মনের ময়নাতদন্ত
কেপ ভার্দের সঙ্গে দলের প্রথম গোল করেন লিওনেল মেসি। ছবি:রয়টার্স
বয়স হয়েছে লিওনেল মেসির। তিনি খাটো। কমেছে গতি। তারপরও বিশ্বকাপে তার দোর্দণ্ডপ্রতাপ। কীভাবে? বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ করেছেন দুই গবেষক। তারা বলছেন, ফুটবল পা দিয়ে নয়, মাথা দিয়ে খেলেন মেসি। অস্ট্রেলিয়ান ক্যাথলিক ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক হের্ট-জ্যন পেপিং ও প্রভাষক টমাস ম্যাকগাকিয়ান-এর সেই প্রবন্ধ ২ জুলাই প্রকাশিত হয়েছে দ্য কনভারশেসনে। প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর পাঠকের জন্য এটি অনুবাদ করেছেন জাহাঙ্গীর সুর
লিওনেল মেসির বয়স এখন ৩৯ বছর। উচ্চতা ১.৭০ মিটার (৫ ফুট ৭ ইঞ্চি)। যাদের বিপক্ষে খেলেন, সেই ডিফেন্ডারদের প্রায় সবার চেয়েই তিনি খাটো। তিনি কখনোই খুব একটা দ্রুতগতির ছিলেন না, আর এখন তো হয়ে গেছেন আরও ধীর। অথচ এবারের বিশ্বকাপ দেখলে আপনি এমন কোনো খেলোয়াড়ের নাম সহজে বলতে পারবেন না, যিনি প্রতিপক্ষের জন্য মেসির চেয়ে বেশি বিপজ্জনক। তিনি এখন পর্যন্ত চলতি আসরের সর্বোচ্চ গোলদাতা (সাতটি)। যার মধ্যে, অন্তত অন্য খেলোয়াড়দের তুলনায়, তথাকথিত অ্যাথলেটিসিজম বা শারীরিক সক্ষমতার এতটা ঘাটতি রয়েছে, তিনি কীভাবে এখনও মাঠের সেরা খেলোয়াড় হন?
শারীরিক সক্ষমতাই কী সব
সম্ভবত আমরা ভুল দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি দেখছি। অনেকেই মেসিকে দেখে বিস্মিত হন। কারণ, আমাদের শেখানো হয়েছে, একজন অ্যাথলিটের শ্রেষ্ঠত্ব নির্ভর করে তার শরীরের ওপর। গতি, উচ্চতা, শক্তি ও ফিটনেসই যেন সব। সেই মাপকাঠিতে বিচার করলে মেসিকে ব্যতিক্রমী উদাহরণ মনে হয়। কিন্তু সমস্যাটা যদি আমাদের সেই ধারণাতেই থাকে? যদি ফুটবল কখনোই কেবল শারীরিক সক্ষমতার লড়াই না হয়ে থাকে?
মহান ডাচ খেলোয়াড়, ম্যানেজার, ধারাভাষ্যকার ও ফুটবল দার্শনিক ইয়োহান ক্রুইফ অর্ধশতাব্দী আগেই বিষয়টি স্পষ্টভাবে বুঝতে পেরেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘গতি আসলে কী? ক্রীড়া সাংবাদিকরা প্রায়ই দূরদর্শিতার সঙ্গে গতির গোলমাল পাকিয়ে ফেলেন। আমি যদি অন্য কারও চেয়ে একটু আগে দৌড়ানো শুরু করি, তাহলে আমাকেই দ্রুততর মনে হবে।’
কথাটি শুনতে ধাঁধার মতো মনে হলেও, দ্রুতগতির খেলোয়াড় মানেই কেবল দ্রুত দৌড়াতে পারা কেউ নন। বরং তারা হলেন সেই খেলোয়াড়, যারা আগে দৌড় শুরু করেন ও আগে পৌঁছেন। যাকে আমরা গতি বলে মনে করি, তা অনেক ক্ষেত্রেই পরিস্থিতি আগে থেকে বুঝতে পারার ফল। ক্রুইফ বিষয়টি ঠিকই বুঝেছিলেন। তবে আমরা সম্প্রতি একে পরিমাপ করতে শিখেছি।
স্ক্যানিং বা চারপাশ পর্যবেক্ষণের গুরুত্ব
