× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

সেলফোনের নেশা : গিলে খাচ্ছে তারুণ্যকে

কাউসার আহমেদ

প্রকাশ : ১৬ জুলাই ২০২৫ ০৯:০৫ এএম

সেলফোনের নেশা : গিলে খাচ্ছে তারুণ্যকে

রাত প্রায় ৩টা বাজে। ঘরের সব আলো নিভে গেছে, কেবল জ্বলছে মোবাইলের নীল আলো। ইনস্টাগ্রাম রিলস, টিকটক বা ইউটিউব শর্টসে নিমগ্ন তরুণদের চোখ। এ যেন আজকালের তরুণদের প্রতিদিনের অভ্যাস। তাদের এ অভ্যাসের কারণে চোখ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে ঘুম, শরীরে বাসা বাঁধছে নানা রোগ। 

জরিপে উঠে এসেছে, বাংলাদেশের বড় একটি তরুণ জনগোষ্ঠী এখন নিয়মিত অনিদ্রায় ভুগছে। এর পেছনের কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে মোবাইল ও ইন্টারনেটের অতিরিক্ত ব্যবহার। বিশেষজ্ঞরা একে ‘ডিজিটাল ইনসমনিয়া’ নামে অভিহিত করেছেন। সাধারণ অর্থে ইনসমনিয়া হলো অনিদ্রা। এতে একজন ব্যক্তি স্বাভাবিকভাবে ঘুমাতে ব্যর্থ হয়। এর ফলে ক্লান্তি, মনোযোগে ঘাটতি, মেজাজ খারাপ হওয়া এবং দৈনন্দিন কাজের প্রতি আগ্রহ কমে যায়। সে হিসেবে বলা যায়, সেলফোনের নেশা গিলে খাচ্ছে আমাদের সম্ভাবনাময় তারুণ্যকে।

ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতা

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্সে অধ্যয়নরত নাজনীন আক্তার। তিনি বলেন, অন্য তরুণ-তরুণীদের মতো আমিও ফেসবুকে রিলসে আসক্ত। সারা দিনের কাজ শেষে একরাশ ক্লান্তি নিয়ে যখন রাতে ঘুমাতে যাই, তখন প্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন চেক করার জন্য মোবাইল ফোন হাতে নিলে কখন যে রাত ২-৩টা বেজে যায়Ñ টেরই পাই না। ফলে সকালে উঠে মাথাব্যথা, চোখ জ্বালাপোড়া করা, চোখের নিচে ডার্কসার্কেল হওয়া, মেজাজ খিটখিটে ও পড়াশোনায় অমনোযোগসহ আরও নানা সমস্যায় পড়তে হয়। 

নারায়ণঞ্জের বাসিন্দা দুই বছরের কন্যাসন্তানের মা হাবিবা আক্তার। তিনি বলেন, আমার মেয়ের বয়স মাত্র দুই বছর। প্রথমদিকে মোবাইল দিয়ে ঘরের কাজগুলো করতাম। এখন সে এমনভাবে মোবাইলে আসক্ত হয়ে গেছে যে, তার কাছ থেকে মোবাইল নিয়ে গেলে কান্না করে। খাবার খেতে চায় না। মোবাইলে কার্টুন দিয়ে ভাত খাওয়াতে হয়।

চাকরিজীবী মঞ্জুরুল ইসলাম বলেন, কাজের ফাঁকে দৈনিক ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা সময় যায় ফোনে। এর বেশিরভাগ ইউটিউব, টিকটকে কাটাই। অনেক সময় অতিরিক্ত দেখার ফলে মাথাব্যথা, চোখে ঝাপসাÑ এসব অনুভব করি। সোশ্যাল মিডিয়ায় এমনভাবে আসক্ত হয়েছিÑ এখন চাইলেও ছাড়তে পারছি না। 

