× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

আইএসপি ইস্যুতে শৃঙ্খলা ফেরাতে শুদ্ধি অভিযান

ফসিহ উদ্দীন মাহতাব

প্রকাশ : ০৬ এপ্রিল ২০২৬ ১১:২৪ এএম

আপডেট : ২১ মে ২০২৬ ১৭:২৮ পিএম

বিটিআরসি ভবন। ছবি: সংগৃহীত

বিটিআরসি ভবন। ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের ইন্টারনেট সেবা খাতে বড় ধরনের শৃঙ্খলা ফেরানোর উদ্যোগ নিয়েছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) আইন ও নীতিমালা অনুসরণ করে পদক্ষেপ নেওয়া শুরু করেছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আইএসপি (ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার) ট্যারিফ অনুমোদন না নেওয়া এবং আরোপিত জরিমানা পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল করতে প্রক্রিয়া শুরু করেছে সংস্থাটি। এরই অংশ হিসেবে বাতিলের জন্য কমিশন থেকে সরকারের পূর্বানুমোদনে ডাক, তার ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। প্রয়োজনীয় সব তথ্য ও সুপারিশ সংযোজন করা হয়েছে। এখন সরকার যে সিদ্ধান্ত নেবে, সেটিই চূড়ান্তভাবে কার্যকর হবে।

তবে সরকারের একটি সূত্রমতে, এই অভিযানের মূল লক্ষ্য হচ্ছেÑ কাউকে শাস্তি দেওয়া নয়, বরং পুরো খাতে জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা। কিন্তু কেউ যদি নিয়মকানুন না মানে, তাহলে সরকার তার নিজস্ব গতিতে পদক্ষেপ নেবে। তা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে এটি গ্রাহক, ব্যবসা এবং দেশের ডিজিটাল অবকাঠামোর জন্য ইতিবাচক ফল আনতেই এমন সিদ্ধান্ত।

টিঅ্যান্ডটি মন্ত্রণালয়ের নথিপত্র থেকে জানা গেছে, মোট ৯৩টি আইএসপি প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত সময়ে ট্যারিফ অনুমোদন না নিয়ে গাইডলাইন লঙ্ঘন করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০০১-এর ৪৬(২) ধারা অনুযায়ী কারণ দর্শানোর নোটিস পাঠানোর আগে সরকারের পূর্বানুমোদন নেওয়া হয়। পরবর্তী ধাপে ২৪টি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স নবায়ন, কনভার্সন বা সমর্পণের মাধ্যমে বাতিল হয়ে যায়। অবশিষ্ট ৬৯টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৮টি প্রতিষ্ঠান জরিমানা পরিশোধ ও ট্যারিফ অনুমোদন নেওয়ায় অব্যাহতি পায়। ২৮টি প্রতিষ্ঠান জবাব দিলেও জরিমানা পরিশোধে বিলম্ব করে। ৩৩টি প্রতিষ্ঠান কোনো জবাবই দেয়নি। এই ৬১টি প্রতিষ্ঠানকে পুনরায় ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ৩৫টি প্রতিষ্ঠান জরিমানা পরিশোধে ব্যর্থ হয়; যারা এখন লাইসেন্স বাতিলের চূড়ান্ত ঝুঁকিতে।

কমিশন সভার সিদ্ধান্তে ধাপে ধাপে কঠোরতা : কমিশনের সভায় নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো ছিল সুসংগঠিত ও ধাপে ধাপে কঠোর। প্রথমে প্রতিষ্ঠানগুলোকে সুযোগ দেওয়া হয়Ñ জবাব দেওয়ার, জরিমানা পরিশোধের এবং নিয়ম মেনে ট্যারিফ অনুমোদন নেওয়ার। কিন্তু বারবার সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ার পর কঠোর অবস্থানে যায় কমিশন। এর ধারাবাহিকতায় ৩৫টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে লাইসেন্স বাতিলের জন্য সরকারের কাছে পূর্বানুমোদনের প্রস্তাব পাঠানো হয়। পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে যখন ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ দেখতে পায়, সরকারের পূর্বানুমোদন ছাড়াই ১৯টি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স ইতোমধ্যে বাতিল করেছে বিটিআরসি। এটি বড় ধরনের আইনগত প্রশ্ন তৈরি করে। কারণ আইন অনুযায়ী (ধারা ৪৬(৩)(খ)) লাইসেন্স বাতিলের আগে সরকারের অনুমোদন প্রয়োজন। কিন্তু বিটিআরসি সেই অনুমোদন ছাড়াই পদক্ষেপ নেয়। ফলে সরকার জানতে চেয়েছে পূর্বানুমোদন ছাড়া লাইসেন্স বাতিল আইনসঙ্গত কি না। ইতোমধ্যে বাতিল হওয়া লাইসেন্সের জন্য ‘ভূতাপেক্ষ অনুমোদন’ প্রয়োজন কি না। এটি প্রশাসনিক সমন্বয়ের ঘাটতি এবং ক্ষমতার সীমা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

তবে সরকারের পূর্বানুমোদন ছাড়াই কিছু লাইসেন্স বাতিলের ঘটনায় যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, সে বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিটিআরসির দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা স্বীকার করে বলেন, তাদের প্রশাসনিক সমন্বয়ের ঘাটতি ছিল। কিছু ক্ষেত্রে প্রক্রিয়াগত ত্রুটি হয়েছে, এটি তারা অস্বীকার করছেন না। ইতোমধ্যে বিষয়টি পর্যালোচনা করা হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে যাতে এমন পরিস্থিতি না তৈরি হয়, সেজন্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় জোরদার করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, তারা চানÑ শুধু শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নয়, একটি টেকসই ও সুশৃঙ্খল আইএসপি খাত গড়ে উঠুক। এজন্য নীতিমালা বাস্তবায়নের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সহায়তাও দেবে সংস্থটি। যারা নিয়ম মেনে চলবে, তাদের জন্য পরিবেশ আরও সহজ ও সহায়ক করা হবে।

