প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ১০ জুন ২০২৪ ২০:২০ পিএম
আপডেট : ১০ জুন ২০২৪ ২০:২১ পিএম
হার্ভার্ডের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা মক গ্র্যাজুয়েশন সেরেমনি উদযাপন করেন
মাত্র দুই সপ্তাহ আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রসিদ্ধ হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট সেরেমনি শেষ হয়েছে। তবে ১৩ জন শিক্ষার্থী এখনও পাননি তাদের শিক্ষাসনদ। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে আরও এক বছর অপেক্ষা করতে হবে তাদের।
১৩ জনের একজন পাকিস্তানের লাহোর থেকে আগত আসমার আসরার শফি।
সাফি বাদে আরও ১২জন শিক্ষার্থীকেও একই অভিজ্ঞতার
মুখোমুখি হতে হয়েছে। বিগত চার বছর ধরে প্রসিদ্ধ এই বিদ্যাপীঠে তারা কঠোর পরিশ্রম করেছেন।
কিন্তু স্নাতক ডিগ্রি পেতে তাদের আরও এক বছর অপেক্ষা করতে হবে।
হার্ভার্ড
করপোরেশন ১৩জন শিক্ষার্থীর শিক্ষাসনদ এক বছরের জন্য স্থগিত করার নির্দেশ দিয়েছে। তাদের
বিরুদ্ধে অভিযোগ, চলতি বছর ২৩ মে শুরু হওয়া তিন সপ্তাহব্যাপী ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতিজ্ঞাপক
ক্যাম্পেইনে যোগ দেয়া। ২৩ বছর বয়সী শফি হার্ভার্ডে
সোশ্যাল স্টাডিজ অ্যান্ড এথনিসিটি, মাইগ্রেশন অ্যান্ড রাইটসের শিক্ষার্থী। তিনি আল
জাজিরাকে জানান, ‘আমি সনদের জন্য আবেদন করছি। এখন অপেক্ষা ছাড়া
কিছু করার নেই। একজন রোডস স্কঅলার হিসেবে আমি অক্সফোর্ডে ম্যাট্রিকুলেটের সুযোগ পাই।
কিন্তু সনদ এক বছরের জন্য স্থগিত করায় সে সুযোগ আপাতত বন্ধ। অথচ স্নাতক সনদ পাওয়ার
সব যোগ্যতা ও শর্ত আমি পূরণ করেছি’। শফির অন্য সহপাঠী শ্রদ্ধা যোশিরও সনদ স্থগিত
করা হয়েছে। শ্রদ্ধা আল জাজিরাকে জানান, ‘আমাকে আবেদন করতে বলা হয়েছে। আমার ফ্যাকাল্টিরাও
বুঝতে পারছেন না এ সময় কি করা উচিত। কবে নাগাদ আমাদের আবেদন গ্রহন করা হবে এ বিষয়ে
কিছু জানা যায়নি’। হার্ভার্ডে স্নাতক শেষে যোশি যুক্তরাজ্যে মাস্টার্স
করার পরিকল্পনা করেছিলেন। তবে পরিস্থিতি এখন অনিশ্চয়তার ছায়ায় ঢেকে গেছে। একই অবস্থা
বাকি ১১ জনেরও।
যুক্তরাষ্ট্রের
অন্য বিদ্যাপীঠের মতো হার্ভার্ডেও ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতি জানিয়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন
বাড়ছে। গাজায় ইসরায়েলের আগ্রাসন বন্ধের দাবির পাশাপাশি ইসরায়েলের সঙ্গে যেকোনো বুদ্ধিবৃত্তিক
সংযোগ বন্ধের দাবি জানিয়ে আসছে তারা। হার্ভার্ডের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার ছয় মাস
পর ক্লডিন গে চলতি বছর জানুয়ারিতে পদত্যাগ করেন। কলেজ ক্যাম্পাসে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর থেকে শিক্ষার্থীদের একটি অংশে ‘অ্যান্টি সেমিটিজম’ আক্রোশ বৃদ্ধির কথা বলে তিনি দায়িত্ব ছেড়ে দেন।
তিনি শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে বর্ণবাদের আলামতও পেয়েছিলেন।
চলতি
বছর এপ্রিলে নিউ ইয়র্কের আইভি লীগভুক্ত কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা গাজায়
ইসরায়েলের আগ্রাসন বন্ধের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। আন্দোলনে তারা ইসরায়েলের সঙ্গে
বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পর্কচ্ছেদের দাবি জানান। কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এই আন্দোলন দ্রুতগতিতে
যুক্তরাষ্ট্রে ছড়িয়ে পড়ে। চলতি বছর এপ্রিলে হার্ভার্ডেও আন্দোলন শুরু হয়।
আন্দোলনে
শিক্ষার্থীদের দেয়া শর্তের মধ্যে প্রধান, ইসরায়েলের যেসব বাণিজ্যিক ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের
সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কার্যক্রমের সম্পর্ক ও চুক্তি রয়েছে সেগুলো স্থগিত করতে
হবে। আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য হার্ভার্ড আউট অব অকুপায়েড প্যালেস্টাইন (হুপ) নামক
জোট গঠন করে হার্ভার্ডের শিক্ষার্থীরা। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে ১৪ মে এক
সমঝোতায় জোট তাদের কার্যক্রম গুটিয়ে নেয়। সমঝোতায় অন্তত ২০জন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের
ক্যাম্পাসত্যাগের শর্ত দেয়া হয়। পরবর্তীতে শিক্ষার্থীদের ওপর এই বহিষ্কারাদেশ তুলে
দেয়ার বিষয়েও রাজি হয় হার্ভার্ড প্রশাসন।
সনদ
স্থগিত হওয়া শফি জানান, ‘আন্দোলন ক্রমেই ক্লান্তিকর হয়ে উঠছিল। আমরা বুঝতে
পেরেছিলাম যে আমাদের সাংগঠনিক দূর্বলতা প্রশাসন চিহ্নিত করতে পেরেছে। আমাদের তরফ থেকে
আমরা শর্ত মোতাবেক সব করলেও বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের বিষয়গুলো ভালোভাবে সামলায়নি’।
হার্ভার্ড
বিশ্ববিদ্যালয়ের তরফে বলা হয়েছিল, বহিষ্কারাদেশ পাওয়া শিক্ষার্থীদের দ্রুতই বহিষ্কারাদেশ
তুলে নেয়া হবে। তবে সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে ২০২৫ সালের মে মাস পর্যন্ত
এই আদেশ বহাল থাকবে। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্বশীল একজন জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত
এ সিদ্ধান্ত মৌখিকভাবে নেয়া হয়েছে। তবে এ বিষয়ে দ্রুতই সমাধান করা হবে বলে আশা করা
হচ্ছে।
হার্ভার্ডের
শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন সিদ্ধান্তকে ধিক্কার জানিয়েছে। তারা বিগত কয়েক সপ্তাহ
ধরে ফিলিস্তিনের পক্ষে সংহতি জানিয়ে র্যালি, সাংস্কৃতিক আয়োজন করছে। প্রতিটি কার্যক্রমে
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রমের সঙ্গে সমঝোতা করার প্রয়াস ছিল। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা
এও জানান, আন্দোলনকালে ইসরায়েলের পক্ষ নেয়া শিক্ষার্থীরা তাদের নানাভাবে অপদস্থ করেছে।
বিশেষত ফিলিস্তিন ও মুসলিমবিরোধী বর্ণবাদের শিকার হয়েছেন অনেকে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে
আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের দমানোর জন্য টিয়ার গ্যাস ছুড়তে পারে এমন ট্রাক সবসময় রাখা
হয়েছে। এমনকি আন্দোলনকারীদের বেইমান বলে ক্যাম্পাসে পোস্টার ছাপানো হয়েছে। সেখানে আন্দোলনের
নেতৃত্বদানকারী শিক্ষার্থীদের ছবি রাখা হয়। শিক্ষাসনদ স্থগিত হওয়া শিক্ষার্থীরা জানান,
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।
অন্যদিকে
হার্ভার্ড কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্ণবাদ কিংবা নিরাপত্তা নিশ্চিত
করার বিষয়ে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েছে। চলতি বছর জানুয়ারিতে হার্ভার্ডের প্রেসিডেন্ট গার্বার
ইসলামোফোবিয়া এবং অ্যান্টি-আরব বায়াস বন্ধে নতুন প্রেসিডেন্সিয়াল টাস্ক ফোর্স গঠন করেন।
আন্দোলন দমনে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ পুলিশের সাহায্য না নিলেও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে
আসা সমঝোতা পুরোপুরি পালন করেনি বলে দাবি শিক্ষার্থীদের। তারা জানাচ্ছেন, শিক্ষার্থীদের
ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে তারা আরও ক্ষেপিয়ে তুলছে।
সূত্র: আল জাজিরা