প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ২১ জুন ২০২৪ ২১:১৩ পিএম
উত্তর কোরিয়ায় গত বুধবার সফর করেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ওইদিন রাত তিনটায় বিমানবন্দরের টারমাকে তাকে অভ্যর্থণা জানান দেশটির প্রেসিডেন্ট কিম জং উন
সম্প্রতি এশিয়ায় দুটো সফর করেছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন।
প্রথমে উত্তর কোরিয়ায় সুরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর এবং পরে ভিয়েতনাম সফর। দুটো সফরের পর
থেকেই পুতিনের এজেন্ডা নিয়ে চলছে কানাঘুষা। বিশেষত, উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সুরক্ষা চুক্তি
করার পর ইউক্রেনকে প্রাণঘাতী অস্ত্র দেওয়ার বিষয়টি দক্ষিণ কোরিয়া পুনর্বিবেচনা করবে
জানিয়েছে। এর প্রতিক্রিয়ায় রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন দক্ষিণ কোরিয়াকে সতর্ক
করে বলেছেন, রাশিয়ার বিরুদ্ধে লড়াই করতে কিয়েভকে যদি সিউল অস্ত্র দেয়, তবে বড় ধরনের
ভুল করবে। পরমাণু অস্ত্রধারী দেশ উত্তর কোরিয়া সফর ও দেশটির নেতা কিম জং-উনের সঙ্গে
প্রতিরক্ষা চুক্তি সইয়ের এক দিন পর গতকাল বৃহস্পতিবার ভিয়েতনামে সাংবাদিকদের সঙ্গে
আলাপকালে কথাগুলো বলেন পুতিন। তিনি বলেন, সিউল যদি কিয়েভকে অস্ত্র সরবরাহ করার সিদ্ধান্ত
নেয়, তবে মস্কো এমন সিদ্ধান্ত নেবে, যা দক্ষিণ কোরিয়ার বর্তমান নেতৃত্বকে খুশি করার
সম্ভাবনা কম।
রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে একটি সার্বিক কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তি
সই হয়েছে। চুক্তিতে কোনো পক্ষ আগ্রাসনের শিকার হলে পারস্পরিক সহযোগিতার কথা বলা হয়েছে।
এর প্রতিক্রিয়ায় সিউলের পক্ষ থেকে কিয়েভকে অস্ত্র দেওয়ার সম্ভাবনার কথা বলা হয়। জবাবে
পুতিন সিউলকে সতর্ক করে দেন। পুতিন আরও বলেছেন, উত্তর কোরিয়াকে অস্ত্র সরবরাহ করতে
পারে রাশিয়া। মূলত ইউক্রেনে পশ্চিমা অস্ত্র সরবরাহের প্রতিশোধ হিসেবে মস্কো এ পদক্ষেপ
নেবে বলে জানিয়েছেন তিনি। এ ছাড়া রুশ প্রেসিডেন্ট সতর্ক করে আরও বলেন, ‘যারা কিয়েভকে
অস্ত্র সরবরাহ করে ভাবছেনÑ তারা রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধে জড়াচ্ছেন না, তাদের বলছি, রাশিয়ার
পক্ষ থেকে পিয়ংইয়ংসহ বিশ্বের অন্য অঞ্চলেও অস্ত্র সরবরাহ ও সংরক্ষণ করার অধিকার রয়েছে।’
এদিকে পুতিনের ওই মন্তব্যের পর গতকাল শুক্রবার দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের
কার্যালয় থেকে বলা হয়, ইউক্রেনকে অস্ত্র সরবরাহের নানা উপায় তারা বিবেচনা করছে। তাদের
অবস্থান নির্ভর করছে রাশিয়া এ বিষয়ে কীভাবে অগ্রসর হবে তার ওপর। সিউলে রুশ রাষ্ট্রদূত
