প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৩ জানুয়ারি ২০২৩ ১৩:১৮ পিএম
কমেন্ট্রি বক্সে আতহার আলি খান ও তামিম ইকবাল।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেট, বিশেষ করে দ্বিপাক্ষিক সিরিজ চলাকালে কমেন্ট্রি বক্সে ঘুরেফিরে দেখা যায় সেই পুরোনো দুই মুখ আতহার আলি খান ও শামীম আশরাফ চৌধুরী। সেই লম্বা সময় ধরে একজন নতুন ধারাভাষ্যকারের জন্য হাপিত্যেশ চলছে। ক্রিকেট সিরিজ চললে টিভি পর্দায় টক শোতে সাবেক ক্রিকেটারদের সরব উপস্থিতি থাকছে কিন্তু এদের মধ্যে একমাত্র আতহার আলি খান ছাড়া আর কেউ ক্রিকেট ধারাভাষ্যে সফল হতে পারলেন না।
নতুন ধারাভাষ্যকার যে একেবারেই আসেন না, বিষয়টা মোটেও তেমন নয়। ধারাভাষ্যকক্ষে নতুন মুখ কালেভদ্রে দেখা যায়। তবে তাদের কাউকে থিতু হতে দেখা যায় না এ তল্লাটে। তেমনই একজন শাহরিয়ার নাফীস। খেলোয়াড়ি জীবনেই তাকে দেখা গেছে ধারাভাষ্যে। তবে ধারাভাষ্যকার হিসেবে ক্যারিয়ারটা এখানে খুব বেশি দীর্ঘ হয়নি। কারণ হিসেবে তিনি জানালেন, ‘ক্রিকেট থেকে অবসর নেওয়ার পর বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডে যোগ দিলাম ক্রিকেট অপারেশন্স বিভাগে। এখানে কাজের চাপ আছে, তার ওপর আবার আন্তর্জাতিক সিরিজগুলো যখন হয় তখন ক্রিকেট অপারেশন্স সব সিরিজ আয়োজন করে। এখানে খেলা চলাকালে তো আমি আর কমেন্ট্রিতে যেতে পারি না! কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট হয়ে যায়। সবকিছু মিলিয়ে আর কমেন্ট্রি করা হয় না।’
ধারাভাষ্যকার হতে হলে বেশ কিছু মানদণ্ড পূরণ করে তবেই আসতে হয় এ পরিসরে, যা বেশ চ্যালেঞ্জের বিষয়ও। এই প্রসঙ্গে শাহরিয়ার নাফীস বলেন, ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেটার হতে হবে, ইংরেজিতে ভালো হতে হবে, ক্রিকেটীয় জ্ঞান ভালো হতে হবে; কমেন্ট্রি একটা আর্ট, এজন্য প্রশিক্ষণ নিতে হয়, এসব ক্রাইটেরিয়া মেনে আসতে হবে কমেন্ট্রিতে। ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেটিং ব্যাকগ্রাউন্ড না থাকলেও সম্ভব, অসম্ভব নয়, তবে খুবই কঠিন।’
আরেক ধারাভাষ্যকার মাজহার উদ্দিন অমি আছেন এবারের বিপিএলের ধারাভাষ্য প্যানেলে। তিনি অবশ্য আর্থিক চ্যালেঞ্জটাকেও দেখছেন বড় করে। বললেন, ‘আতহার ভাই-শামীম ভাই তো প্রতিষ্ঠিত, তাদের ক্যারিয়ার এখন বলতে গেলে কমেন্ট্রিই। তরুণ কাউকে এটা পেশা হিসেবে নিতে গেলে আর্থিক দিকটা গুরুত্বপূর্ণ। এই জায়গাটাতে কিন্তু একটা ডিফিকাল্টিজ আছে। পাশাপাশি কিছু করতে পারলে হয়তো সুবিধা থাকবে। শুধু কমেন্ট্রি বেজ করে আসতে চান, সেই মার্কেটটা এখনও আসেনি। ডিফিকাল্ট কারণ হলো, উঠে আসার কোনো প্ল্যাটফর্ম নেই। আমি এখন স্পোর্টস রিপোর্টার। নিজে খেলাধুলা করেছি। ক্রিকেটার ছিলাম। আমার এই ব্যাকগ্রাউন্ড ছিল বলে বোধহয় আমি পেরেছি। অন্য কাউকে ঢুকতে হলে তাকে হয়তো ক্রিকেট প্লেয়ার হতে হবে, অন্য কীভাবে ঢুকবে তা নিয়ে কোনো আইডিয়া নেই। এজন্য আমি খুবই ভাগ্যবান বলতে গেলে। স্পোর্টস রিপোর্টার হিসেবে কাজ করেছি বলে সুবিধা পেয়েছি।’