ফাহমিদা আক্তার ঐশি ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজে অনার্স চতুর্থ বর্ষে পড়াশোনা করছেন। তিনি বলেন, জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহ থেকে আমার ফাইনাল পরীক্ষা শুরু। এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে পারছি না। একবার ফেসবুকে ঢুকলে রিলস দেখতে দেখতে কখন যে সময় কেটে যায়Ñ বুঝতেই পারি না। পরে আফসোস হয়, কিন্তু তখন আর কিছু করার থাকে না। 

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান (ভারপ্রাপ্ত) মাহমুদুল হাসান বলেন, সকাল ৯টার ক্লাসে শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি দেরিতে আসে। তারা রাতে জেগে সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করে কিংবা সিরিজ দেখে। এতে ব্রেন অতিসক্রিয় থাকে, ফলে ঘুমের সমস্যা হয়। এখন মোবাইলে বইয়ের পিডিএফ দিই, কিন্তু সেই ফাইল ওপেন করার অজুহাতে অনেকেই অন্য অ্যাপে ঢুকে পড়ে। ক্লাসে অধিকাংশ শিক্ষার্থী ঘুম ঘুম চোখে আসে, অনেকে তো ক্লাসেই ঘুমিয়ে পড়ে। উপস্থিতি নেওয়ার সময় পাশের জন তাকে ডেকে তোলে। প্রতিটি ক্লাসেই এমন দুয়েক জন থাকে।

গবেষণায় যা উঠে এসেছে

সাইদা আহমেদ নামের এক গবেষক ২০২৩ সালে বাংলাদেশ মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিলে প্রকাশিত ‘সেল ফোন ইউজ অ্যান্ড সেলফ রিপোর্টেড ওয়েবলিং অ্যামাং টিনএজ স্টুডেন্ট অব বাংলাদেশ’ গবেষণাপত্রে ঢাকার ৩৮২ জন শিক্ষার্থীর মাঝে গবেষণা করেনÑ যাদের বয়স ১৩ থেকে ১৬ বছর। এই গবেষণাপত্রে তিনি দেখান, শিক্ষার্থীরা দৈনিক ৬ ঘণ্টার ওপরে মোবাইল ব্যবহার করে। 

জোবায়ের আহমেদ রতন ২০২২-২৩ সালে ইউনিভার্সিটি অব অলনগং-এ প্রকাশিত স্মার্টফোন আসক্তি নামের এক গবেষণায় উঠে এসেছে, ১৮-২৫ বছর বয়সি ৪৪০ জন তরুণ-তরুণীর মধ্যে ৪৪.৫ শতাংশ অংশগ্রহণকারী দিনে ৬-৯ ঘণ্টা মোবাইল ব্যবহার করে। এর মধ্যে ৬১.৪ শতাংশ স্মার্টফোন আসক্ত। মোবাইল আসক্তদের মধ্যে ঘুমের সমস্যা, ওজন বৃদ্ধি, অবসাদ এবং কম শারীরিক কার্যকলাপ পাওয়া গেছে।

‘অ্যাসেসমেন্ট অব স্লিপ কোয়ালিটি অ্যান্ড ইটস অ্যাসোসিয়েশন উইথ প্রবলেমেটিক ইন্টারনেট ইউজ অ্যামাং ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্ট’ শিরোনামে ইসলাম ও তার সহকর্মীরা মিলে দেশের চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪০০ শিক্ষার্থীর ওপর জরিপ করে দেখান। যারা অতিরিক্ত মোবাইল চালায়, তাদের ৭২ শতাংশ শিক্ষার্থী ঘুমের সমস্যা অনুভব করে।  

