মুহাম্মদ জভেদ হাকিম
প্রকাশ : ১৪ আগস্ট ২০২২ ১৭:০৭ পিএম
আপডেট : ১৪ আগস্ট ২০২২ ১৭:৩১ পিএম
শত শত ডিঙি ভাসিয়ে বসে রয়েছে বিক্রেতা, পেয়ারা বিক্রির মৌসুম ঘিরেই চলে এই হাট। ছবি : ‘দে-ছুট’ ভ্রমণ সংঘ
বাংলাদেশের একমাত্র সীমান্তহীন জেলা বরিশাল। সেই জেলার পাশেই আরও দুটো জেলা পিরোজপুর আর ঝালকাঠি। আমরা ‘দে-ছুট’-এর বন্ধুরা ঘুরতে গিয়েছিলাম এই তিন জেলার আলিঙ্গন আটঘর-কুড়িয়ানা, আদমকাঠী আর ভিমরুলী। একটু আগে-পিছে হলেই জেলা বদল। জুলাইয়ের মাঝামাঝি হতে সেপ্টেম্বরের প্রায় শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত সরু খালের পানির ওপর বসে পেয়ারাবাজার। এবারের ভ্রমণসঙ্গী ছিল এক ডজন। রাতের জাহাজে চড়ে ডিনারে কলাপাতায় খিচুরি গোগ্রাস করে, এক ঘুমেই সকালে কিংবদন্তি শেরে বাংলার বরিশাল। লঞ্চঘাট নেমেই মাহেন্দ্র বাহনে সোজা বানারীপাড়া ফেরিঘাট। সেখান থেকেই ট্রলারে চেপে শুরু নৈসর্গিক পানি পথে ভীমরুলীর উদ্দেশে চলা।
আমাদের ভ্রমণ নির্বিঘ্ন করার দায়িত্বে ছিল স্থানীয় তারুণ্য শ্রী জয়ন্ত। ফলে ট্রলার, মাহেন্দ্র, খাবার-দাবারের হোটেল খোঁজাখুঁজির কোনো বাড়তি ঝামেলা ছিল না। ট্রলার বেশ কিছুক্ষণ চলার পর প্রথমে থামি কুড়িযানা। স্থানীয় বাজারে হালকা নাশতা সারার পর আবারও ভটভট আওয়াজ তুলে ট্রলার চলে। ধীরে ধীরে আামাদের গিলে খায় অবারিত সবুজের ক্যানভাস। শাহ্আলম, হামিদের বাড়তি উচ্ছ্বাসে খালের দুধারের আমড়া, পেয়ারাগাছগুলোও যেন নেচে ওঠে। থামি এবার আটঘর। এখানে বসে পানির ওপর ডিঙি নৌকার হাট। শত শত ডিঙি ভাসিয়ে বসে রয়েছে বিক্রেতা। পেয়ারা বিক্রির মৌসুম ঘিরেই চলে এই হাট।
সারিসারি নতুন নৌকা দেখে বেশ ভালো লাগে। বিভিন্ন জায়গা হতে ডিঙি তৈরি করে ট্রলারে করে নিয়ে আসে এখানে। আনার দৃশ্যটাও বেশ চমৎকার। এবার ছুটি ভাসমান পেয়ারাবাজার ভিমরুলী। যতই এগিয়ে যায় ট্রলার ততই যেন মুগ্ধতা গ্রাস করে। স্বচ্ছ পানির খাল সরু হতে সরু। কোথাও কোথাও দুই পাশের গাছের ডাল দুই দিকে ছড়িয়ে এক অন্যরকম নয়নাভিরাম সৌন্দর্যের রেখা টেনেছে। খালের ওপর আলো-ছায়া খেলে লুকোচুরি। সেই সঙ্গে তানিম আর তুহিনের ক্যামেরার সার্টারে ক্লিক ক্লিক। কবি জীবনানন্দ দাশের ধানসিঁড়ী নদী হতেই এই খরস্রোতা ধলহার খালের উৎপত্তি। এবার চোখে পড়তে শুরু করল বাজারে নিয়ে যাওয়া পেয়ারার নৌকা।