ধারাভাষ্যে আরও অনেকে এসেছেন। কিন্তু থিতু হতে দেখা যায়নি কাউকেই। শুধু ধারাভাষ্যে থাকার সুযোগ কম, আগের কথার রেশ টেনেই অমি বললেন, ‘মেহরাব জুনিয়র দেশ ছেড়ে চলে গেছে। শাহরিয়ার নাফীস ও ইশতিয়াক আহমেদ ভাইদের প্রেফারেন্স হয়তো ভিন্ন ছিল। পাশাপাশি হয়তো অন্য কিছু করার চেষ্টা করছিলেন বা বড় পরিসরে কাজ করার সুযোগ খুঁজছিলেন। শুধু কমেন্ট্রি করতে কেউ আসতে চাইলে সেটা ডিফিকাল্ট হবে। এটা একটা কারণ হতে পারে। আর্থিক নিরাপত্তাটা খুব জরুরি। সারা বছর বিপিএল বা ইন্টারন্যাশন্যাল ক্রিকেটে ধারাভাষ্য দেওয়ার তো কোনো সুযোগ নেই। এই দিক থেকে বেশি বেশি সুযোগ হলে পেশা হিসেবে নিতে পারেন।’
আরেক সাবেক ধারাভাষ্যকার ইশতিয়াক আহমেদ আবার নতুন ধারাভাষ্যকার উঠে না আসার বিষয়টাকে দেখলেন খানিকটা ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে। তার অভিমত, নতুনদের পর্যাপ্ত সুযোগটাও দেওয়া হচ্ছে না। বললেন, ‘আমিও কিছুদিন কমেন্ট্রি করেছি। অনেক দিন ধরেই ইংরেজি কমেন্ট্রি শুনে যাচ্ছি। আমার কাছে মনে হয় সুযোগের অভাব। যারা এখানে দুজন আছেন, তারা ও প্রোডাকশনে যারা আছেন উনারা হয়তো মনে করেন বাংলাদেশে বোধহয় এই দুজনই শুধু ইংরেজিতে কথা বলতে পারেন। এই দুজন ছাড়া ইংরেজিতে হয়তো আর কারও সামর্থ্য নেই। এ কারণেই নতুন অনেকেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।’
বর্তমানে যারা আছেন ধারাভাষ্যে, নতুন কারও উত্থানে তারাও বেশ স্বচ্ছন্দ নন। জানালেন ইশতিয়াক, ‘আমাদের এখানকার কমেন্টেটররা খুব একটা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে না অন্য কেউ উঠে আসার ব্যাপারে। তাদের জায়গা নেওয়ার মতো কেউ নেই। তারা যে সিনিয়র হিসেবে কাউকে এনকারেজ করবে সেই মনমানসিকতাও তাদের মধ্যে নেই।’
ধারাভাষ্যের আর্থিক চ্যালেঞ্জটাকেও ইশতিয়াক দেখছেন বেশ গুরুত্ব দিয়েই। বললেন, ‘আর্থিক বিষয়টাও বোধকরি আছে। অর্থনৈতিকভাবে খুব একটা লাভবান তা আমার অভিজ্ঞতায় মনে হয় না। অন্য যারা আছে, তারা অন্যরা কোন চুক্তিতে কমেন্ট্রি করে তা আমার জানা নেই। একজন আছেন, উনি তো বাংলাদেশের সব খেলায় কমেন্ট্রি করেন। তার জন্য আর্থিকভাবে বেনিফিসিয়াল হলেও হতে পারে। আমি খুব বেশি শিওর না। একটা করে সিরিজ করে যে পরিমাণ আর্থিক সুবিধা পাওয়া যেতে পারে, তা হয় না বলে মনে হয় না।’
ইশতিয়াক নিজে ধারাভাষ্যে ছিলেন না বেশিদিন। এর কারণ হিসেবে তার অভিমত, ‘আমি কমেন্ট্রি ছেড়ে দিয়েছে বললে ভুল হবে। আমি একটা সময় করেছি। একটা সার্জারির পর আমাকে ডাকা হলেও আমি যেতে পারিনি। পরে কিন্তু আমাকে ডাকতে পারত। হয়তবা তারা আমাকে চায় না। আমি ওইটাই ফিল করেছি।’