বিশেষজ্ঞ ও ডাক্তাররা কী বলছেন

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এনএম রবিউল আউয়াল চৌধুরী বলেন, মানুষের জীবনে ২৪ ঘণ্টাকে কীভাবে কাজে লাগাতে হবেÑ সে সম্পর্কে একটি নির্দিষ্ট শৃঙ্খলা থাকা প্রয়োজন। সৃষ্টিকর্তা দিন দিয়েছেন কাজের জন্য আর রাত বিশ্রামের জন্য। কিন্তু কেউ যদি রাত জেগে ও দিনে ঘুমিয়ে কাটায়, তাহলে তার মানসিক স্বাভাবিকতায় প্রভাব পড়বেই। উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, আমাদের শরীর একটি মেশিনের মতো। যেমন গাড়ির ইঞ্জিনের জন্য প্রয়োজন জ্বালানি, পানি ও সময়মতো রক্ষণাবেক্ষণ; তেমনি শরীরকে সুস্থ রাখতে প্রয়োজন সঠিক সময়ে ঘুম, বিশ্রাম ও পরিমিত কাজ। রাতে ঘুম না হলে শরীর ও মন উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে প্রোডাক্টিভিটি কমে যায়, চিন্তাশক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং শৃঙ্খলাজনিত সমস্যা দেখা দেয়। 

অতিরিক্ত মোবাইল চালানোর ক্ষতিকর দিক থেকে বাঁচার উপায় জানতে চাইলে মেডিসিন বিশেষষ্ণ ডা. ফেরদৌস খন্দকার বলেন, ঘরের আলো আর কম্পিউটারের আলো সমন্বয় করে রাখা, যাতে কোনো সমস্যা না হয়। বেশি আলো বা অন্ধকার হলে এই প্রেসারটা চোখকে নিতে হয়। প্রতি তিন চার সেকেন্ডে পরপর চেষ্টা করবেন চোখের পাতা ফেলতে, তাহলে চোকের ভেতর জেলিগুলো ভালো কাজ করবে। একটানা যেন কম্পিউটারের সামনে বসে না থাকে। ৩০ মিনিট পরপর কিছু সময়ের জন্য ব্রেক নেন। কম্পিউটার ও চেয়ারের দূরুত্ব যেন সমান হয়। বসার জায়গাও যেন মানানসই থাকে। পারলে খোলা জায়গায় হাঁটুন ও চোখে ঠান্ডা পানি দেন। 

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের স্নায়ু মনোরোগ ও ঘুম বিশেষজ্ঞ ডা. সৈয়দ রিয়াজুল রহমান বলেন, ঘুমের অভাবে একজন মানুষের পারিবারিক ও পেশাগত জীবনে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। রোগীরা তিন ধরনের ঘুমের সমস্যায় ভোগেন, দেরিতে ঘুমাতে যান, বিছানায় গিয়ে ছটফট করেন, মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যায় বা ঘুম বারবার বিঘ্নিত হয়। এই ধরনের উপসর্গ তিন মাসের বেশি স্থায়ী হলে তাকে ‘ইনসমনিয়া’ বলা হয়। কোনো শারীরিক বা মানসিক কারণ ছাড়াই ঘুম না হলে সেটি প্রাইমারি ইনসমনিয়া। আর সেকেন্ডারি ইনসমনিয়া সাধারণত হতাশা, দুশ্চিন্তা, মাদকাসক্তি, হৃদরোগ, অ্যাজমা কিংবা ক্যানসারের মতো শারীরিক বা মানসিক সমস্যার কারণে হয়। 

তরুণ প্রজন্মের ঘুম-সমস্যা ও ডিজিটাল আসক্তি কমাতে বিশেষজ্ঞরা কিছু কার্যকর সমাধান দিয়েছেন। প্রথমত, ডিজিটাল ডিটক্স বা প্রযুক্তি থেকে দৈনিক নির্দিষ্ট সময় দূরে থাকা গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে রাত ১০টার পর। স্ক্রিনটাইম নিয়ন্ত্রণ, ঘুমের নির্দিষ্ট রুটিন এবং তার আগে বই পড়া ঘুমে সহায়তা করে। বিছানা শুধুই ঘুমের জন্য ব্যবহার, নিয়মিত হাঁটা বা শরীরচর্চা ও ব্লু লাইট ফিল্টার ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন তারা। মেডিটেশন, সামাজিক যোগাযোগ এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াও প্রয়োজন হতে পারে। নিয়ম মেনে চললে এই সমস্যা থেকে মুক্তি সম্ভব।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা