আর্লিং হালান্ড ও নেইমার জুনিয়র। কোলাজ: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
বিশ্বকাপ ফুটবলের রোমাঞ্চ এখন তুঙ্গে। গ্রুপ পর্বের ধুলোবালি উড়িয়ে দিয়ে শেষ ষোলোর লাইন-আপ এখন প্রায় চূড়ান্ত। নকআউটের এই মরণ-বাঁচন লড়াইয়ের মঞ্চেই এবার তৈরি হয়েছে এক অদ্ভুত, রোমাঞ্চকর এবং কিছুটা অবিশ্বাস্য এক সমীকরণ।
ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে রোমান্টিক দল, পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে মুখোমুখি হতে যাচ্ছে ইউরোপের উদীয়মান শক্তি নরওয়ের।
এই ম্যাচটি কেবল দুটি দেশের লড়াই নয়; এটি আসলে ফুটবলীয় দুই ভিন্ন দর্শনের, দুই ভিন্ন প্রজন্মের এবং দুই চিরসবুজ তারকার দ্বৈরথÑ একদিকে সাম্বার ছন্দময় জাদুকর নেইমার জুনিয়র, অন্যদিকে ভাইকিংদের দেশের গোল-মেশিন আর্লিং হালান্ড।
ব্রাজিল ফুটবল মানেই নান্দনিকতা। ড্রিবল, ফ্লেয়ার, কল্পনাÑ এসবের জীবন্ত প্রতীক যেন নেইমার। পেলে, জিকো, রোমারিও, রোনালডো, রোনালদিনহোদের উত্তরাধিকার বহন করছেন বর্তমান তারকা নেইমার। তার খেলা শুধু গোল বা অ্যাসিস্টে সীমাবদ্ধ নয়; তিনি মাঠে ছন্দ তৈরি করেন, রক্ষণ ভাঙেন, অসম্ভবকে সম্ভব করে তোলেন।
নেইমারের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো অনিশ্চয়তা। প্রতিপক্ষ কখনোই নিশ্চিত হতে পারে না, পরের মুহূর্তে তিনি কী করবেনÑ পাস, শট, না ড্রিবল? ব্রাজিলের আক্রমণের কেন্দ্রবিন্দুতে তিনি যেন এক সুরকার, যার পায়ের স্পর্শে পুরো আক্রমণভাগ প্রাণ পায়। এই বিশ্বকাপ হয়তো নেইমারের শেষ বড় মঞ্চও হতে পারে। তাই তার চোখে শিরোপার ক্ষুধা আরও তীব্র।
নেইমার যেখানে শিল্পী, সেখানে আর্লিং হালান্ড এক যুদ্ধযন্ত্র। তিনি বল নিয়ে খুব বেশি কারুকাজ করেন না। তার খেলা সরাসরি, দ্রুত এবং বিধ্বংসী। কিন্তু এই সরলতার মধ্যেই লুকিয়ে আছে ভয়াবহতা।
দীর্ঘদেহ, বিস্ফোরক গতি, অবিশ্বাস্য পজিশনিং এবং শিকারির মতো গোলের ঘ্রাণ-হালান্ড আধুনিক স্ট্রাইকারের এক নিখুঁত প্রতিচ্ছবি। প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডাররা ৮৯ মিনিট তাকে আটকে রাখতে পারে। কিন্তু এক সেকেন্ডের অসতর্কতা এবং ম্যাচ শেষ।
নরওয়ের ফুটবল পুনর্জাগরণের কেন্দ্রবিন্দু এখন তিনিই। যেখানে হালান্ড, সেখানেই আশা। নেইমার আর হালান্ডের তুলনা আসলে সহজ নয়। কারণ তারা একই খেলার দুই বিপরীত প্রান্ত।
নেইমার বল নিয়ে খেলা তৈরি করেন। হালান্ড খেলা শেষ করেন। নেইমার সৃজনশীলতা। হালান্ড কার্যকারিতা। নেইমার আবেগ। হালান্ড নিষ্ঠুর শীতলতা।
একজন রঙতুলিতে ছবি আঁকেন। অন্যজন হাতুড়ির আঘাতে দেয়াল ভাঙেন।
বিশ্বকাপের নকআউট মঞ্চে এই দুই দর্শনের সংঘর্ষই ম্যাচটিকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। বিশ্বকাপ সবসময় শুধু দলীয় লড়াই নয়; এটি কখনও কখনও ব্যক্তিত্বের সংঘর্ষও। এই ম্যাচ ঠিক তেমন।
একদিকে ব্রাজিলীয় ফুটবলের শেষ মহান শিল্পী। অন্যদিকে ইউরোপীয় ফুটবলের নতুন যুগের সবচেয়ে ভয়ংকর গোলমেশিন।
মাঠে যখন প্রথম বাঁশি বাজবে, তখন শুধু ব্রাজিল-নরওয়ে ম্যাচ শুরু হবে নাÑ শুরু হবে দুই যুগের প্রতীকী দ্বন্দ্ব।
সাম্বার জাদু কি টিকে থাকবে? নাকি ভাইকিং ঝড়ে কেঁপে উঠবে পাঁচ তারকার আকাশ? উত্তর লুকিয়ে আছে ৫ জুলাইয়ে ৯০ মিনিটের এক মহারণে।
ফুটবল ইতিহাসে এই দুই দল মুখোমুখি হয়েছে মাত্র দুইবার। একবার জয় পেয়েছে নরওয়ে। অন্য ম্যাচ ড্র। অর্থাৎ অবিশ্বাস্য হলেও সত্য ব্রাজিল এখনও নরওয়ের বিপক্ষে জয় পায়নি। এই পরিসংখ্যান ব্রাজিলকে বাড়তি চাপ দিতেই পারে। অন্যদিকে নরওয়েকে দেবে আত্মবিশ্বাসÑ তারা জানে, সাম্বার সুর থামানো অসম্ভব নয়।