতে নিজের মোট আয়ের অতি সামান্য একটা ভগ্নাংশই খরচ করছেন।
সূত্র : বিবিসি