রুমেল খান
প্রকাশ : ২৩ ঘণ্টা আগে
আপডেট : ২৩ ঘণ্টা আগে
লিওনেল মেসি। ছবি: গোল ডট কম
আর মাত্র সপ্তাহখানেক পরেই পা দেবেন ৩৯ বছরে। এই বয়সে এসে যেকোনো ফুটবলারেরই ফর্ম আর ফিটনেসে মরিচা ধরাটা স্বাভাবিক, অনেকেই বুট জোড়া তুলে রেখে মেতে ওঠেন অবসরের আমেজে। কিন্তু লিওনেল মেসি তো আর দশজন সাধারণ ফুটবলারের মতো নন; তিনি যে নিয়মের ঊর্ধ্বে, ব্যাকরণের বাইরে। নিজের ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপ খেলতে নেমে বুধবার আলজেরিয়ার বিপক্ষে প্রথম ম্যাচেই যা করলেন, তাকে স্রেফ ‘বিস্ময়কর’ বা ‘বর্ণনাতীত’ বললেও যেন কম বলা হয়। আলজেরিয়ার বিরুদ্ধে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা ৩-০ গোলে দাপুটে জয় পেয়েছে ঠিকই, তবে পুরো ম্যাচের চিত্রনাট্যজুড়ে মূর্ত হয়ে রইল ‘মেসি ম্যাজিক’।
আর্জেন্টিনার আকাশি-সাদা জার্সিতে এটি ছিল মেসির ২০০তম আন্তর্জাতিক ম্যাচ। ফুটবলের ইতিহাসে খুব কম খেলোয়াড়ই এই চূড়ায় পৌঁছতে পেরেছেন। ২০ বছর আগে যে কিশোরের যাত্রা শুরু হয়েছিল, বুধবার ২০০তম ম্যাচে হ্যাটট্রিক করে তার পূর্ণতা দিলেন তিনি।
ম্যচের একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে রেটিংয়ের বিচারে ১০-এ ১০ পাওয়া আর্জেন্টিনা অধিনায়কের থেকে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত চোখ সরানোর উপায় ছিল না। পুরো ম্যাচে ৫৭ বার বল টাচ, ৩০টি সফল পাস ও ২টি দারুণ সুযোগ তৈরি করার পাশাপাশি আলজেরিয়ার পেনাল্টি বক্সে প্রতিনিয়ত ত্রাস সৃষ্টি করেছেন তিনি। নিয়েছেন ৬টি শট, যার ৪টিই ছিল অন-টার্গেট। আর এই আক্রমণের শেষটা হয়েছে এক নয়নাভিরাম হ্যাটট্রিকে, যার মাধ্যমে দলের ৩টি গোলই আসে তার পা থেকে। এই এক ম্যাচেই মেসি নিজের ঝুলিতে পুরেছেন এক-দুটি নয়, অবিশ্বাস্য হাফ ডজন বিশ্বরেকর্ড।
আলজেরিয়ার বিপক্ষে এই জাদুকরি পারফরম্যান্সের রাতে ফুটবল ইতিহাসের পাতা ওলটপালট করে মেসি কীর্তি গড়েছেন গুণে গুণে ১২টি। সেগুলো এক এক করে জানা যাক।
বুধবার ম্যাচের আগে বিশ্বকাপে মেসির গোল ছিল ১৩টি, যা ফরাসি কিংবদন্তি জাস্ট ফন্টেইনের সঙ্গে যুগ্মভাবে তৃতীয়। আলজেরিয়ার জালে তিনবার বল পাঠিয়ে গোলসংখ্যা উন্নীত করেন ১৬-তে, যা জার্মান কিংবদন্তি মিরোস্লাভ ক্লোসের সাথে যৌথভাবে। আর মাত্র ১টি গোল করলেই তিনি এককভাবে বিশ্বকাপের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হবেন।
২০০৬ সালে জার্মানিতে শুরু হওয়া বিশ্বকাপ যাত্রা ২০২৬ সালে এসে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছল। ফুটবল ইতিহাসের প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে ছয়টি ভিন্ন বিশ্বকাপে (২০০৬, ২০১০, ২০১৪, ২০১৮, ২০২২, ২০২৬) মাঠের লড়াইয়ে নামার নজির গড়লেন মেসি।
বিশ্বকাপে খেলোয়াড় হিসেবে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ জয়ের (১৭টি জয়) রেকর্ডটি এতদিন ছিল মিরোস্লাভ ক্লোসের। বুধবার ম্যাচ জিতে সেই রেকর্ডটি এখন মেসিরও। আরেকটি ম্যাচে জিতলেই ক্লোসেকে ছাড়িয়ে যাবেন ‘লা আলবিসেলেস্তে’ অধিনায়ক।
এখানেই শেষ নয়। বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ভিন্ন ম্যাচে গোল করার কীর্তিও গড়েছেন এই আর্জেন্টাইন মহাতারকা। এ পর্যন্ত বিশ্বকাপের ১২টি পৃথক ম্যাচে গোল করলেন রোজারিওর এই কৃতী সন্তান।
বয়স বাড়লেও রেকর্ড কিন্তু ছাড়ছে না মেসিকে। বুধবার আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করে বয়সভিত্তিক দুটি বিশ্বকাপ রেকর্ড গড়েছেন আর্জেন্টিনা অধিনায়ক মেসি। একটি হচ্ছে বিশ্বকাপের বয়স্কতম জোড়া গোলদাতা (৩৮ বছর ৩৫৭ দিন বয়সে) এবং অন্যটি বিশ্বকাপের বয়স্কতম হ্যাটট্রিকধারী (৩৮ বছর ৩৫৭ দিন বয়সে)। অবশ্য এই রেকর্ড দুটি নিরাপদ নয়, কেননা মেসির চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পর্তুগালের ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো আছেন যে!
আলজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের ১৭ মিনিটে প্রথম গোলটি করে মেসি আরেকটি বিশ্বকাপ-রেকর্ড গড়েন। সেটি হচ্ছে প্রথম ও শেষ গোলের দীর্ঘতম ব্যবধান। সেটা দীর্ঘ ২০ বছরের (১৬/০৬/২০০৬ থেকে ১৬/০৬/২০২৬)।
মজার ব্যাপার, ঠিক ২০ বছর আগে (১৬ জুন, ২০০৬) বিশ্বকাপে নিজের প্রথম গোল করেছিলেন মেসি। আর ২০ বছর পর (১৬ জুন, ২০২৬) সেই একই সময়ে গোলবন্যা বইয়ে দিয়ে বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় ব্যবধানের গোলের রেকর্ড গড়লেন তিনি। যেন ইতিহাসের এক পরম বৃত্ত সম্পূর্ণ হলো।
বুধবার মেসি হ্যাটট্রিক করে ক্লাব ও জাতীয় দল মিলিয়ে নিজের হ্যাটট্রিক সংখ্যা ৬১টিতে উন্নীত করেন। যদিও এটা রেকর্ড নয়। রেকর্ডটা হচ্ছে এরকম- আন্তর্জাতিক ফুটবলে সর্বাধিক হ্যাটট্রিক করার তালিকায় চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ও ‘সিআর সেভেন’ খ্যাত রোনালদোকে পেছনে ফেলে এখন এককভাবে শীর্ষে উঠে গেলেন মেসি। আর্জেন্টিনার হয়ে এটা ছিল মেসির ১১-তম হ্যাটট্রিক।
বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলে অবদানের ক্ষেত্রে রেকর্ডটা এতদিন ব্রাজিলিয়ান গ্রেট পেলের সঙ্গে ভাগাভাগি করছিলেন মেসি। বুধবার সেই পেলেকেও ছাড়িয়ে গেলেন মেসি। গোল-অ্যাসিস্ট মিলিয়ে ২৪টি গোলে অবদান রাখলেন মেসি (১৬টি গোল ও ৮টি অ্যাসিস্ট)। পেলের ছিল ২১টি গোলে অবদান (১২ গোল ও ৯ অ্যাসিস্ট)।
বিশ্বকাপে সর্বাধিক ‘ম্যান অব দ্য ম্যাচ’ হওয়ার ব্যাপারে আগে থেকেই এক নম্বরে ছিলেন মেসি। বুধবার সেটাকে আরও ‘আপডেট’ করে নেন মেসি (১২ বার)।
বিশ্বকাপের ম্যাচগুলোতে সবচেয়ে বেশি ৯ বার দলের পক্ষে প্রথম গোল করার রেকর্ডও গড়েছেন মেসি।
বিশ্বকাপের আসরগুলোতে ডি-বক্সের বাইরে থেকে করা সবচেয়ে বেশি গোলের মালিকও এখন মেসি (৫টি গোল)।
দশ বছর আগে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানিয়ে দিয়েছিলেন। চার বছর আগে বলেছিলেন কাতার বিশ্বকাপই তার শেষ বিশ্বকাপ। একটি বিশ্বকাপ ও তিনটি কোপার ফাইনালে হার। অনেকেই ভেবেছিলেন ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ উঁচিয়ে ধরার পর লিওনেল মেসির সেরা সময় ফুরিয়ে এসেছে। কিন্তু আলজেরিয়ার বিপক্ষে মাঠের এই রূপকথা যেন সেই ধারণার মুখে এক জোরালো ও নান্দনিক জবাব। এখন পুরো ফুটবল বিশ্ব অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে আর্জেন্টিনার পরবর্তী ম্যাচের জন্য। কারণ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, মেসি যখন চেনা ছন্দে থাকেন, তখন ফুটবল দুনিয়ার কোনো রেকর্ডই আর নিরাপদ থাকে না!
এখন পুরো ফুটবল বিশ্ব অপেক্ষায় আছে পরবর্তী ম্যাচের। কারণ ইতিহাস বলছে, মেসি যখন ছন্দে থাকেন তখন রেকর্ডগুলো বেশিদিন নিরাপদ থাকে না।
মেসির ১২ রেকর্ড