ফিলিস্তিনে গণহত্যা
প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ১৫ জুন ২০২৪ ২২:২০ পিএম
উত্তর গাজার দেইর আল বালাহ শহরে অস্থায়ী ক্যাম্পের নাদিয়া হামুওদা বাসিন্দার মেয়ে কদিন আগেই ইসরায়েলি সেনাদের হামলায় মারা গেছেন। তিনি আলজাজিরাকে বলেন, ‘এবার আমাদের ভাগ্যে ঈদ নেই।’
পূর্ব জেরুজালেমে নেই ঈদের আনন্দ। গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি সামরিক
বাহিনীর আচমকা হামলার শঙ্কায় উৎসবের আনন্দ অনেকাংশেই ম্লান হয়ে আছে। ইসরায়েলের আগ্রাসন
অঞ্চলটিতে শঙ্কার কালো ছায়া ফেলে রেখেছে। পূর্ব জেরুজালেমে স্বজন হারানোর বেদনা বুকে
চেপে ত্যাগের প্রকাশ ঘটানোর চেষ্টাও রয়েছে। অর্থনৈতিক সংকটের মাঝেও পূর্ব জেরুজালেমের
বাজারে ঈদের সওদা করতে দেখা গেছে ফিলিস্তিনিদের।
আছে শুধু ক্ষুধা, যুদ্ধ এবং অসহায়ত্ব
মাত্র এক বছর আগেও ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় কোরবানির ঈদ উদযাপন
হয়েছে মহা-আড়ম্বরে। পরিবারের সবাই একত্রিত হয়েছেন। পশুর গোশত বিতরণ করা হয়েছে। নতুন
পোশাক পরে গাজার বিভিন্ন শহরে রঙ ছড়িয়েছেন অনেকে। শিশুদের কলকাকলিতে মুখর গাজা উপত্যকা
এখন বিধ্বস্ত, ধ্বংসস্তূপ। ধ্বংসস্তূপের আড়ালে হারিয়ে যাওয়া কিছু সম্পদ কিংবা খাবার
সংগ্রহে অনেককেই দেখা যায় বিচ্ছিন্নভাবে।
বিগত আট মাস ধরে হামাস-ইসরায়েল যুদ্ধে বিধ্বস্ত ফিলিস্তিনের মানুষদের
প্রয়োজনীয় খাদ্য নেই। অধিকাংশ পরিবারকেই কেনভর্তি খাবার খেতে হচ্ছে। সৌভাগ্যবান কজনের
জন্য অস্থায়ী তাঁবুর ব্যবস্থা হলেও অনেকের ভাগ্যে জুটেছে খোলা আকাশ। বাজারে কোরবানির
পশু অনেক কম। যুদ্ধে অনেক পশুই মরেছে। এবারের ঈদে স্বজনদের অনেকেই নেই। কোনো ঈদ উপহারের
কথাও কেউ কল্পনা করতে পারছে না। যদি কোনোভাবে রাফা সীমান্ত দিয়ে কিছুটা ত্রাণ ও চিকিৎসা
রসদ আসে তাহলেই খুশি সবাই। উত্তর গাজার দেইর আল বালাহ শহরে অস্থায়ী ক্যাম্পের নাদিয়া
হামুওদা বাসিন্দার মেয়ে কদিন আগেই ইসরায়েলি সেনাদের হামলায় মারা গেছেন। তিনি আলজাজিরাকে
বলেন, ‘এবার আমাদের ভাগ্যে ঈদ নেই। ধ্বংসস্তূপ থেকে আজানের ধ্বনি এলে আমাদের কান্না
করা ছাড়া কিছুই থাকে না। আমরা কাঁদছি যা হারিয়েছি তার জন্য। আমাদের জীবনের এই পরিণতির
জন্য আমরা একসঙ্গে কাঁদি। অনেকেই কান্নায় সান্ত্বনা খুঁজে পান।’
যুদ্ধের আগেও গাজা উপত্যকার বাসিন্দাদের নানা সংকটে জীবন পার করতে
হয়েছে। তারপরও বছরের দুটো ঈদ তারা ধুমধামের সঙ্গে উদযাপন করতেন। বাজার থেকে কোরবানির
পশু অনেকেই শরিকে কিনতেন। গরিবদের মাঝে গোশত বিতরণ হতো। হামুওদা জানান, ‘ওই সময় আসলে
ঈদ ছিল। কম ছিল কিন্তু সবাই খুশি ছিল। বাচ্চাদের হাসি দেখলেই ঈদ পূরণ হতো আমাদের।’
আল আকসা মসজিদে জামাতের সুযোগ নেই
গাজা উপত্যকার পশ্চিম দেয়ালের পাশে আবু দিস এলাকায় কোরবানির পশু বিক্রি
হচ্ছে। সাড়ে ৪ লাখের বেশি ফিলিস্তিনি গাজার পশ্চিম দেয়ালের কারণে শহরে চলাচল করতে পারছেন
না। ফলে আবু দিসের কোরবানির বাজারেও নেই ক্রেতা। জেরুজালেমের সঙ্গে আবু দিসের মতো সংখ্যাবহুল
এলাকার সংযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে। আবু দিসের মানুষরা শুধু চাকরি কিংবা স্কুলে
যাওয়ার জন্য পশ্চিমের দেয়াল পার হতে পারেন। সেজন্য আগে ইসরায়েলি চেকপয়েন্ট পার হতে
হয়। অর্থাৎ কোরবানি ঈদে স্বজনদের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ তাদের নেই। আবু দিসের নিকটবর্তী
দেয়ালের কারণে প্রায় ত্রিশ লাখ মানুষ পূর্ব জেরুজালেমে যেতে পারেন না। ফলে তারা ঈদের
বাজার করতে পারছেন না।

ফিলিস্তিনিদের অধিকাংশই পূর্ব জেরুজালেমের আল আকসা মসজিদে ঈদের জামাত
আদায় করতে চান। কিন্তু পূর্ব জেরুজালেমে অবস্থিত পশ্চিম দেয়ালের কারণে সে ইচ্ছে পূরণ
হচ্ছে না ২০০৩ সাল থেকে। এত কাছে প্রিয় ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, তবু কত দূরে। পূর্ব জেরুজালেমের
এই বিচ্ছেদক দেয়ালের কারণে প্রতি বছর ফিলিস্তিনের ১৯৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ
অর্থনৈতিক ক্ষতি হয় বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের এক প্রতিবেদন। পূর্ব জেরুজালেম থেকে আবু
দিসের দূরত্ব মাত্র কয়েক কিলোমিটার। কিন্তু ফিলিস্তিনিদের ইসরায়েলি চেকপয়েন্ট কিংবা
ইহুদিদের অবৈধ দখলকৃত জায়গা পার হতে ঘণ্টাখানেক সময় লেগে যায়। তাতে জীবনের ঝুঁকিও থাকে
বিশাল।
আবু দিস লাইভস্টক অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান আবু জওহর এপি নিউজকে জানান,
‘এই দেয়ালের কারণে ঈদের কেনাকাটা বা উৎসবের আমেজ থেকে বঞ্চিত হন লাখো ফিলিস্তিনি। পশু
বিক্রির মাধ্যমেই অধিকাংশ ফিলিস্তিনি গোটা বছর চলার মতো কিছু টাকা সংগ্রহ করতে পারেন।
ইসরায়েলের হামলায় অনেক পশু ও সম্পদ হারিয়েছেন ফিলিস্তিনিরা। এ বছর তাই সংকট আরও বেশি।
খাবারই জুটছে না। তারপরও ছোট পরিসরে হাট দেওয়া হয়েছে। কিন্তু মধ্য গাজার কেউই এখানে
আসতে পারছেন না।’ আবু জওহর আরও জানান, ‘রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে পশুখাদ্যের সরবরাহ
কমেছে। দামও বেড়েছে। ইসরায়েলের হামলার কারণে পশুদের স্থানান্তর ব্যয় এবং ক্ষতির শঙ্কাও
অনেক।’
খান ইউনিসে কোরবানির পশুই নেই
গাজার খান ইউনিসে কোরবানির পশুই নেই। খান ইউনিসের বাজারে দোকানপাটও খোলা নেই। কেনভর্তি খাবারের কিছু দোকান রয়েছে। তবে সেখানেও ক্রেতার সংখ্যা কম। আট মাসের এই যুদ্ধে ৩৭ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। গাজার কৃষি ও খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থা নাজুক হয়ে পড়েছে। বিশেষত ইসরায়েলি নিষেধাজ্ঞার কারণে মানবিক সহায়তা ও ত্রাণের পথও বন্ধ। চিকিৎসার অভাবেই অনেকে মারা যাচ্ছেন।

সম্প্রতি এক মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদনে বলা
হয়েছে, গাজার খান ইউনিসে একটি হাসপাতাল এখনও টিকে আছে। সেখানে কিডনির রোগে আক্রান্তরা
চিকিৎসার জন্য আসছেন। কিন্তু তারা পর্যাপ্ত চিকিৎসা পাচ্ছেন না। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে,
সংখ্যাটি ১৫০০-এর বেশি। জাতিসংঘ তাদের এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, কোরবানি ঈদের সপ্তাহে
মধ্য গাজার প্রায় অর্ধেক মানুষ চরম খাদ্যাভাবে ভুগবেন।
একটি ভেড়া কিনতে গুনতে হবে ১৩০০ ডলার
চলতি বছরের মে মাসে মিসর রাফাহ সীমান্ত বন্ধ করে দেওয়ায় সীমানা পাড়ি
দিয়ে কোনো ফিলিস্তিনি যেতে পারছেন না। কোরবানি ঈদে অনেকেই মিসরে স্বজনদের সঙ্গে সময়
কাটানোর চিন্তা করলেও সে পথ বন্ধ। রাফাহ সীমান্ত বন্ধ হওয়ায় এবার ২৫০০ ফিলিস্তিনি হজে
যেতে পারেননি। এদিকে গাজার বিভিন্ন বাজারে মাংসের দাম চড়া। স্থানীয় এক ফিলিস্তিনি আবদেল
সাত্তার আল বাসত আলজাজিরাকে জানান, ‘এক কেজি মাংসের দাম ২০০ শেকেল (প্রায় ৫০ মার্কিন
ডলার)। আগে ২০০ মার্কিন ডলারেই একটা ভেড়া পাওয়া যেত। এবার দাম ১৩০০ ডলারের কাছাকাছি
চলে গেছে।’