ঝরনার কাছাকাছি গেলে যেমন পাথুরে বোল্ডার আর রিমঝিম শব্দ শুনে বোঝা যায় আর বেশি দূরে নেই। ঠিক তেমনি এখানে গানের আওয়াজে বুঝলাম চলে এসেছি কাছাকাছি। সকাল সাড়ে ৯টায় ট্রলার ভেড়াল ভিমরুলীর মন্দির ঘাটে। পাড়ে উঠে দেখি পেয়ারার চাইতে যেন মানুষের মেলাই বেশি । অবশ্য তখনও বাজার শুরুই হয়নি। এই সুযোগে আশপাশ হেঁটে বেড়াই। বেলা প্রায় সাড়ে ১০টা নাগাদ বাজার জমতে শুরু করে। খালের দুই দিক থেকেই পেয়ারাভর্তি ছোট ছোট ডিঙি নৌকা এসে জমতে শুরু করল। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ফড়িয়া, ক্রেতা-বিক্রেতার হাঁকডাকে পেয়ারাহাট পুরোটাই জমজমাট। সেই সঙ্গে দেশের নানা প্রান্ত থেকে ঘুরতে যাওয়া মানুষের শোরগোল তো আছেই।স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তিরা এখনো পেয়ারাকে গয়া নামেই ডাকে। প্রতিদিন এই ভাসমান হাটে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ মণ পর্যন্ত পেয়ারা বেচাকেনা হয়।
পাশ্র্ববর্তী গ্রামগুলোর বিশাল বাগান থেকে বিক্রেতারা নৌকায় করে পেয়ারা নিয়ে আসে। স্থানীয়রা এখন বাণিজ্যিকভাবেই পেয়ারাবাগান করে থাকে। আশপাশের মোট ২১টি গ্রামের ৮৫০ হেক্টর জমির ওপর বর্তমানে ২ হাজার ২৫টি পেয়ারাবাগান রয়েছে। শুধু কুড়িয়ানা গ্রামেই ৬৪৫ হেক্টর জমিতে পেয়ারার চাষাবাদ হয়। বর্তমানে গ্রামবাসীর প্রধান আয়ের উৎস পেয়ারা চাষ। তাদের দেখাদেখি এখন বরিশালের বানারীপাড়া গ্রামগুলোয় শুরু হয়েছে বাগান করা; যা পেয়ারা চাষে ঘটছে নীরব বিপ্লব। এই অঞ্চলের পেয়ারা স্বাদে-রসেও বেশ মুখরোচক। বেলা প্রায় ১টা, জুমা নামাজের তাড়া। নামাজ শেষে যাই কীর্তিপাশা জমিদার বাড়ি। ভঙ্গুর অবস্থায় এখনো কালের সাক্ষী হয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। রাজা কীর্তি নারায়ণের নাম অনুসারে কীর্তিপাশা। কিন্তু বাড়িটির প্রতিষ্ঠাতা রামজীবণ সেন। এই বংশের সন্তান রোহিনী রায় চেীধুরী ও তপন রায় চৌধুরী দুটি উজ্জ্বল নক্ষত্র। তৎকালীন সময়ে তাদের রয়েছে বহু অবদান। আজ এই পর্যন্তই। সেই প্রসঙ্গে লিখব অন্য আরেক গলে গল্প।

যেভাবে যাবেন
ঢাকা হতে বরিশাল এসি/নন-এসি বাস সার্ভিস রয়েছে। তবে লঞ্চে ভ্রমণ হবে আরামদায়ক। প্রতিদিন সদরঘাট থেকে রাত ৮টা থেকে সাড় ৯টা পর্যন্ত বিভিন্ন কোম্পানির লঞ্চ বরিশালের উদ্দেশে ছেড়ে যায়। বরিশাল জাহাজঘাট থেকে সিএনজি/মাহিন্দ্রে কিংবা নথুল্লাবাদ বাসস্ট্যান্ড থেকে সরাসরি বানারীপাড়া বা ভিমরুলী যাওয়া যায়।
খাবারের ব্যবস্থা
ভিমরুলী ও কুড়িয়ানা বাজারে বেশ কিছু হোটেল রয়েছে। আগে থেকে বলে রাখলে চাহিদা অনুযায়ী খাবার মিলবে।
থাকবেন কোথায়
পেয়ারার ভাসমান হাট দেখার পর যদি কেউ বরিশালে দুয়েক দিন থেকে বিভিন্ন জায়গায় বেড়াতে চান তাহলে শহরের চকবাজারে বেশ কিছু ভালো মানের আবাসিক হোটেল রয়েছে।
যা করবেন না
উচ্চস্বরে গানবাজনা, চিৎকার, যেখানে সেখানে মোটরবাইক পার্কিং করবেন না। স্থানীয় এবং আগত পর্যটকদের সঙ্গে অশালীন আচরণ থেকে বিরত থাকুন।
প্রবা/জিকে/এমআই