মহিউদ্দিন অপু, বরগুনা
প্রকাশ : ০৩ জানুয়ারি ২০২৩ ১৬:৪২ পিএম
আপডেট : ০৩ জানুয়ারি ২০২৩ ২০:২৬ পিএম
সুরঞ্জনা ইকোপার্ক। ছবি : প্রবা
‘…ফিরে এসো সুরঞ্জনা, নক্ষত্রের রূপালি আগুন ভরা রাতে; ফিরে এসো এই মাঠে, ঢেউয়ে;... তোমার হৃদয় আজ ঘাস, বাতাসের ওপারে বাতাস-আকাশের ওপারে আকাশ।’
কথাগুলো রূপসী বাংলার জীবনের কবি জীবনান্দ দাশের। ‘আকাশলীনা’ কবিতায় এভাবেই খুঁজেছেন সুরঞ্জনাকে। জানা নেই সেই সুরঞ্জনার দেখা কবি পেয়েছিলেন কি না।
তবে আরেক সুরঞ্জনার দেখা মিলেছে বরগুনায়। জেলা শহরের পাশে সবুজ অরণ্যে ঘেরা স্থানটিতে বিস্তীর্ণ মাঠ, সবুজ ঘাস, পদ্মফুলের সমারোহ, কাশফুলের সাদা আভা ও স্নিগ্ধ বাতাসে ক্ষণে ক্ষণে মনে জাগে প্রশান্তি। চোখে ভেসে ওঠে রূপসী বাংলার বুকে ফুটন্ত এক টুকরো প্রাকৃতিক সুরঞ্জনা।
-63b405a4b95a9.jpg)
ইকোট্যুরিজমের উন্নয়নে সম্প্রতি ‘সুরঞ্জনা’ নামে এই ইকোপার্কটি তৈরি করা হয়। বরগুনা সদর উপজেলার ঢলুয়া ইউনিয়নের বরইতলার পাশে বিষখালী ও খাকদোন নদীর মোহনায় গড়ে উঠেছে এই পার্ক। নির্মাণের পর থেকে এখানে রীতিমতো ভিড় জমাচ্ছেন প্রকৃতিপ্রেমীরা।
ভরদুপুরে বেশ দূর থেকেও শোনা যায় পার্কটিতে থাকা নানা প্রজাতির পাখির কলতান। সুরে সুরে তারা মুগ্ধ করে আশপাশের পরিবেশ। পার্কের দুই পাশ দিয়ে সবুজ বনের বুক চিরে এগিয়ে গেছে আঁকাবাঁকা কাঠের সড়ক, শেষ হয়েছে বনের গহীনে গিয়ে। এই আঁকাবাঁকা পথ ধরে প্রকৃতিপ্রেমীরা হারিয়ে যান সবুজের গহীনে। ফেরেন মনে প্রশান্তি নিয়ে।
পার্কে রয়েছে ছৈলা, গোল পাতা, কেওড়াসহ নানা গাছ। পার্কের ঠিক মাঝে রয়েছে কুমির ও কাকড়ার অবয়ব। তাছাড়া রয়েছে বাঘ, সিংহ, হরিণ, বক, জিরাফ, কুমিরসহ বেশকিছু প্রাণীর অবয়ব।
শুধু অবয়বই নয়, এখানকার জল ও স্থলে রয়েছে নানান প্রাণী। পাখি, শিয়াল, বেজি, কাঠবিড়ালি, গুইশাপ, কাকড়া, গিরগিটিসহ নানা প্রাণীর দেখা মিলবে পার্কে। রয়েছে জঙ্গল বাড়ি, ক্যাফে ও মটকা চায়ের দোকান।
-63b405e65835c.jpg)
মান্না দে’র বিখ্যাত ‘কফি হাউজের আড্ডা’ গানের নিখিলেশ, মইদুলসহ চরিত্রগুলোর নামে গড়া হয়েছে একাধিক ফ্যামিলি কটেজ। পালকি ও দোলনা সাজিয়ে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য; আছে বায়োস্কোপও।
পার্কটির নির্মাণ পুরোপুরো শেষ হয়নি। তবু এখানে প্রবেশের পর নিখাঁদ প্রকৃতির আবেশে মুগ্ধ হচ্ছেন দর্শনার্থীরা। কথা তেমন কয়েকজনের সঙ্গে। এর মধ্যে পরিবার নিয়ে ঘুরতে এসেছেন জাহিদুর রহমান।
তিনি বলেন, ‘জেলায় বিনোদনের উল্লেখযোগ্য স্থান নেই। এমন প্রাকৃতিক পরিবেশের দরকার ছিল। যেটি আরও আগে থেকেই থাকলে মানুষের উপকার হতো। পরিবার নিয়ে এখানে দারুণ সময় কাটানো যায়।’
পরিবারের সঙ্গে এসেছে কিশোরী মীম।
সে বলে, ‘এখানে এসে মনে মচ্ছে যেন এক টুকরো সুন্দরবন। শহরের পাশে এমন প্রাকৃতিক পরিবেশ আর কোথাও আছে কি না জানা নেই। গোধূলির সময় পালকিতে বসে বা দোলনায় দোল খেতে খেতে প্রকৃতি দেখতে সত্যি মনটা আনন্দে ভরে ওঠে।’
-63b40614c7b39.jpg)
সুরঞ্জনা ইকোপার্কের উদ্যোক্তা সাংবাদিক ও আইনজীবী সোহেল হাফিজ।
তিনি বলেন, ‘উপকূলীয় জেলা বরগুনা। জেলার পরিচিতি বহন করতেই মূলত সুরঞ্জনা নির্মাণ করা। জেলায় অসংখ্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্যময় দর্শনীয় স্থান রয়েছে। উদ্যোগের অভাবে ইকোট্যুরিজম বিকশিত হয় না।’
জেলা কোস্টাল এনভারনমেন্ট প্রটেকশন নেটওয়ার্কের সমন্বয়ক রুদ্র রুহান বলেন, ‘সৈকত সৌন্দর্যে ভরপুর আমাদের বরগুনা। এখানে ইকোট্যুরিজম গড়ার জন্য রয়েছে অসংখ্য জায়গা। এ সবের সমন্বয় ঘটাতে পারলে এ জেলা হবে দক্ষিণাঞ্চলের ইকোট্যুরিজম জোন।’
বরগুনা-১ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাভোকেট ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু বলেন, ‘এই পার্ক নির্মাণের মাধ্যমে জেলার ইকোট্যুরিজম বিকশিত হচ্ছে। পিছিয়ে পড়া স্থানীয় জনগোষ্ঠী দ্রুত উন্ননয়নের পথে এগোচ্ছে। জেলায় এমন অসংখ্য দর্শনীয় প্রাকৃতিক স্থান রয়েছে। এভাবেই অপার সম্ভাবনাময় বরগুনার ইকোট্যুরিজম এগিয়ে যাবে।’