মরক্কো-ব্রাজিল লড়াই
রেফারির প্রথম বাঁশি বাজার পর থেকেই ব্রাজিল ও মরক্কোর লড়াইয়ে দর্শকদের চোখ থাকবে ব্রাজিলের বাম প্রান্তে। কারণ সেখানেই মুখোমুখি হবেন দুই মহাতারকা ভিনিসিয়ুস জুনিয়র ও আশরাফ হাকিমি। কোলাজ: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
বিশ্বকাপের মঞ্চে ব্রাজিল ও মরক্কোর লড়াই মানেই উত্তেজনার পারদ চড়া। বিশ্বকাপের প্রথম রাউন্ডের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ম্যাচগুলোর একটি হলো এ দুদলের লড়াই।
আর রেফারির প্রথম বাঁশি বাজার পর থেকেই দর্শকদের চোখ থাকবে ব্রাজিলের বাম প্রান্তে। কারণ সেখানেই মুখোমুখি হবেন দুই মহাতারকা ভিনিসিয়ুস জুনিয়র ও আশরাফ হাকিমি।
তাদের এই লড়াইই হয়তো নির্ধারণ করে দিতে পারে ম্যাচের ভাগ্য, এমনকি গ্রুপের শীর্ষস্থানও।
রবিবার মেটলাইফ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া দুই দলের ম্যাচটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে এ দুজনের বিশেষ দ্বৈরথ। একদিকে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের এ যুগের তারকা ভিনিসিয়ুস, অন্যদিকে আফ্রিকান ফুটবলের নতুন শক্তি মরক্কোর প্রাণভোমরা হাকিমি।
দুই দলের ভাগ্য নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে এই দুই তারকার ব্যক্তিগত লড়াই। ম্যাচের ফলাফল হয়তো নির্ভর করবে কয়েকটি মুহূর্ত, কয়েকটি সিদ্ধান্ত কিংবা একটি ভুলের ওপর; আর সেই মুহূর্তগুলোর কেন্দ্রে থাকতে পারেন ভিনিসিয়ুস ও হাকিমি।
নেইমারের যুগের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে ব্রাজিল ফুটবল যখন নতুন এক মহাতারকার খোঁজে ছিল, তখন সামনে এসে দাঁড়ান ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। দুরন্ত গতি, চোখধাঁধানো ড্রিবলিং, প্রতিপক্ষকে মুহূর্তেই ছিন্নভিন্ন করে দেওয়ার ক্ষমতা এবং বড় ম্যাচে জ্বলে ওঠার অসাধারণ সামর্থ্য তাকে সেরাদের কাতারে নিয়ে গেছে। ব্রাজিল কোচ কার্লো আনচেলত্তির কৌশলের বড় অংশই হবেন ভিনিসিয়ুসকে ঘিরেই।
শুরুর দিকে সমালোচনার মুখে পড়লেও ধীরে ধীরে নিজেকে বিশ্বের অন্যতম ভয়ংকর আক্রমণভাগের খেলোয়াড়ে পরিণত হয়েছেন ভিনি। রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে জিতেছেন একাধিক লা লিগা ও দুটি উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগ শিরোপা। সবচেয়ে বড় কথা, ২০২২ ও ২০২৪ সালের চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনাল দুই ম্যাচেই গোল করে দলের শিরোপা জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। ২০২৪ সালে তিনি নির্বাচিত হন ‘দ্য বেস্ট ফিফা মেনস প্লেয়ার’।
