প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ২৫ জুন ২০২৪ ২২:৩৮ পিএম
উইকিলিক্সের এক্স হ্যান্ডলে মঙ্গলবার জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের এই ছবি আপলোড করা হয়। ছবিটি অ্যাসাঞ্জের থাইল্যান্ডে পৌঁছুনোর সময় তোলা। (এএফপি)
জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের জীবন ঘটনাবহুল। দীর্ঘ দেড় দশক আইনি লড়াইয়ের পর অবশেষে যুক্তরাজ্যের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন উইকিলিকসের প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ। যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যর্পণের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই চালিয়ে গেছেন তিনি। অবশেষে গত সোমবার তাকে মুক্তি দিয়েছে যুক্তরাজ্য। নিজের অপরাধ স্বীকার করার বিষয়ে অ্যাসাঞ্জ সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে সমঝোতা চুক্তি করেছেন, সেটির ধারাবাহিকতাতেই তাকে ছেড়ে দিয়েছে যুক্তরাজ্য সরকার। অ্যাসাঞ্জ ইতোমধ্যেই যুক্তরাজ্যের কারাগার থেকে বের হয়েছেন বলে জানিয়েছে তার প্রতিষ্ঠান উইকিলিকস। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’-এ নিজেদের অ্যাকাউন্টে প্রতিষ্ঠানটি লিখেছে যে, যুক্তরাজ্যের কারাগারের একটি ছোট্ট কক্ষে ১৯০১ দিন বন্দি থাকার পর জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ ছাড়া পেয়েছেন।
তার এই মুক্তির ঘটনায় কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস এর প্রধান জোডি গিন্সবার্গ বলেন, 'জুলিয়ানের প্রত্যর্পণ বিশ্বের অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের জন্য বড় স্বস্তির খবর'। তাছাড়া অ্যাসাঞ্জ অস্ট্রেলিয়ারও নাগরিক। তাই তার এই মুক্তিতে অস্ট্রেলিয়ার সাবেক উপপ্রধানমন্ত্রী বার্নাবি জয়েস বলেন, 'অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে এই মামলা অহেতুক দীর্ঘায়িত করা হয়েছে। কারণ বিনিময়ে কিছুই পেতো না যুক্তরাষ্ট্র'।
কে এই জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ?
অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ডে জন্ম নেওয়া অ্যাসাঞ্জ মূলত একজন কম্পিউটার প্রোগ্রামার। অল্প বয়সেই কম্পিউটার
বিজ্ঞানে তিনি দক্ষ হয়ে ওঠেন। ‘মেন্ডাক্স’ নাম ব্যবহার করে তিনি
আমেরিকার মহাকাশ গবেষণা সংস্থা এবং পেন্টাগনসহ বেশ কয়েকটি সুরক্ষিত সিস্টেম হ্যাক
করে হইচই ফেলে দিয়েছিলেন।
১৯৯১ সালে অস্ট্রেলিয়ান কর্তৃপক্ষ তাকে ৩১টি সাইবার
অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত করে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অ্যাসাঞ্জ
নিজেদের দোষ স্বীকার করে নেওয়ায়, আদালত তাকে জরিমানা করেই ছেড়ে
দিয়েছেন। বিচারক রায়ে বলেন,
জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ এমন একজন, যার তারুণ্যের
অনুসন্ধানী মনের কারণেই তিনি বারবার এমনটি করেছেন। এর পেছনে অন্য কোনো গোপন
ইচ্ছে ছিল না।
মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞান
নিয়ে পড়াশোনা করতে গিয়েছিলেন। কিন্তু পদার্থবিজ্ঞানে মন তার বসতই
না। ডিগ্রি আর নিলেন না। বরং কম্পিউটার নিরাপত্তা পরামর্শদাতা
হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করেন। নিরাপত্তা পরামর্শদাতা হিসেবে ক্যারিয়ার খারাপ যাচ্ছিল
না। কিন্তু ওই যে অনুসন্ধানী মন? সেটি তো আছে। এবার পালা উইকিলিকসের।
বৈজ্ঞানিক
সাংবাদিকতার সূচনা
২০০৬ সাল থেকেই বিভিন্ন দেশের সরকার, প্রতিষ্ঠান
