নেয়ামত উল্লাহ, চট্টগ্রাম থেকে
প্রকাশ : ০৭ মার্চ ২০২৩ ০৯:২৪ এএম
‘টিকিটের কাটতি কেমন?’ প্রশ্নটা করা হলো বিটাক মোড়ে টিকিট বুথে থাকা বিক্রেতাদের। উত্তর মিলল- ‘ভালোই চলছে’। তবে আদতে যে বিষয়টা মোটেও তেমন ছিল না, সে চিত্র বাইরেই মিলল। ফাঁকা টিকিট বুথ দেখে মনে হলো ফাগুন শেষের আগেই চৈত্রের খরা লেগেছে যেন!
অথচ সবশেষ সিরিজেও এই মাঠে টিকিট বিক্রির চিত্রটা ভিন্নই ছিল। টিকিট বুথের সামনে সবেধন নীলমণি যে ক্রেতার দেখা মিলল, তিনিই জানালেন চট্টগ্রামের পরিস্থিতিটা। বললেন, ভারত সিরিজে শেষ ম্যাচে যখন টিকিট কাটতে গিয়েছি এমএ আজিজ স্টেডিয়ামে, তখন স্টেডিয়াম থেকে শুরু করে টিকিটের জন্য লাইনটা সিআরবির কাছাকাছি চলে গিয়েছিল। আর এবার তো দেখতেই পাচ্ছেন আমি ছাড়া আর কেউ নেই!
খেলা শুরুর পরও দেখা মিলল একই দৃশ্যের। দুপুর ১২টায় শুরু খেলা। কিন্তু দর্শকের দেখা মিলছিল না কিছুতেই। দুপুর গড়িয়ে বিকাল হয়ে এলে দর্শক কিছু এলেন বটে, কিন্তু গ্যালারির সিংহভাগ জায়গাই ছিল ফাঁকা। অথচ ঢাকায় সিরিজের প্রথম দুই ম্যাচে দর্শকদের উপস্থিতি ছিল বেশ, সবশেষ ম্যাচে তো ‘ফুল হাউস’ দর্শকই দেখেছে শেরেবাংলা জাতীয় স্টেডিয়াম।
ঢাকা আর চট্টগ্রামের এমন বিপরীত চিত্রের পেছনে বেশ কিছু কারণ দেখছেন চট্টগ্রাম বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক সিরাজউদ্দীন মোহাম্মদ আলমগীর। চট্টগ্রামে দর্শক-খরার বিষয়ে তার পর্যবেক্ষণ, দর্শক না আসার বেশ কিছু কারণ আছে। সিরিজের ফল আগেই নির্ধারিত হয়ে গেছে, ওয়ার্কিং ডে চলছে, প্রচারের অভাব ছিল বেশ…।
সাগরিকার দর্শকদের সুযোগ-সুবিধারও দায় আছে এর পেছনে। সেই ২০১১ বিশ্বকাপে যে স্টেডিয়ামে সংস্কারকাজ হয়েছে, এরপর থেকে আর তেমন কোনো সংস্কার করা হয়নি। সেবার সংস্কারের পরও অবশ্য গ্যালারিতে ছাউনির ব্যবস্থা করা হয়নি। ফলে দর্শকদের খেলা দেখতে হয় তীব্র রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে।
আলমগীরের ভাষ্য, ২০১১ বিশ্বকাপের সময় যে কাজ করা হয়েছিল, দুর্ভাগ্যজনকভাবে এরপর থেকে আর কোনো কাজ হয়নি। এখানে গ্যালারিগুলোতে ছাউনি দেওয়া, দ্বিতল করা, ধারণক্ষমতা বাড়ানো এসব হয়নি; বিশেষ করে এই রোদে যদি ছাউনি না-ও দেওয়া যায় তাহলেও একটা প্যান্ডেল দিয়ে দর্শকদের বসার ব্যবস্থা করা উচিত, না হয় এই রোদে খেলা দেখা তো বেশ কষ্টকর। একসময় আমরা এমন করতামও, ডেকোরেশন দিয়ে পুরো স্টেডিয়াম কাভার করে দিতাম, যেন মানুষ রোদে কষ্ট না পায়। একসময় এমন করা হতো, জানি না এখন কেন এমন করা হয় না।
জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামের অবস্থানেরও দায় দেখছেন তিনি। বললেন, স্টেডিয়ামের অবস্থানও এমন একটা জায়গায় খেলা শেষ হলে যেখান থেকে গণপরিবহন পাওয়া যায় না। অনেক দূর হেঁটে পাহাড়তলীর রাস্তার মাথায় গিয়ে তারপর আপনাকে গাড়ি পেতে হয়। অনেক দর্শক যখন একটা গাড়ির জন্য দাঁড়িয়ে থাকে, তখন ১০০ টাকার ভাড়া ৩০০ টাকা হয়ে যায়।
আশপাশে খাবার হোটেলও নেই। সবচেয়ে কাছের হোটেলটাও প্রায় এক কিলোমিটার দূরে। স্টেডিয়ামের ভেতরও দর্শকদের খাবারের ব্যবস্থা খুব একটা ভালো নয়। যা মেলে তার দামও আকাশছোঁয়া। গতকাল তৃতীয় ওয়ানডেতে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, স্টেডিয়ামের সব ধরনের খাবারের দাম বাইরের চেয়ে প্রায় ৫০ থেকে ১০০ টাকা বেশি।
এরও কিছুটা দায় দেখছেন চট্টগ্রামের এই ক্রীড়া সংগঠক। তার কথা, স্টেডিয়ামের আশপাশে ভালো রেস্টুরেন্ট নেই, ভালো হোটেল নেই, পুরো দিন খেলা দেখলে মানুষ যে লাঞ্চ করবে, সে ব্যবস্থা নেই। স্টেডিয়ামে যে খাবার পাওয়া যায়, রেটটা নিয়ন্ত্রিত নয়, একসময় আমরা এটাও নিয়ন্ত্রণ করতাম। একটা খেলা দেখতে এসে যদি খরচটা বাজেট ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তাহলে মানুষ ভাববেই সে খেলা দেখতে যাবে কি না।
তবে এত কিছুর পরও দর্শকদের খেলা দেখতে যাওয়ার উৎসাহে ভাটা পড়ত না, যদি না মাঠের পারফরম্যান্সের টানটা ভালো থাকত। দল সিরিজ খুইয়ে বসেছে, দ্বিতীয় ওয়ানডেতে হেরেছে বিশাল ব্যবধানে। পারফরম্যান্সের প্রতিক্রিয়ায় যদি এই দর্শক-খরা হয়, তাহলে একে ক্রিকেটের জন্য অশনিসংকেত হিসেবেই দেখছেন আলমগীর। ফুটবলের সোনালি দিনের সঙ্গে সঙ্গে দর্শকও হারিয়ে গেছে। এমন পারফরম্যান্স চলতে থাকলে ক্রিকেটেরও তেমন দিনই দেখছেন তিনি।
তার কথা, পারফরম্যান্স তো মূল নিয়ামক। একসময় ফুটবলে ইন্ডিভিজুয়াল খেলোয়াড় যারা ছিলেন, মুন্না (মোনেম মুন্না), সাব্বিরের (রুম্মান বিন ওয়ালি সাব্বির) খেলা দেখতে মাঠে যেত মানুষ, এখন আর কার খেলা দেখতে যাবে? এখন ক্রিকেটেও যদি ধারাবাহিকভাবে খারাপ খেলতে থাকে, ভালো না খেলে, তাহলে মানুষ কেন মাঠে যাবে? ইংল্যান্ড দলের ডেভিড মালানদের খেলা দেখতে নিশ্চয়ই নয়? আমরা অমন ক্রিকেটিং নেশন হয়ে যাইনি যে প্রতিপক্ষ দলের বড় খেলোয়াড়ের খেলা দেখতে মাঠে যাব। আমাদের দর্শকরা নিজেদের খেলোয়াড়ের খেলা দেখতে যায়; সাকিবের খেলা, তামিমের খেলা দেখতে যায়, বাংলাদেশ জিতবে সেটা দেখতে যায়। সেটা না হলে নিশ্চিতভাবেই তারা মুখ ফিরিয়ে নিবে।
এই দর্শক খরা রুখতে ক্রীড়াসংগঠক, ক্রিকেট পরিচালকদেরই এগিয়ে আসতে হবে, অভিমত তার। বললেন, এ দর্শক খরা অ্যালার্মিং। এটাকে আমলে নিতে হবে। সংগঠকদের, বোর্ডকে ব্যবস্থা নিতে হবে যেন দর্শক মাঠে আসে। প্রচার চালানো, স্কুল কলেজের জন্য দাম কমানো; মাঠে দর্শক আনতে হবে, এটা না হলে শুধু ক্রিকেট না, যেকোনো খেলার জন্যই অ্যালার্মিং।