গোলাম কিবরিয়া
প্রকাশ : ২১ আগস্ট ২০২২ ১৭:২৬ পিএম
বাংলাদেশ অত্যন্ত গৌরবোজ্জল ঐতিহ্যের অধিকারী। আড়াই হাজার বছরের অধিক সময়ে এদেশে বিভিন্ন জনগোষ্ঠি, শাসক শ্রেণী গড়ে তোলে অসংখ্য ইমারত, নগর, প্রাসাদ, দুর্গ, মন্দির, মসজিদ, বিহার স্তুপ ও সমাধি সৌধ। এসব ঐতিহ্যের অধিকাংশই কালের গর্ভে বিলীন হলেও উল্লেখেযোগ্য সংখ্যক সংস্কৃতি চিহ্ন এদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে আজো টিকে আছে যা প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে সমধিক পরিচিত। এবার ইচ্ছে হলো তেমন কোনো ঐতিহ্যবাহী নিদর্শন ঘুরে আসি। যেই ভাবনা সেই কাজ। টিম 'আমার বাংলাদেশ' এর হয়ে মোট ১১ জন ঘুরে আসলাম টাঙ্গাইলের ঐতিহ্যবাহী মহেড়া জমিদার বাড়ি থেকে।
ঐতিহাসিক এই জমিদার বাড়িটি নান্দনিক স্থাপত্যশৈলীর জন্য মানুষের কাছে বেশ পছন্দের। প্রতিদিনই অনেক পর্যটক ঘুরতে আসে এখানে। সাপ্তাহিক ছুটির দিনে বেশি থাকে পর্যটকের উপস্থিতি। আমাদের যাওয়া হয়েছিল সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্রবারে। আগেই বলেছিলাম 'আমার বাংলাদেশ' ট্রাভেল গ্রূপ ইতিহাস ও ঐতিহ্য জানানোর তাগিদ অনুভব করে দেশের বিভিন্ন জমিদার বাড়ি ঘুরে দেখার উদ্যোগের কথা ভেবেছিলো। সেই ভাবনারই প্রথম প্রয়াস টাঙ্গাইলের মহেড়া জমিদার বাড়ি ভ্রমণ।
ঢাকার মহাখালী টাঙ্গাইল বাস স্ট্যান্ড থেকে সকাল ৮.৩০ মিনিটে নিরালা বাসে চড়ে আমরা রওনা হই টাঙ্গাইলের নটিয়াপাড়া বাসস্ট্যান্ড এর উদ্দেশ্যে। তারপর সেখান থেকে অটোতে করে মহেড়া জমিদার বাড়ি। অটোতে করে মহেড়া যাবার পথটা বেশ সুন্দর। গ্রামের মাঝ দিয়ে পিচঢালা পথ বয়ে গেছে।চারপাশটা সবুজে আচ্ছাদিত। মূল ফটকের কাছে এসেই অনুভব করতে থাকলাম বীরদর্পে দাঁড়িয়ে থাকা জমিদার বাড়ির সৌন্দর্য। টিকেট কেটে আমরা প্রবেশ করলাম। জনপ্রতি টিকেট মূল্য ৮০ টাকা।বাংলাদেশ পুলিশের তত্ত্বাবধানে থাকায় জমিদার বাড়ি ও এর চারপাশের আংগিনা বেশ গোছালো ও পরিপাটি মনে হলো।১ হাজার ১৭৪ শতাংশ জমির ওপর এই মহেড়া জমিদার বাড়ি অবস্থিত একে একে আমরা দেখে নিলাম ৪টি ঐতিহাসিক ভবন- চৌধুরী লজ, মহারাজ লজ, আনন্দ লজ, কালীচরণ লজ।
চৌধুরী লজ: জমিদার বাড়ি প্রবেশের পরেই মূল ফটক দিয়ে দেখা যায় চৌধুরী লজ। এটির গোলাপি রঙের ভবনটির পিলার গুলো রোমান স্থাপত্য শৈলীতে নির্মাণ করা হয়েছে। সুন্দর নকশাখচিত এই ভবনের ভেতরে রয়েছে ঢেউ খেলানো ছাদ। দোতলা বিশিষ্ট এই ভবনটির সামনে রয়েছে সুন্দর বাগান ও সবুজ মাঠ।
মহারাজ লজ: বাইজেনটাইন স্থাপত্য শৈলীতে নির্মিত মহারাজ লজ ভবনের সামনে ছয়টি (৬) টি কলাম রয়েছে। সেখানে গোলাপি রঙের মহারাজ লজের সামনে রয়েছে সিঁড়ির বাঁকানো রেলিং ও ঝুলন্ত বারান্দা যা ভবনের শোভা বৃদ্ধি করেছে। ভবনটিতে মোট কক্ষ আছে ১২টি, সামনে বাগান ও পেছনে একটি টেনিসসহ কোর্ট রয়েছে।
