প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ০৬ মে ২০২৩ ১৬:১৮ পিএম
আপডেট : ০৬ মে ২০২৩ ১৬:২০ পিএম
১০ আগস্ট, ২০২১! স্মরণীয় এক দিন। অবশ্যই প্যারিস সেন্ট জার্মেইর (পিএসজি) জন্য। উড়ন্ত বিমান, আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসি, ড্রেসিংরুম, আইফেল টাওয়ার, ছয়টি ব্যালন ডি’অর ইত্যাদি ছবি দিয়ে পুরো ফুটবল দুনিয়ার জন্য একটি ভিডিও বার্তা দিয়েছিল তারা। বুঝতে বাকি থাকেনি। কারণটা তো সবার জানা। এক সময়কার বার্সেলোনার প্রাণভোমরা যোগ দিচ্ছেন প্যারিসের ক্লাবটিতে। খুশির সেই দিনে আনন্দ-উল্লাসে মেতে উঠেছিল পিএসজির সমর্থকরা। খুশির খবর পেয়ে প্রিয় দলের ভক্ত-সমর্থকদের যেন খাওয়া-দাওয়াই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ফুটবল জাদুকর লিওনেল মেসি ফরাসি জায়ান্ট ক্লাবটিতে যোগ দেওয়ার আগের ঘটনা এটি।
আরও পড়ুন - সৌদি আরবে গিয়ে অনুতপ্ত মেসি, চাইলেন ক্ষমা
নিজেদের পার্ক দেস প্রিন্সেসে মেসির পরিচয় পর্বের স্মৃতি অমলিন। কী ঢাকঢোল পিটিয়েই না বরণ করে নেওয়া হয়েছিল মেসিকে। পুরো স্টেডিয়াম ছিল কানায় কানায় পূর্ণ। তিলধারণের ঠাঁইও ছিল না। জাঁকালো উৎসবের আমেজে মেসি পেয়েছিলেন বীরের সম্মান। মেসিকে দলে টানতে অনেক ক্লাবই লাইন ধরে ছিল। কিন্তু সে লড়াইয়ে জিতে যায় নেইমার জুনিয়রের পিএসজি। মেসিকে পাওয়া যেন পিএসজির কাছে ছিল আকাশের চাঁদ হাতে পাওয়ার মতো। ফুটবল মহাতারকা মেসির চাহিদা আর জনপ্রিয়তা দুটোই এখনও তুঙ্গে। যেখানে হারিয়ে দিতে পারেন যেকাউকেই। এ কারণে তখন যে ফরাসি ফুটবলপ্রেমীরা উত্তেজনা আর রোমাঞ্চের ভেলায় ভেসে বেড়িয়েছিল। সে সময়ের বিবেচনায় এমনটা ঘটাই ছিল স্বাভাবিক।
মেসিকে পেয়ে তো রীতিমতো উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ে পিএসজির অনুসারীরা। ক্লাবের ফ্ল্যাগশিপ শপগুলোতে হুমড়ি খেয়ে পড়েছিল সমর্থকরা প্রিয় ফুটবলারের ৩০ নম্বর জার্সি গায়ে জড়াতে। শুধু কি ভক্তরা। ক্লাব কর্তৃপক্ষও ছিল যারপরনাই উদ্বেলিত। জার্সি বিক্রি করেই দেদার আয় করছিল তারা। সঙ্গে বিজ্ঞাপনদাতারাও লাইন ধরে পিএসজির অফিসে। স্পন্সরশিপ চুক্তি থেকে ক্লাবের অ্যাকাউন্ট ফুলে-ফেঁপে উঠছিল। এমন হলে উদ্বেলিত না হয়ে উপায় আছে! এ তো গেল মুদ্রার এপিঠের গল্প।
বিশ্বকাপজয়ী মেসি যে মুদ্রার উল্টো পিঠও দেখে ফেললেন। এবং সেটা খুব বাজেভাবে। পিএসজির সেই সমর্থকরাই এখন আবার মেসির বর্তমান ক্লাব পিএসজির প্রধান কার্যালয়ের সামনে। এবার আর তাদের হাতে ভালোবাসার পেয়ালা নেই। আছে ক্ষোভ আর প্রচণ্ড ঘৃণার ঝাঁপি। উপস্থিত সবাই দিচ্ছেন মেসির বিরুদ্ধে স্লোগান। অবশ্য এমন বাজে অভিজ্ঞতা আগেও হজম করেছেন। তবে সেটা খেলার মাঠে। গ্যালারি থেকে দুয়োধ্বনিতে অনেকে বিরক্ত করে ছেড়েছে মেসিকে। এবারের তেতো অভিজ্ঞতাটা আরও বাজে। এখন তো অনেকে গালাগাল দিতেও দ্বিধা করেনি। পিএসজির ভক্ত-সমর্থকদের স্লোগানের ভিডিও ভাইরাল হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। তবে এ ঘটনায় পিএসজি কর্তৃপক্ষ অবশ্য মেসির পাশেই রয়েছে। সমর্থকদের এমন ঘৃণ্য কাণ্ডের সমালোচনাও করেছে তারা। যদিও সেটা বাহ্যিক, লোক দেখানো। ভেতরে ভেতরে হয়তো তারা খুশিই হয়েছে। এ কারণে মেসির বাড়ির সামনে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
এমনটা ঘটেছে মেসির কারণে। কোচ ক্রিস্তোফ গালতিয়েরকে না জানিয়েই সৌদি সফরে গেছেন মেসি। তার আগে সবুজ সৌদি আরবের প্রশংসা করে ইনস্টাগ্রামে দেন পোস্ট। মধ্যপ্রাচ্যের দেশটির পর্যটনশিল্পের শুভেচ্ছাদূত হয়ে তার সৌদি সফরে যাওয়ার আগে লরিয়েন্তের কাছে ১-৩ গোলে হেরে বসেছিল পিএসজি। সেই ক্ষোভটা উগড়ে দিয়েছে ক্লাব কর্তৃপক্ষ। ক্লাবে দুই সপ্তাহের জন্য নিষিদ্ধ হয়েছেন মেসি। কিন্তু মেসির ভাবখানা এখন এমন যেন এতে কিছুই যায়-আসে না তার। স্ত্রী আন্তোনেলা রোকুজ্জো ও তিন ছেলেকে নিয়ে বরং সৌদিতে ফুরফুরে মেজাজে কাটছে তার সময়। নিষেধাজ্ঞায় বরং যেন তার সুবিধা হয়েছে। শাপেবরের মতো মিলেছে তার ছুটি। তাই কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এবার রাগ দেখাল সমর্থকরাও।
ফরাসি গণমাধ্যম লেকুইপের খবর, মেসির সঙ্গে চুক্তি নবায়ন করছে না পিএসজি। আগামী জুনে তার চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে। অন্যদিকে ইতালির বিখ্যাত ক্রীড়া সাংবাদিক ফ্যাব্রিজিও রোমানো নিজের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে জানিয়েছেন, আগামী মৌসুমে মেসি পিএসজি ছাড়ছেন। খবরটা নিশ্চিত করেছেন তিনি। মেসির বাবা জর্জ ব্যাপারটা পিএসজিকে জানাতেই ক্লাব কর্তৃপক্ষ ও সমর্থকদের এমন বিরূপ আচরণের শুরু। এখন নতুন চ্যালেঞ্জ নিয়ে অন্য কোনো ক্লাবে পাড়ি জমাবেন মেসি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যাবেন কোথায় এ সুপারস্টার?
স্প্যানিশ রেডিও চ্যানেল অন্দা চেরো বলছে, পিএসজি ছেড়ে ‘এলএম টেন’ যোগ দেবেন বার্সেলোনায়। কাতালানদের হয়ে এক মৌসুম খেলবেন। তারপর এ ফুটবল মেগাস্টার চলে যাবেন সৌদি আরবে। রেকর্ড ট্রান্সফারে তাকে দলে ভেড়াতে বসে আছে সৌদি ক্লাব আল হিলাল। বিশ্বকাপ আয়োজক হওয়ার লড়াইয়ে নামা সৌদি আরবেরও প্রচারণার জন্য দরকার মেসিকে। তাদের সঙ্গে মেসিকে দলে ভেড়ানোর লড়াইয়ে আছে যুক্তরাষ্ট্রের ক্লাব ইন্টার মিয়ামিও। মেসিকে রাজি করাতে এমএলএস ক্লাবটির হয়ে কিছুদিন আগে পিএসজি থেকে ঘুরেও এসেছেন ইংল্যান্ডের সাবেক মিডফিল্ডার ডেভিড বেকহ্যাম।
এখন সৌদি সফরে আছেন রেকর্ড সাতবার ব্যালন ডি’অরজয়ী মেসি। সেদিক থেকে দেখতে গেলে আল হিলালই মেসিকে কেনার লড়াইয়ে এগিয়ে। লোভনীয় সব প্রস্তাবের ডালি নিয়ে মেসির সামনে এখন তারা। ইংলিশ সংবাদ দি টেলিগ্রাফ জানিয়েছে, মেসিকে বার্ষিক ৪০০ মিলিয়ন ডলারের প্রস্তাব দিয়েছে সৌদি, যা রোনালদোর ডাবল। এতে রাজি হলে মেসি হবেন বিশ্বের সবচেয়ে দামি ফুটবলার। আর্জেন্টাইন সংবাদমাধ্যম টিওয়াইসি স্পোর্টস বলছে, মেসিকে বছরে ৪০ কোটি ইউরোর প্রস্তাব দিয়েছে আল হিলাল। বাংলাদেশি মুদ্রায় যা ৪ হাজার ৬১৯ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। ফিফার এজেন্ট কির্দেমির দাবি করেছেন, মেসি মূলত পরিবার নিয়ে সৌদি আরব গেছেন তাদের থাকার জায়গা দেখতে। মেসি তাহলে সৌদিতেই ঘাঁটি গাড়ছেন? তবে তার নতুন ঠিকানা জানতে এখন অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে ফুটবল অনুরাগীদের। উত্তরটা সময়ই বলে দেবে!