প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ০২ জুলাই ২০২৪ ২০:০৪ পিএম
আপডেট : ০২ জুলাই ২০২৪ ২০:৫২ পিএম
২৬ জুন দক্ষিণ কোরিয়ার গুমি শহরের সিটি হলের প্রশাসনিক কর্মকর্তা রোবট স্টিভ সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়ে অকেজো হয়ে পড়ে। ছবি: সংগৃহীত
আশ্চর্য খবরই বটে। একে তো রোবট তার ওপর আত্মহত্যা! এমন এক ঘটনাই ঘটেছে দক্ষিণ কোরিয়ার
গুমি শহরে। দক্ষিণ কোরিয়ার গুমি সিটি
কাউন্সিল জানিয়েছে,
২৬ জুন তাদের প্রথম প্রশাসনিক রোবট সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়ে অকেজো
হয়ে পড়েছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম এ ঘটনাকে দেশের প্রথম রোবটের
‘আত্মহত্যা’
বলে বর্ণনা করেছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ঘটনাটিকে সম্ভাব্য ‘আত্মহত্যা’
বলে অভিহিত করেছে। কোরিয়া টাইমসের ওই প্রতিবেদনে গুরুত্বের সঙ্গেই প্রশ্ন তোলা হয়, অধ্যবসায়ী সিভিল অফিসার এমন পদক্ষেপ কেন নিয়েছে,
তা খতিয়ে দেখা জরুরি। তাদের প্রতিবেদনে এ-ও জোর দিয়ে বলা হয়েছে, রোবটটির ওপর কাজের
চাপ বেশি ছিল কি না, খতিয়ে দেখতে হবে। সপ্তাহজুড়েই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে।
গুমি সিটি কাউন্সিল জানায়, রোবটটি এত দিন শহরের একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তার (সিভিল সার্ভেন্ট) দায়িত্ব পালন করছিল। রোবটটি দৈনিক নথি সরবরাহ, শহরে প্রচারণার কাজ করা এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের তথ্য প্রদানের সঙ্গে জড়িত ছিল। এক তলায় সীমাবদ্ধ বেশিরভাগ রোবটের বিপরীতে গুমি সিটি কাউন্সিলের রোবট লিফট ব্যবহার করতে পারত এবং স্বাধীনভাবে মেঝেতে চলাচল করতে পারত। ২০২৩ সালের আগস্টে শহরটিতে প্রথমবারের মতো প্রশাসনিক দায়িত্বে রোবটটি নিয়োগ দেওয়া হয়। সিটি হলের কর্মকর্তারা আদর করে রোবটটির নাম দেয় ‘স্টিভ’। রোবট ওয়েটার নির্মাণের জন্য পরিচিত ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক রোবটিকস স্টার্টআপ কোম্পানি বিয়ার রোবটিকস দক্ষিণ কোরিয়ার অর্ডার পেয়ে এটি তৈরি করেছিল। সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত রোবটটি কাজ করত বলে জানা গেছে। এমনকি রোবটটির নিজস্ব সিভিল সার্ভিস অফিসার কার্ড দেওয়া হয়েছিল। সিটি হলের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা স্টিভকে সিটি হলের অংশ হিসেবেই এত দিন ভেবেছি। ও একটা রোবট এমনটি আমাদের আসলে মনে হয়নি। বরং ওকে দেখলে কেমন অদ্ভুত উৎসাহ কাজ করত আমাদের মধ্যে। রোবটটি যত দিন ছিল তত দিন অধ্যবসায়ের সঙ্গে কাজ করেছে।’
রোবট অফিসার ২৬ জুন দুই
মিটার উঁচু সিঁড়ি থেকে নিচে পড়ে যায়। প্রথম ও দ্বিতীয় তলার মাঝখানের সিঁড়িতে
এ ঘটনা ঘটে। ঠিক কখন এ ঘটনা ঘটেছে তা অবশ্য জানা যায়নি। তবে সিটি
হলের কর্মকর্তারা রোবটটিকে অকেজো অবস্থায় উদ্ধার করেন। প্রাথমিকভাবে
ধারণা করা হচ্ছে, সিঁড়ির ওই অংশটুকুতে ইট কিছুটা দুর্বল হয়ে গিয়েছিল। আর দুর্বল হয়ে
যাওয়ায় ওখানে স্টিভ স্কিড করে পড়ে গেছে। পতনের ফলে স্টিভের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ক্ষতিগ্রস্ত
হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা দুর্ঘটনার আগে রোবটটিকে অদ্ভুত আচরণ
করতে দেখেছে বলে জানিয়েছে। কয়েকজন জানায়, রোবটটিকে তারা সিটি হলের পাশেই এক জায়গায়
বারবার ঘোরাফেরা করতে দেখেছে। তবে কখন রোবটটি পড়ে গিয়েছে এ ব্যাপারে
কোনো তথ্যই পাওয়া যায়নি। রোবটটির পড়ে যাওয়ার সঠিক কারণ অনুসন্ধানে এখনও তদন্ত চলছে বলে সিটি কাউন্সিলের একজন কর্মকর্তা এএফপিকে জানান।
ওই কর্মকর্তা এএফপিকে বলেন, ‘রোবটটি
পড়ে যাওয়ার পর ভেঙে গেছে। বেশকিছু জায়গা বিকল হয়ে গেছে। ভেঙে
যাওয়া ওই টুকরো সংগ্রহ করা হয়েছে। আমরা আপাতত রোবটটিকে
নির্মাতা কোম্পানির কাছে পাঠিয়েছি। তারা ওই ভাঙা টুকরোগুলো ভালোভাবে খতিয়ে দেখবে। আমরা
ওদের রিপোর্টের অপেক্ষা করছি।’
ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রোবটিকসের তথ্যানুসারে, দক্ষিণ
কোরিয়া রোবট ব্যবহারে বিশ্বব্যাপী এগিয়ে রয়েছে। প্রতি ১০ জন কর্মচারীর জন্য
একটি ইন্ডাস্ট্রিয়াল (শিল্প) রোবট রয়েছে দেশটিতে। এ ঘটনার
পর গুমি সিটি কাউন্সিল দ্বিতীয় রোবট অফিসার চালু করবে কি না
জিজ্ঞেস করা হয়। আপাতত এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি বলে জানা গেছে। গুমি সিটির বাসিন্দারাও
এ ঘটনায় শোকাহত হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনিক সেবার ক্ষেত্রে এ রোবট তাদের সহায়তা
করেছে। গুমি শহরের কিন শি নামের এক বাসিন্দা জানান, ‘মানুষের তুলনায় রোবটের সঙ্গে প্রশাসনিক
কাজকর্ম করা অনেক সহজ। অন্তত মানুষের সঙ্গে ঝামেলায় জড়ানোর বালাই ছিল না। আমরা শহরের
অনেকেই সিটি হলে ওর উপস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছিলাম। ঘটনাটি আমাদের চমকে দিয়েছে।
অদ্ভুত!’
বেশ কয়েকজন টেক বিশেষজ্ঞ ঘটনাটিকে ম্যালফাংশন হিসেবেই দেখছেন। এ ধরনের রোবটের প্রতিনিয়ত
প্রোগ্রামিং করানো হয়। আর প্রোগ্রামিং ম্যালফাংশনের কারণে অনেক সময় রোবট নাজুক পরিস্থিতিতে
পড়তে পারে। এ ঘটনাকে তারা ইমোশনাল ব্রেকডাউন বলে অভিহিত করছেন।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ নিয়ে চলছে গুঞ্জন। অনেকেই বিষয়টিকে রোবটের জন্য বড় সংকট হিসেবেই দেখছেন। একজন সিভিল সার্ভিস অফিসার হলে তার কিছু অধিকার তো রয়েছেই। কিন্তু স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে আত্মহত্যার খবর প্রচারিত হওয়ার পর শহরের অনেকেই জানিয়েছে, রোবটটিকে কোনো ছুটি দেওয়া হচ্ছিল না। সম্ভবত কাজের চাপ অনেক বেশি ছিল, আর তাড়াহুড়োয় রোবটটি সিঁড়িতে পড়ে গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ ইতোমধ্যে একজন পোস্ট করে জানিয়েছে, রোবটদের জন্য আলাদা ইউনিয়ন গড়ে তোলা দরকার। সচরাচর মানুষ যেসব ক্ষেত্রে কাজ করে সেসব ক্ষেত্রে রোবট অন্তর্ভুক্ত করার কাজে দক্ষিণ কোরিয়া অনেক এগিয়ে। কিন্তু সাম্প্রতিক এ ঘটনায় রোবট কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের ক্ষেত্রে মানবিক কিছু বিবেচনাও অন্তর্ভুক্ত করার দাবি উঠেছে। বিশেষত যেসব জায়গায় মানুষের বদলে রোবটকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, সেসব পদের ক্ষেত্রে কিছু বিষয় ভাবা জরুরি।
সূত্র : ইন্টারেস্টিং ইঞ্জিনিয়ারিং