একই দিনে বিদায় নিল ইউরোপের দুই ঐতিহ্যবাহী পরাশক্তি জার্মানি ও নেদারল্যান্ডস। ছবি: ইনস্টাগ্রাম থেকে নেওয়া
ফুটবল কখনও কখনও কেবল একটি খেলা থাকে না; এটি হয়ে ওঠে ইতিহাস, স্মৃতি, গৌরব, বেদনা আর অপূর্ণতার এক দীর্ঘ উপাখ্যান। ২০২৬ বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে এমনই এক নির্মম রাত দেখল ফুটবল বিশ্ব। একই দিনে বিদায় নিল ইউরোপের দুই ঐতিহ্যবাহী পরাশক্তি জার্মানি ও নেদারল্যান্ডস। জার্মানি হারাল নিজেদের অদম্য পরিচয়, নেদারল্যান্ডস আবারও ডুবে গেল অপূর্ণতার চিরচেনা অন্ধকারে।
চারবারের চ্যাম্পিয়ন জার্মানির বিদায়টা যেন এক যুগের অবসানের প্রতীক। দক্ষিণ আমেরিকার দেশ প্যারাগুয়ের সঙ্গে ১-১ সমতার পর টাইব্রেকারে ৪-৩ ব্যবধানে হেরে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে গেছে তারা। পরাজয়ের চেয়েও বড় ধাক্কা অন্য জায়গায়। বিশ্বকাপ ইতিহাসে এটাই জার্মানির প্রথম টাইব্রেকার হার।
একসময় টাইব্রেকার মানেই ছিল জার্মানির মানসিক শ্রেষ্ঠত্বের গল্প। চাপের মুহূর্তে ঠান্ডা মাথা, অবিচল স্নায়ু, শৃঙ্খলিত কৌশল- এসবই ছিল জার্মান ফুটবলের পরিচয়। প্রতিপক্ষের চোখে ভয় ধরিয়ে দেওয়া সেই জার্মানি এখন যেন নিজস্ব ছায়ার সঙ্গেই লড়ছে।
২০১৪ সালে ব্রাজিলের মারাকানায় আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে চতুর্থ বিশ্বকাপ জিতেছিল জার্মানি। তখন মনে হয়েছিল ফুটবলের নতুন সাম্রাজ্য বুঝি জন্ম নিল। কিন্তু সময় কখনও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে না। ২০১৮ সালে গ্রুপপর্ব থেকেই বিদায়, ২০২২ আসরেও একই ব্যর্থতা। এবার প্রথম রাউন্ড পেরিয়ে পুনর্জাগরণের আভাস মিলেছিল। অথচ শেষ পর্যন্ত আবারও হতাশা। ২০১৪ সালের সোনালি রাত এখন কেবল দূর আকাশে মিলিয়ে যাওয়া নক্ষত্রের মতো।
জার্মানির বিদায়ে যেমন বিস্ময় আছে, নেদারল্যান্ডসের বিদায়ে আছে দীর্ঘশ্বাস। বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে প্রতিভাবান অথচ সবচেয়ে অপূর্ণ শক্তিগুলোর একটি ডাচরা আবারও হৃদয়ভাঙার গল্প লিখল। মরক্কোর ১-১ সমতার পর টাইব্রেকারে ৩-২ ব্যবধানে হেরে বিদায় নিয়েছে তারা। এই হার কেবল একটি ম্যাচের পরাজয় নয়, এটি বহু দশকের বেদনাকে আবারও জাগিয়ে তোলা এক নিষ্ঠুর স্মারক।
টাইব্রেকার যেন নেদারল্যান্ডসের জন্য এক অদৃশ্য অভিশাপ। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে নাটকীয় প্রত্যাবর্তনের পরও আর্জেন্টিনার কাছে টাইব্রেকারে হার। ২০১৪ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালেও একই প্রতিপক্ষের কাছে একই পরিণতি। লড়াই করেছে, সৌন্দর্য দেখিয়েছে, কিন্তু শেষ দরজা খুলতে পারেনি।
আর ২০১০ সালের সেই ক্ষত হয়তো এখনও শুকায়নি। দক্ষিণ আফ্রিকায় ফাইনালে বিশ্বকাপ ট্রফি ছিল হাতছোঁয়া দূরত্বে। অতিরিক্ত সময়ে আন্দ্রে ইনিয়েস্তার গোল সব স্বপ্ন গুঁড়িয়ে দেয়। স্পেন হয় চ্যাম্পিয়ন, আর ডাচরা ফিরে যায় বুকভরা শূন্যতা নিয়ে।
নেদারল্যান্ডসের ইতিহাস যেন অসমাপ্ত সিম্ফনি। ১৯৭৪, ১৯৭৮ ও ২০১০ তিনবার বিশ্বকাপ ফাইনাল, কিন্তু একবারও ট্রফি ছোঁয়া হয়নি। ‘টোটাল’ ফুটবলের জন্মদাতা দেশটি আজও বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় অপূর্ণতার প্রতীক। সৌন্দর্য আছে, দর্শন আছে, প্রতিভা আছে- শুধু নেই সেই শেষ হাসি।
দুই দলের বিদায় ফুটবল বিশ্বকে কঠিন এক বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়েছে। গৌরব উত্তরাধিকার হতে পারে, কিন্তু জয় নয়। অতীত সম্মান এনে দেয়, নিশ্চয়তা নয়।
জার্মানির সামনে এখন পুনর্গঠনের প্রশ্ন। তাদের ঐতিহ্যবাহী দৃঢ়তা কি ক্ষয়ে যাচ্ছে? নতুন প্রজন্ম কি হারিয়ে ফেলছে সেই অদম্য জার্মান মানসিকতা?
অন্যদিকে নেদারল্যান্ডসের প্রশ্ন আরও গভীর- কেন তারা বারবার শেষ সীমানায় এসে থেমে যায়? কেন সাফল্যের এত কাছে গিয়েও শূন্য হাতে ফিরতে হয়?
বিশ্বকাপ নিষ্ঠুর। এখানে ইতিহাসের কোনো বিশেষ ছাড় নেই। চারটি তারা গায়ে থাকুক বা তিনটি, ফাইনালের স্মৃতি বুকে, বর্তমানের লড়াইয়ে ব্যর্থ হলে অতীত কেবল গল্প হয়ে যায়।