নেয়ামত উল্লাহ
প্রকাশ : ০৪ জুন ২০২৩ ১০:৫৬ এএম
আপডেট : ০৪ জুন ২০২৩ ১২:১৫ পিএম
২ জুলাই ২০২২। বসুন্ধরা কিংস মুখোমুখি মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের। বসুন্ধরার বিপক্ষে বক্সের বাইরে থেকে আগুনে এক শট ১৬ বছর বয়সি এক মিডফিল্ডারের, যিনি কি না বসুন্ধরা থেকেই ধারে খেলছিলেন মোহামেডানের হয়ে। প্যারেন্ট ক্লাবের বিপক্ষে শেখ মোরসালিনের এ গোল তাকে এনে দিয়েছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রে।
আরও পড়ুন : প্যারিসে অম্লমধুর সময় উপভোগ করেছেন মেসি
তার ঠিক ১১ মাস পর আবারও বসুন্ধরা মুখোমুখি মোহামেডানের। এবারও আলোচনায় সেই শেখ মোরসালিন। তবে এবার তার ক্লাব গেছে বদলে। কোচ অস্কার ব্রুজন হয়তো সেদিনই বুঝে গিয়েছিলেন, একে আর ধারে রাখা উচিত হবে না। তাকে ফেরানো হলো এক মৌসুমের চুক্তি শেষেই। তিনি ফিরলেন। মোহামেডানের বিপক্ষে পিছিয়ে পড়েও বসুন্ধরা যে ম্যাচটা জিতল কিংস অ্যারেনায়, সেটা তো তার বদৌলতেই! তার বুদ্ধিদীপ্ত দুটো অ্যাসিস্টই যে গড়ে দিয়েছিল ম্যাচের ভাগ্য!
মোহামেডানে যত সুযোগ পাচ্ছিলেন, বসুন্ধরা কিংসে এসে সে সুযোগটা খানিকটা কমে গিয়েছিল। পুরো মৌসুমে সব মিলিয়ে খেলেছিলেন ৩২০ মিনিটের মতো সময়। তবে আলো কাড়ছিলেন ঠিকই। সে রোশনাই যেন পূর্ণতা পেল শেষ দুই ম্যাচে এসে। বসুন্ধরা কিংসের লিগ নিশ্চিত করার ম্যাচে শেখ রাসেল ক্রীড়া চক্রের ম্যাচে করলেন এক গোল, করালেন আরও একটি। এরপর সাবেক ক্লাব মোহামেডানের বিপক্ষে দুই গোল করিয়ে জেতালেন বসুন্ধরাকে।
শুধু অ্যাসিস্টেই চোখ জুড়ানোর কাজটা সারেননি তিনি। দরিয়েলতনের অনুপস্থিতিতে রবসন রবিনহো মোহামেডানের বিপক্ষে খেলছিলেন খানিকটা ওপরে। আক্রমণের দায়িত্বটা পড়েছিল সদ্য কৈশোর পেরোনো মোরসালিনের কাঁধে। ত্রেকোয়ার্তিস্তার ভূমিকাটা তিনি পালন করেছেন দারুণভাবেই, মাঝমাঠ পেরোলেই তার সরব উপস্থিতি নজর কাড়ছিল বারবার।
বক্সে হোক কিংবা বক্সের বাইরে, ভয়ডরহীনতাই ছিল বসুন্ধরা কিংস ফরোয়ার্ডের তূণে থাকা সবচেয়ে বড় অস্ত্র। অভাব ছিল খানিকটা আগ্রাসী মনোভাবের। সেটাও কোচ অস্কারের অধীনে এসে কাটিয়ে উঠছেন ধীরে ধীরে। মোরসালিনের কথা, ‘কোচ বলেছিলেন ডিসিশন মেইকিংটা আমার প্লাস পয়েন্ট। কিছু উইক পয়েন্ট ছিল, সে কারণে অপেক্ষা করতে হয়েছে। তবে আমি হার্ডওয়ার্ক করেছি, পরিকল্পনা মাফিক কাজ করেছি। আমার আগ্রাসী মনোভাবটা কম ছিল, ওটা নিয়ে কাজ করছি।’
তাকে নিয়ে কোচ অস্কার ব্রুজনের মূল্যায়ন, ‘মোরসালিন দলের সবচেয়ে পরিশ্রমী খেলোয়াড়দের একজন। সে পুরো মৌসুম ধরে আমাদের দৈনন্দিন অনুশীলনে দারুণ পরিশ্রম করে যাচ্ছে। আমাদের দলীয় ট্রেনার তার জন্য বিশেষ পরিকল্পনা তৈরি করে দিয়েছে, সে তা মেনেই অনুশীলন করছে।’
স্প্যানিশ এ কোচের চোখে মোরসালিন বসুন্ধরার তারকাখচিত দলে জায়গা করে নিয়েছেন তার চোয়ালবদ্ধ সংকল্পের কারণেই, সঙ্গে বসুন্ধরার রূপরেখা তো ছিলই। তার কথা, ‘সে মৌসুমের এ পর্যায়ে দলে এসেছে তার দলে জায়গা করে নেওয়ার জন্য দৃঢ় সংকল্প, আত্মবিশ্বাস ও পরিপক্বতার কারণে। তার এই দলে আসা, পারফর্ম করাটা একটা পরিষ্কার উদাহরণ যে, কঠোর পরিশ্রম কখনও বিফলে যায় না। তরুণ খেলোয়াড়দের সামলানোর জন্য যথার্থ ও কার্যকরী একটা পরিকল্পনা প্রয়োজন। তার পরিপক্বতা সে পরিকল্পনারই ফল।’
সে রূপরেখাটা কী? অস্কার জানালেন, ‘আমাদের কাজটা হচ্ছে তাকে সহযোগিতা করা (প্রত্যেকটা খেলোয়াড়কেই অবশ্য), তার জন্য ঠিক পরিকল্পনাটা করা, সেটার প্রত্যেকটা প্রক্রিয়া কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা, যাতে সে উন্নতি করতে পারে, তার পুরো প্রতিভাটা বিকশিত করতে পারে। কঠোর পরিশ্রম আর অধ্যবসায়ের মাধ্যমে দারুণ কিছু অর্জন করার সম্ভাবনাটা তার মধ্যে আছে। সবকিছুর মিশেলেই মোরসালিনের এমন উঠে আসা। মোরসালিন একজন দারুণ প্রতিশ্রুতিশীল খেলোয়াড় যে ধীরে ধীরে প্রত্যাশিত মান, প্রয়োজনের সময় পার্থক্য গড়ে দেওয়ার মতো মানে উঠে আসছে।’
পার্থক্য গড়ে দেওয়ার জন্য ফরোয়ার্ডের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাটা ভালো হওয়া চাই। সেখানেও মোরসালিন দিচ্ছেন দারুণ পরিপক্বতার প্রমাণ। তার কথা, ‘তখন (প্রথম গোলের সময়) দলের গোল দরকার ছিল। তখন আমাদের গোলের দরকার ছিল খুব বেশি, কে গোল করল, আমি করলাম না কে করল, তা বিষয় ছিল না। আমি শুট করলে হয়তো ৫০/৫০ সুযোগ থাকত। তখন মিগেল ভালো জায়গায় ছিলেন, প্রায় ওয়ান অন ওয়ান সিচুয়েশন তৈরি হয়ে যাচ্ছিল। সিচুয়েশন এমন, বল পেলে অনেক কিছুই করা যায়। তবে তখন সেকেন্ডের ভগ্নাংশের মাঝে সিদ্ধান্তটা নিতে হয়।’
এমন পারফরম্যান্সের ফলেই তার জায়গা হয়েছে জাতীয় দলে, যে স্বপ্ন তিনি দেখেছেন সেই শৈশব থেকে। তবে এখানেই গা ভাসিয়ে দিচ্ছেন না তিনি। দেখছেন দূরযাত্রার স্বপ্ন। তার কথা, ‘ছোটবেলা থেকেই আমি আত্মবিশ্বাসী ছিলাম যে আমি একদিন জাতীয় দলে খেলব। যেহেতু সুযোগটা এসে গেছে, আমি সেটা কাজে লাগানোর চেষ্টা করব। এটা আমার স্বপ্ন ছিল, তো সুযোগ যদি হয় দলে, আমি আমার সেরাটা দিয়েই চেষ্টা করব ভালো কিছু করার। ৩০ জনের স্কোয়াডে আছি, চেষ্টা করব মূল দলেও সুযোগ আদায় করে নিতে। আপাতত আমার মূল লক্ষ্য এটাই। সেটা হয়ে গেলে সামনের দিকে ভাবব।’