আনন্দ লজ: মহেরা জমিদার বাড়ির সবচেয়ে আকর্ষণীয় ভবন হলো আনন্দ লজ। নীল ও সাদা রঙের মিশ্রনে ভরা ভবনটির সামনে আট ৮টি সুদৃশ্য কলাম রয়েছে। তিন তলা বিশিষ্ট ঝুলন্ত বারান্দা এ ভবনকে করেছে আরো দৃষ্টিনন্দন। আনন্দ লজের সামনে হরিণ, বাঘ ও পশু-পাখির ভাস্কর্যসহ একটি চমৎকার বাগান আছে।
কালীচরণ লজ: জমিদারী প্রথা বিলুপ্তির শেষের দিকে নির্মিত এই কালীচরণ লজ অন্য ভবন থেকে অনেকটা আলাদা। ইংরেজি ‘ইউ’ (U) অক্ষরের আদলে এই ভবনটি ইংরেজ স্থাপত্য শৈলীতে নির্মিত। অন্যোন্য স্থাপত্য শৈলীর জন্য বিকেল বেলা ভবনের ভেতর থেকে সুন্দর আলোর ঝলকানি দেখা যায়।
ইতিহাস বলে ১৮৯০ দশকের পূর্বে স্পেনের করডোভা নগরীর আদলে জমিদার বাড়ীটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকবাহিনী মহেড়া জমিদার বাড়ীতে হামলা করে এবং জমিদার বাড়ীর কূলবধূ সহ পাঁচজন গ্রামবাসীকে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করে (১৯৭১)। পরবর্তীতে তারা লৌহজং নদীর নৌপথে এ দেশ ত্যাগ করেন। এখানেই তখন মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছিল। এ জমিদার বাড়ীটি ১৯৭২ সালে পুলিশ ট্রেনিং স্কুল হিসেবে প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় এবং পুলিশ ট্রেনিং স্কুলকে পুলিশ ট্রেনিং সেন্টারে উন্নীত করা হয় ১৯৯০ সালে। এই জমিদার বাড়ির সামনে প্রবেশ পথের আগেই রয়েছে ‘বিশাখা সাগর’ নামে বিশাল এক দীঘি এবং বাড়িতে প্রবেশের জন্য রয়েছে ২টি সুরম্য গেট। এছাড়াও মূল ভবনে পিছনের দিকে পাসরা পুকুর ও রানী পুকুর নামে আরো দুইটি পুকুর রয়েছে এবং শোভাবর্ধনে রয়েছে সুন্দর ফুলের বাগান। বিশাখা সাগর সংলগ্ন দক্ষিণ পার্শ্বে রয়েছে বিশাল আম্র কানন ও বিশাল তিনটি প্রধান ভবনের সাথে রয়েছে নায়েব সাহেবের ঘর, কাছারি ঘর, গোমস্তাদের ঘর, দীঘিসহ ও আরো তিনটি লজ। পরিপাটি সাজানো গোছানো পরিবেশের জন্যই বোধয় অনেক মানুষের সমাগম ঘটে মহেড়া জমিদার বাড়িতে, তা দেখেই বুঝতে পারলাম। ছুটির দিনটিতে পরিবারকে নিয়ে এমন একটি স্থানে আপনি ভ্রমণ তাই করতেই পারেন নির্দ্বিধায়।
যেভাবে যেতে হবে- ঢাকা থেকে টাঙ্গাইলগামী বাসে নাটিয়াপাড়া বাসষ্ট্যান্ডে নেমে অপেক্ষ্যমান সিএনজি বেবীটেক্সীযোগে (ভাড়া ৭৫ টাকা, শেয়ারে জন প্রতি ১৫ টাকা) ০৩ কিঃমিঃ পূর্ব দিকে মহেড়া জমিদার বাড়ি । মহাসড়কে পুলিশ ট্রেনিং সেন্টার, মহেড়া, টাঙ্গাইল নামে দিক নির্দেশনা ফলক (বিশাল সাইনবোর্ড) আছে। আর যারা উত্তরবঙ্গ থেকে আসবেন তারা যে কোন ঢাকাগামী বাসে টাঙ্গাইল পার হয়ে ১৭ কিঃমিঃ পর নাটিয়াপাড়া বাসষ্ট্যান্ডে নেমে একইভাবে যেতে পারেন।