ও ব্যক্তির গোপন নথি প্রকাশের উদ্যোগ নেন অ্যাসাঞ্জ। তিনি ‘উইকিলিকস’
নামে একটি ওয়েবসাইট তৈরি করে ওই বছরের ডিসেম্বরেই সোমালিয়ার এক বিদ্রোহী নেতার বার্তা
প্রকাশ করে সাড়া ফেলে দেন। কীভাবে সোমালি বিদ্রোহীরা
ভাড়া করা বন্দুকধারীদের দিয়ে সরকারি কর্মকর্তাদের হত্যার ষড়যন্ত্র করতÑ সে
তথ্যই ওই নথিতে ছিল। এরপর একে একে কুখ্যাত গুয়ানতানামো বে কারাগার, ব্রিটিশ
ন্যাশনাল পার্টির গোপন সদস্য তালিকা, সায়েন্টোলজি আন্দোলনের গোপন
নথি এবং ইস্ট অ্যাঙ্গলিয়ার ইউনিভার্সিটির ব্যক্তিগত ই-মেলগুলোসহ আরও বেশ কয়েকটি
নথি প্রকাশ করে গোটা বিশ্বে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেন অ্যাসাঞ্জ।
জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ আসল বোমা ফাটান ২০১০ সালে। মার্কিন
সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা বিশ্লেষকের কাছ থেকে পাওয়া লাখ লাখ গোপন নথি ফাঁস করে
শোরগোল ফেলে দেন তিনি। বিশেষ করে ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধ সম্পর্কিত নাজুক ও
স্পর্শকাতর নথি। এসব নথিতে যুদ্ধকালীন মার্কিনদের বন্দি নির্যাতনের খবরও ছিল। ২০১০ সালের নভেম্বরে প্রায় আড়াই লাখ মাকিন কূটনৈতিক তার বার্তার নথি
প্রকাশ করে উইকিলিকস। যার মধ্যে ইরানকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার
মার্কিন প্রচেষ্টার তথ্য ছিল। এসব ঘটনায় বিশ্বজুড়ে
সরকারগুলো দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানাতে শুরু করে এবং উইকিলিকসের প্রকাশনা নিয়ে
নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাতে শুরু করে।
শুরু জুলিয়ান
অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে মামলা
জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা করে
যুক্তরাষ্ট্র। শুরু হয় গ্রেপ্তার তৎপরতা। গ্রেপ্তার এড়াতে এক পর্যায়ে অ্যাসাঞ্জ
লন্ডনের ইকুয়েডর দূতাবাসে আশ্রয় নেন এবং সেখানেই প্রায় সাত বছর কাটান। ২০১৯ সালে
গ্রেপ্তার হওয়ার পর,
গেল পাঁচ বছর যুক্তরাজ্যের কারাগারে ছিলেন অ্যাসাঞ্জ।
সেখানে বসেই আইনি লড়াই চালান তিনি। এর মধ্যেই ২০১০ সালের নভেম্বরে
অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে সুইডেনে দুই নারীকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগে মামলা হয়। জারি
করা হয় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা। অভিযোগ অস্বীকার করেন অ্যাসাঞ্জ।
২০১৯ সালের এপ্রিলে ইকুয়েডর দূতাবাস থেকে অ্যাসাঞ্জকে বের করে গ্রেপ্তার করে লন্ডন পুলিশ। যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যর্পণের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে গ্রেপ্তার করা হয় তাকে। শুরু হয় প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া। ২০১৯ সালের মে মাসে মার্কিন বিচার বিভাগ অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে গোপন নথি ফাঁস করার ষড়যন্ত্রের জন্য অভিযোগ গঠন করে। ২০২২ সালের ১৭ জুন যুক্তরাজ্য সরকার অ্যাসাঞ্জের যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যর্পণ অনুমোদন করে। এর বিরুদ্ধে আপিল করেন অ্যাসাঞ্জ। তার স্ত্রী স্টেলা অ্যাসাঞ্জ স্বামীর স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ জানালে আপিলে সুযোগ দেওয়া হয়। সেই আপিলের শুনানি হওয়ার আগেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এক সমঝোতায় যুক্তরাজ্যের কারাগার থেকে মুক্তি পান তিনি।
সূত্র: ভার্জ, গার্ডিয়ান, বিবিসি