জর্জি জিনোভিভকে ডেকে তারা চুক্তির প্রতিবাদ জানিয়েছে এবং দ্রুত চুক্তি বাতিলের দাবি
জানিয়েছে।
এদিকে রাশিয়া-উত্তর কোরিয়ার সুরক্ষা চুক্তিতে কিছুটা বিপাকে পড়েছে
চীন। যদিও দেশটির তরফে এখন পর্যন্ত কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। চীনের সঙ্গেও উত্তর
কোরিয়ার সুরক্ষা নীতি রয়েছে। তা ছাড়া রাশিয়ার সঙ্গেও দেশটির দীর্ঘমেয়াদি বন্ধুত্ব।
সংগত কারণেই রাশিয়া উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে এমন চুক্তি করতে পারে। কিন্তু এই চুক্তি স্বাক্ষরিত
হওয়ায় চীনের নিরাপত্তা শঙ্কা বেড়েছে বলে জানিয়েছে একাধিক সূত্র। সুরক্ষা চুক্তির মাধ্যমে
পিয়ংইয়ং প্রশাসনের ওপর চীনা প্রভাব অনেকাংশে কমেছে বলে জানা গেছে। ইতোমধ্যে উত্তর কোরিয়া
থেকে মস্কোতে ৭ হাজার কন্টেইনার প্রাণঘাতী অস্ত্র পাঠানো হয়েছে। চীন উত্তর কোরিয়ার
সঙ্গে সম্পর্ক ভালো রাখার জন্য কূটনৈতিক তদ্বির বাড়িয়েছে। ক্রেমলিন ভালোমতো জানে, বেইজিংয়ের
প্রভাবমুক্ত হতে পারলে একসময় উত্তর কোরিয়া চীনকে আক্রমণ করতে পারে। প্রায় এক যুগ ধরে
চীন পিয়ংইয়ং প্রশাসনের ওপর প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা চালাচ্ছে। বিশেষত দেশটির পরমাণু
অস্ত্র গবেষণায় চীন প্রায়ই নানা সহযোগিতা দিয়ে থাকে। তবে রাশিয়ার সঙ্গে নতুন এই চুক্তিতে
চীন পড়েছে বিপাকে। চীন উত্তর কোরিয়ার সবচেয়ে বড় বাণিজ্য মিত্র হলেও রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়ন
তাদের জন্য নেতিবাচক ফল নিয়ে আসতে পারে।
উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে রাশিয়ার সুরক্ষা চুক্তিতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের
গতিবিধি পরিবর্তনের বড় সম্ভাবনা নেই। তবে বিশ্লেষকদের মতে, পুতিন সামরিক রসদের জন্য
বেপরোয়া হয়ে উঠছেন। এজন্য নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও যতটুকু সম্ভব তিনি মিত্রশক্তি বাড়ানোর
চেষ্টা করছেন। পুতিন জানেন এই যুদ্ধে রাশিয়া একা জিততে পারবে না। ফলে ভূরাজনৈতিক সমীকরণের
হিসাব তাকে করতে হচ্ছে। চীন ইতোমধ্যে রাশিয়াকে অস্ত্র সরবরাহে ব্যর্থ হয়েছে। তাই রাশিয়াকে
বিকল্প সহযোগী রাষ্ট্র খুঁজতে হচ্ছে। চীন যদি রাশিয়াকে সহযোগিতা করতেও চায়, পশ্চিমা
নিষেধাজ্ঞার ভয়ে সে পথও বন্ধ। উল্লেখ, চলতি বছর চীনের অর্থনীতি বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে।
উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সুরক্ষা চুক্তিকে অনেকেই পুতিনের রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখছেন।
নিরাপত্তা শঙ্কা থেকে চীন এখন রাশিয়াকে অনানুষ্ঠানিকভাবে সহযোগিতা করতে বাধ্য হবে।
আর যদি তা না হয়, তাহলে উত্তর কোরিয়া তো রয়েছেই। সূত্র : দ্য কনভারসেশন