তবে ভিনিসিয়ুসের সামনে এবার এমন এক প্রতিপক্ষ, যিনি তাকে থামানোর সামর্থ্য রাখেন। যার উপস্থিতি শুধু একটি দলের শক্তিই বাড়ায় না, বদলে দেয় পুরো ম্যাচের চিত্র। মরক্কোর আশরাফ হাকিমি ঠিক তেমনই একজন। নামের পাশে ‘ডিফেন্ডার’ লেখা থাকলেও তিনি আসলে রক্ষণ, মাঝমাঠ ও আক্রমণ তিন বিভাগেরই সমান গুরুত্বপূর্ণ সৈনিক। রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে পেশাদার ক্যারিয়ার শুরু করলেও প্রকৃত বিকাশ ঘটে জার্মান ক্লাব বরুসিয়া ডর্টমুন্ডে। এরপর ইতালির ইন্টার মিলান এবং বর্তমানে ফ্রান্সের প্যারিস সেইন্ট জার্মেইনে (পিএসজি) নিজেকে বিশ্বের অন্যতম সেরা রাইট-ব্যাক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। পিএসজিকে টানা দ্বিতীয়বারের মতো চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়ে বড় ভূমিকা রয়েছে আফ্রিকান এ মাস্টার মাইন্ডের।
২০২২ কাতার বিশ্বকাপে হাকিমি হয়ে উঠেছিলেন পুরো আফ্রিকার গর্ব। তার নেতৃত্বে মরক্কো ইতিহাস গড়ে প্রথম আফ্রিকান ও প্রথম আরব দেশ হিসেবে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে পৌঁছে যায়। স্পেনের বিপক্ষে শেষ ষোলোয় টাইব্রেকারে তার সেই বিখ্যাত ‘পানেনকা’ পেনাল্টি আজও বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হয়।
দুই তারকার প্রতিদ্বন্দ্বিতা অবশ্য নতুন নয়। ২০২২ সালে উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগের শেষ ষোলোতে রিয়াল মাদ্রিদ ও প্যারিস সেইন্ট জার্মেইনের লড়াইয়ে প্রথমবারের মতো বড় মঞ্চে মুখোমুখি হয়েছিলেন তারা। প্রথম লেগে হাকিমি বেশ সফলভাবেই ভিনিসিয়ুসকে নিয়ন্ত্রণে রেখেছিলেন। তবে সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে দ্বিতীয় লেগে রিয়ালের ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তনের ম্যাচে ভিনিসিয়ুস হয়ে ওঠেন অনেক বেশি প্রভাবশালী এবং শেষ পর্যন্ত ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের দিকে নিয়ে যায় স্প্যানিশ জায়ান্টরা।
সবচেয়ে সাম্প্রতিক লড়াইটি হয়েছিল ২০২৫ ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে। একই মেটলাইফ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত সেই ম্যাচে হাকিমির পিএসজি ৪-০ গোলে উড়িয়ে দেয় রিয়াল মাদ্রিদকে। ওই ম্যাচে ভিনিসিয়ুস ও কিলিয়ান এমবাপের মতো তারকাদের কার্যত নিষ্ক্রিয় করে রেখেছিল প্যারিসের দলটি।
ব্রাজিলের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, মরক্কোর সুসংগঠিত রক্ষণভাগ ভাঙার সবচেয়ে বড় চাবিকাঠি ভিনিসিয়ুস। তিনি যদি নিয়মিতভাবে হাকিমিকে হারিয়ে জায়গা তৈরি করতে পারেন, তাহলে মরক্কোর রক্ষণভাগের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যেতে পারে। অন্যদিকে মরক্কো জানে, হাকিমির উপস্থিতিই তাদের রক্ষণ ও আক্রমণের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ।
ব্রাজিল কোচ কার্লো আনচেলত্তি ইতোমধ্যে এই ম্যাচকে গ্রুপ পর্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লড়াই হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন নির্ধারণে এই ম্যাচের ফল বড় প্রভাব ফেলতে পারে। অন্যদিকে মরক্কো কোচ মোহাম্মদ ওহাবি জানিয়েছেন, ব্রাজিলকে তারা যথেষ্ট সম্মান করেন, তবে ভয় পান না। ব্রাজিলের উইঙ্গারদের থামাতে পুরো দলকে একসঙ্গে রক্ষণ ও আক্রমণ করতে হবে।