মেসি একটি পাস রিসিভ করার ঠিক কয়েক সেকেন্ড আগের মুহূর্তটির কথা ভাবুন। বল যখন তার ধারেকাছেও থাকে না, তখন তাকে অন্তত ৩০ সেকেন্ড পর্যবেক্ষণ করুন। দেখবেন, তার মাথা খুব কমই স্থির থাকে। একবার বাঁ কাঁধের ওপর দিয়ে উঁকি দেন, তো পরক্ষণেই ডানদিকে তাকান, তারপর আবার বল পায়ে থাকা খেলোয়াড়ের দিকে দৃষ্টি ফেরান।
আপাতদৃষ্টিতে এসব খুব একটা অসাধারণ কিছু মনে হবে না। কিন্তু আপনি যখন বুঝবেন, অন্যরা যে তথ্য এখনও পাননি বা পেতে হিমশিম খাচ্ছেন, মেসি ততক্ষণে সেই তথ্য সংগ্রহ করে ফেলেছেনÑ তখন অবাক হতেই হবে। বল তার কাছে পৌঁছার আগেই তিনি জেনে যান ডিফেন্ডার ও সতীর্থরা কে কোথায় আছেন এবং ঠিক কোথায় ফাঁকা জায়গা তৈরি হবে। বল নিয়ন্ত্রণে নেওয়া, ঘুরে দাঁড়ানো ও প্রতিরক্ষাভেদী পাস দেওয়াÑ এগুলো মেসির কাছে সহজ কাজ। সবচেয়ে কঠিন কাজটি তিনি বল স্পর্শ করার আগে সেরে ফেলেন।
গবেষণায় আমরা যা দেখেছি
ফুটবলাররা বল রিসিভ করার আগে কীভাবে তথ্য সংগ্রহ করেনÑ এ নিয়ে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে আমরা গবেষণা করছি। ইয়ুথ একাডেমি থেকে শুরু করে সিনিয়র পেশাদার অ্যাথলিটদের নিয়ে কাজ করার সময়, আমরা তাদের মাথার পেছনে ছোট মোশন সেন্সর লাগিয়েছিলাম। একটি ম্যাচের সময় তারা কতবার ও কতটা ব্যাপকভাবে চারপাশ দেখেন, আমরা তার রেকর্ড করেছি।
আমরা মূলত ‘ভিজ্যুয়াল এক্সপ্লোরেশন’ বা সহজ কথায় ‘স্ক্যানিং’ পরিমাপ করে দেখেছি। আমরা একটি সাধারণ প্রশ্নের উত্তর খুঁজছিলাম : বল আসার আগে খেলোয়াড়রা কতটা সময় চারপাশ ঘুরে দেখেন এবং এর কি আদৌ কোনো প্রভাব রয়েছে? গবেষণার ফলাফল ছিল অত্যন্ত ধারাবাহিক ও স্পষ্ট। বল রিসিভ করার আগের কয়েক সেকেন্ডে যেসব খেলোয়াড় বেশিবার স্ক্যান করেন তারা পরবর্তী পাস দিতে কম সময় নেন, বলটি নিরাপদে পেছনে পাস না দিয়ে তারা বল নিয়ে ঘুরে দাঁড়ান এবং প্রতিপক্ষের জন্য হুমকি তৈরি করা ‘ফরোয়ার্ড পাস’ বেশি দেন।
বল আসার আগে তারা যে তথ্য সংগ্রহ করেন, সেটাই নির্ধারণ করে দিয়েছে বল পাওয়ার পর তারা কী করতে পারবেন। স্ক্যানিংয়ের মাধ্যমেই একজন খেলোয়াড় প্রাথমিকভাবে সেই প্রয়োজনীয় তথ্যগুলো পেয়ে থাকেন। গবেষণায় স্ক্যানিংয়ের দুটি উদ্দেশ্য খুঁজে পেয়েছি আমরা। এক. অরিয়েন্টেশন বা অবস্থান নির্ণয় : পুরো মাঠের পরিস্থিতি বোঝা, কী কী বিকল্প আছে তা খোঁজা, বিপদের জায়গাগুলো চিহ্নিত করা ও নতুন কী সুযোগ তৈরি হতে পারে তা দেখা। দুই. স্পেসিফিকেশন বা সুনির্দিষ্টকরণ: এটি হলো শেষ মুহূর্তের সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ, যা একটি নিখুঁত পাস দিতে সাহায্য করে।