নতুন সিদ্ধান্তে পুরনো জটিলতা : ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত কমিশনের সভায় বিষয়টি আবারও আলোচনায় আসে। সেখানে ২৭টি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিলের সুপারিশ করা হয়। ৭টি প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা পরিশোধের আরেকটি সুযোগ দেওয়া হয়। একটি প্রতিষ্ঠান (জেএস ইন্টারনেট) জরিমানা দেওয়ায় অব্যাহতি পায়। তবে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে একটি (ফিউচার টেক ব্রডবন্ড) লাইসেন্স নবায়ন না করায় আগেই বাতিল। ১৯টি প্রতিষ্ঠান মেয়াদোত্তীর্ণ হিসেবে বাতিল করা হয়েছে। ফলে বর্তমানে অবশিষ্ট ৭টি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিলে সরকারের পূর্বানুমোদন প্রয়োজন। অবশিষ্ট ৭টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে ডেভ কনসালট্যান্টস, ইন্টারনেট বাংলা নেটওয়ার্ক, সানপপ ব্রন্ডব্যান্ড, ট্রন ইন্টারন্যাশনাল, নিউপপ ইনস্টিটিউটশন অব ইনফরমেশন টেকনোলজি. ওএফসি নেটওয়ার্ক কমিউনিকেশন, এসএস নেটওয়ার্কস। 

বিটিআরসির ডেটা ইনফরমেশন সিস্টেম অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠানের গ্রাহক সংখ্যা তুলনামূলকভাবে সীমিত। ফলে কমিশনের ধারণাÑ লাইসেন্স বাতিল হলেও বড় ধরনের গ্রাহক ভোগান্তি বা আইএসপি খাতে বিরূপ প্রভাব পড়বে না।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘সংখ্যা কম হলেও স্থানীয় পর্যায়ে এর প্রভাব উপেক্ষা করা যাবে না, বিশেষ করে উপজেলা বা থানা পর্যায়ের সেবায়। এই পুরো ঘটনাপ্রবাহে দুটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছেÑ বিটিআরসি আইএসপি খাতে নিয়ম মানতে বাধ্য করতে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছে। ট্যারিফ অনুমোদন না নেওয়া বা জরিমানা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ কমে যাচ্ছে। সরকারি অনুমোদন ছাড়া লাইসেন্স বাতিলের ঘটনা প্রমাণ করে সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় ও আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণে দুর্বলতা রয়েছে।

সূত্র বলছে, বর্তমানে বল এখন সরকারের কোর্টে। অবশিষ্ট ৭টি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিলে পূর্বানুমোদন দেওয়া হবে কি না, তা নির্ধারণ করবে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ। একই সঙ্গে ইতোমধ্যে বাতিল হওয়া ১৯টি লাইসেন্সের বৈধতা নিয়েও সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আইএসপি খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে এই পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ হলেও আইনগত স্বচ্ছতা ও প্রক্রিয়াগত শুদ্ধতা নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতে আরও জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।

আইএসপি (ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার) খাতে শুদ্ধি অভিযানের অংশ হিসেবে লাইসেন্স বাতিল প্রক্রিয়া প্রসঙ্গে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. এমদাদ উল বারী, ওএসপি, এনডিসি, পিএসসি, টিই (অব.) প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ইন্টারনেট সেবা খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি আইন ও নীতিমালা অনুসরণ করে কাজ করছে। গ্রাহকের স্বার্থ রক্ষায় এবং বাজারে স্বচ্ছতা আনতে আমরা জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করচ্ছি। 

চেয়ারম্যান বলেন, প্রথম থেকেই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে একাধিকবার সুযোগ যেমনÑ কারণ দর্শানোর নোটিস, জরিমানা পরিশোধের সময় বৃদ্ধি এবং ট্যারিফ অনুমোদন। কিন্তু যারা বারবার নির্দেশনা অমান্য করেছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া ছাড়া তাদের কোনো বিকল্প নেই। শুধু শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নয়, একটি টেকসই ও সুশৃঙ্খল আইএসপি খাত গড়ে উঠুক। এজন্য নীতিমালা বাস্তবায়নের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সহায়তাও দেওয়া হবে। যারা নিয়ম মেনে চলবে, তাদের জন্য পরিবেশ আরও সহজ ও সহায়ক করা হবে।

স্থানীয় পর্যায়ে গ্রাহক ভোগান্তির আশঙ্কা প্রসঙ্গে চেয়ারম্যান বলেন, ‘যেসব প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিলের ঝুঁকি রয়েছে, তাদের বেশিরভাগের গ্রাহক সংখ্যা সীমিত। তবু বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে। প্রয়োজন হলে বিকল্প সেবাদাতার মাধ্যমে গ্রাহকদের সেবা অব্যাহত রাখার ব্যবস্থা করা হবে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি আরও বলেন, কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিলে সরকারের পূর্বানুমোদনের জন্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এখন বিষয়টি সরকারের বিবেচনায় রয়েছে। কমিশন থেকে প্রয়োজনীয় সব তথ্য ও সুপারিশ পাঠানো হয়েছে। সরকার যে সিদ্ধান্ত নেবে, সেটিই চূড়ান্তভাবে কার্যকর হবে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা