প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ২২ জুন ২০২৪ ২০:৫৫ পিএম
জি-৭ সম্মেলন চলাকালে ১৫ জুন ইতালির আপুলিয়ায় কয়েকজন বিদ্রোহী যুদ্ধ বন্ধে জি-৭ নেতাদের ভূমিকা নেওয়ার দাবি জানানোর সময় তোলা ছবি। ব্যানারে বলা হয়েছে, ‘পৃথিবীর ধ্বংস বন্ধ করো’
ইতালির আপুলিয়ায় গত সপ্তাহে জি-৭ জোটের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এবারের সম্মেলনে বৈশ্বিক
সংঘাত বিশেষত রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং হামাস-ইসরায়েল যুদ্ধ বন্ধে জোটের তরফে উদ্যোগ-পরিকল্পনা
আলোচনার কথা বলা হলেও কার্যত কিছু মেলেনি। মাল্টিপোলার বিশ্বের প্রতিটি সমস্যার আন্তঃসংযোগ
শনাক্ত করতে পেরেছে, এমন একটি মন্তব্য জি-৭ নেতাদের মন্তব্যে পাওয়া গেলেও বাস্তবতা
ভিন্ন। বিশ্বের শক্তিশালী এই জোট যে ভূরাজনীতিতে অকেজো হয়ে পড়েছে, তা এখন স্পষ্ট। সম্মেলনের
শেষ বৈঠকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি উদার মনোভাব, পারস্পরিক সহযোগিতা, স্বাধীনমুক্ত
সমাজব্যবস্থা, মানবাধিকার নিশ্চিত করার বিষয়ে প্রতিশ্রুতির কথা বলা হয়। আন্তর্জাতিক
সংঘাত-সহিংসতা বন্ধে জোটের অঙ্গীকারের বিষয়টিও ইতোমধ্যে অনেক বিশ্লেষকের তির্যক মন্তব্যের
শিকার হয়েছে।
জি-৭ জোটের জন্য রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ একটি বড় সংকট। অথচ গাজায় গণহত্যার বিষয়ে
তাদের ভূমিকা আরও বেশি প্রত্যাশিত ছিল। জোটের প্রায় সবাই মধ্যপ্রাচ্যের একমাত্র গণতান্ত্রিক
রাষ্ট্র ইসরায়েলকে নানাভাবে সহযোগিতা করে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংঘাত নিরসন করে শান্তি
স্থাপনের জন্য জাতিসংঘের চার্টারের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে রাশিয়া থেকে জব্দকৃত ৫০ বিলিয়ন
মার্কিন ডলার সহযোগিতা দিচ্ছে ইউক্রেনকে। এ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে জোটটি অনেকাংশে রাশিয়ার
সঙ্গে যুদ্ধংদেহী মনোভাবই প্রকাশ করেছে। যুদ্ধ বন্ধে তাদের সিদ্ধান্ত আদতে কার্যকর
কি না, এ নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের বিষয়ে তারা কিছু সিদ্ধান্ত নিলেও গাজা সংকট নিয়ে সম্মেলনে
কার্যকর কোনো আলোচনাই হয়নি। রাশিয়ার ওপর যুদ্ধাপরাধের খড়গ নামাতে পারলেও ইসরায়েলের
ক্ষেত্রে তারা কিছুই করতে পারছে না। জাতিসংঘ সনদ অনুসারে তারা ‘মানবিক শ্রদ্ধা এবং
বৈশ্বিক শান্তি প্রতিষ্ঠার’ ব্রতের কথা বললেও গাজার বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি।
ইসরায়েল-ফিলিস্তিন যুদ্ধের ক্ষেত্রে বরং জি-৭ জোটের দ্বৈত অবস্থান দেখা গেছে। ২০২৩
সালের ৮ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের আক্রমণের কড়া সমালোচনা করেছেন জি-৭ জোটের নেতারা।
ইসরায়েলের নিরাপত্তার জন্য সার্বিক সহায়তার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে জোটটি। ইসরায়েল বরাবরই
দাবি করে আসছে, হামাস সাধারণ ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে মিশে আত্মগোপন করছে। কোন কৌশলে হামাসকে
সাধারণ ফিলিস্তিনি থেকে আলাদা করা হবেÑ এ বিষয়ে জি-৭ জোট ইসরায়েলকে কোনো প্রশ্ন করেনি।
প্রত্যাশা ছিল, এ বিষয়ে সম্মেলনে আলোচনা হবে, কিন্তু কিছুই পাওয়া যায়নি। গাজায় একের
পর এক সামরিক অভিযান আন্তর্জাতিক আইন অনুসারেই পরিচালিত হচ্ছে বলে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু
ইসরায়েল হামাস ও সাধারণ ফিলিস্তিনিদের আলাদা করছে কীভাবে এবং সাধারণ মানুষের মৃত্যুর
বিষয়টিকে কীভাবে সামলাচ্ছে, এ নিয়ে কোনো আলোচনাই হয়নি। মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলকে কেন্দ্র
করে লেবানন, ইরান, ফিলিস্তিনের সংকট যেভাবে বাড়ছে, তার জন্য দ্রুত কৌশল ও কার্যকর পদক্ষেপের
প্রত্যাশা ছিল। তা এই সম্মেলনের মুখ্য আলোচনার বিষয় হবে বললেও কিছু হয়নি।
জি-৭ বৈঠকে জো বাইডেনের গাজায় যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়েছে। জোটের নেতারা
হামাসকে নিঃশর্তে প্রস্তাব মেনে নিতে বলেছেন। হামাস যদিও এই প্রস্তাবনায় কিছু সংশোধনী
দাবি করেছে। আপাতত ইসরায়েলের তুলনায় এই প্রস্তাব বাস্তবায়নে হামাসেরই কিছুটা আগ্রহ
দেখা গেছে। কিন্তু জি-৭ সম্মেলনে এই প্রস্তাবনা বাস্তবায়নের জন্য পর্যাপ্ত সহযোগিতার
বিষয়েও কোনো আলোচনা হয়নি। পাশাপাশি ১৩-১৪ এপ্রিলে ইসরায়েলের ওপর ইরানের হামলার সমালোচনা
করা হয়েছে। কিন্তু দামেস্কে ইসরায়েলি হামলায় ইরানের সামরিক সদস্যদের মৃত্যুর বিষয়ে
তারা কোনো মন্তব্য করেননি। অনেকে জি-৭ জোটের যুদ্ধ বন্ধের কৌশল আলোচনার ‘ডাবল স্ট্যান্ডার্ড’
চিহ্নিত করেছেন এসব থেকেই।
জি-৭ জোট সংঘাত বন্ধের ক্ষেত্রে দ্বৈতবাদী ভূমিকায়। তারা রাশিয়ার সঙ্গে ইউক্রেনের
যুদ্ধ অনেকাংশে উস্কেই দিচ্ছেন যেন। অপরদিকে গাজায় ৪০ হাজারেরও বেশি মানুষ ইসরায়েলি
সেনা হামলায় নিহত হওয়ার পরও তারা নিয়মবদ্ধ সামরিক অভিযান বলে অভিহিত করছেন। জোটের বৈঠকে
ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনের উত্থান একটি বড় সংকট হিসেবেই বিবেচিত হয়েছে। চীনের সঙ্গে
কোনো সংঘাতে না জড়িয়ে বিশ্ববাজারে নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখার কৌশল আলোচিত হয়েছে। বেইজিংয়ের
ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞার বিবেচনা, টারিফ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত ইউরোপের জন্য নেতিবাচক প্রভাব
বয়ে আনতে পারে বলে মন্তব্য অনেকের। বিশেষত দক্ষিণ চীন সাগরে বর্তমানে সংঘাত-সহিংস পরিস্থিতি
বাড়ছে। এই সংঘাতের দায় জি-৭ সম্মেলনে বেইজিংয়ের ওপর চাপানো হয়েছে। অথচ ওই অঞ্চলে বেশ
কয়েকটি দেশও এই সংঘাতের সঙ্গে জড়িত।
জি-৭ সম্মেলনে ব্রিকসের নেতাদের উপস্থিতি লক্ষ করা গেছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী
নরেন্দ্র মোদি উপস্থিত ছিলেন সম্মেলনে। ধারণা করা হচ্ছিল, দক্ষিণের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক
পোক্ত করার পথ হিসেবে ভারতকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। গ্লোবাল সাউথে চীন এখন বড় শক্তি।
বাণিজ্যিক প্রবাহও চীনের পক্ষে। জি-৭ আপাতত তাদের অর্থনৈতিক শক্তি অর্থাৎ মার্কিন ডলারকে
ব্যবহার করতে পারে। কিন্তু এ নিয়ে বেশি দিন হয়তো তারা টিকতে পারবে না। মার্কিন ডলারের
বিপরীতে নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ও কাঠামো গড়ে ওঠার বিষয়ে গত বছর থেকেই নানা আলোচনা-উদ্যোগ
দেখা গেছে।
জি-৭ জোটের নেতারা এখনও ভ্রমের মধ্যেই রয়েছেন। তারা বুদ্ধিবৃত্তিক পদ্ধতিতে বৈশ্বিক সমস্যার সমাধানের যে প্রত্যাশা করছেন, তা বাস্তব থেকে অনেক দূরে। বরং এই জোটের শক্তি আরও খর্ব হচ্ছে।
সূত্র : পলিটিকো