অবস্থান নির্ণয়ের কাজটি আগে ঘটে এবং গবেষণা ও কোচিংÑ উভয় ক্ষেত্রেই আমরা একে কম গুরুত্ব দেই। কারণ, এই কাজটি বল থেকে দূরে ঘটে, যখন দৃশ্যত তেমন উত্তেজনাকর কিছু ঘটে না। অথচ এটাই হলো মূল ভিত্তি। আপনি এমন কোনো পাস দিতে পারবেন না, যা আপনি আগে থেকে দেখেননি। ক্রুইফ বিষয়টি এভাবে বুঝিয়েছিলেন, ‘সঠিক সময়ে পৌঁছার জন্য কেবল একটি মুহূর্তই থাকে। আপনি যদি সেই মুহূর্তে সেখানে না থাকেন, তবে আপনি হয়তো বড্ড আগে পৌঁছেছেন নয়তো বড্ড দেরিতে।’
ঠিক এখানেই মেসি আর কোনো ব্যতিক্রমী উদাহরণ থাকেন না। বরং এই খেলায় কোন বিষয়গুলো সবচেয়ে বেশি কাজে দেয়, তিনি তার সবচেয়ে স্পষ্ট দৃষ্টান্তে পরিণত হন। তিনি কখনোই তার শরীর দিয়ে প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করেন না। তিনি তাদের পরাস্ত করেন সময় দিয়ে, আর সেই সময়টি তিনি অর্জন করেন সবার আগে পরিস্থিতি বুঝে ফেলার মাধ্যমে।
মেসি যদি ধীরগতিরও হন, তাতে কিছু যায় আসে না। কারণ তিনি কারও সাথে দৌড় প্রতিযোগিতায় নামেন না। আগে থেকে এবং আরও ভালোভাবে পরিস্থিতি বোঝার সক্ষমতা ও দক্ষতার সুবাদে তাকে দৌড়াতেই হয় না। তার এই খাটো, ধীরগতি ও বয়স্ক শরীর কোনো প্রতিবন্ধকতা নয়। তিনি মেধা দিয়ে জয় করেছেন। তিনি প্রমাণ করেছেন, ফুটবলে শরীর কখনোই মুখ্য বিষয় ছিল না।
যে দক্ষতা অর্জন করা যায়
অবশ্যই, স্ক্যানিংই শেষ কথা নয়। দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও দলীয় কৌশলÑ এগুলোরও সমান গুরুত্ব রয়েছে। কিন্তু সময়মতো পাওয়া তথ্যের অভাবে এই গুণগুলো খুব কমই কাজে লাগানোর সুযোগ মেলে। এর মধ্যে একটি শিক্ষণীয় হলো, যেসব খেলোয়াড় কখনোই সবচেয়ে দ্রুতগামী নন বা সবচেয়ে লম্বাও নন, তাদের মধ্যেও আমরা সচেতনভাবে পরিস্থিতি বোঝার এই ক্ষমতা গড়ে তুলতে পারি। কোচেরা বিষয়টি আগে থেকে কিছুটা আঁচ করতে পারেন। তাই বিপদে পড়তে যাওয়া বা প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়ের ওপর থেকে নজর হারানো কোনো খেলোয়াড়কে তারা প্রায়ই ‘পিছে দেখ, পিছে’ (চেক ইয়োর শোল্ডার) বলে চিৎকার করে ওঠেন। আমাদের তথ্য বলছে, বল আসার আগে মাঠ স্ক্যান করার এই অভ্যাসটি অল্প বয়স থেকে অনুশীলন করানো সম্ভব।
পা নয়, মাথা দিয়ে খেলেন মেসি
জিমনেসিয়ামে ঘাম ঝরিয়ে অ্যাথলিট তৈরি করতে আমরা বছরের পর বছর সময় ব্যয় করি। কিন্তু মেসি অহরহ যে কাজটি করেন, সেই দক্ষতা তৈরিতে আমরা খুব কম সময় দিয়ে থাকি। কাজেই পরের বার যখন কেউ অবাক হয়ে ভাববেন, মাত্র ১.৭০ মিটার উচ্চতার ৩৯ বছর বয়সী একজন মানুষ কীভাবে এখনও বিশ্বকাপে দাপট দেখাচ্ছেন, তখন তার পায়ের দিকে নয়, মাথার দিকে লক্ষ রাখুন। শ্রেষ্ঠত্ব কখনোই শরীরে লুকিয়ে থাকে না। এটি সব সময় নিহিত থাকে দৃষ্টিতে।