মাছুম বিল্লাহ
প্রকাশ : ১৫ ঘণ্টা আগে
আপডেট : ১৫ ঘণ্টা আগে
গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
ফুটবল বিশ্বকাপ শুধু মাঠের লড়াইয়ের নাম নয়; এটি বিশ্বের নানা সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও মানুষের এক মহামিলনমেলা। প্রতি চার বছর পর পর আয়োজিত এই বৈশ্বিক উৎসব কেবল শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই নয়, বরং বিভিন্ন দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও পরিচয়কে বিশ্বের সামনে তুলে ধরারও একটি মঞ্চ। ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপ সেই দিক থেকে বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। কারণ ইতিহাসে প্রথমবারের মতো তিনটি দেশ যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো যৌথভাবে আয়োজন করছে ফুটবলের সবচেয়ে বড় এই আসর। আর এই ঐতিহাসিক আয়োজনের প্রতিফলন ঘটেছে বিশ্বকাপের অফিসিয়াল ম্যাচ বল ‘ট্রাইওন্ডা’ এবং নতুন তিন মাসকটের নকশা ও ভাবনায়।
ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর অফিসিয়াল ম্যাচ বলের নাম ‘ট্রাইওন্ডা’। বলটি তৈরি করেছে বিশ্বখ্যাত ক্রীড়াসামগ্রী নির্মাতা প্রতিষ্ঠান অ্যাডিডাস। এর মাধ্যমে টানা ১৫তম বারের মতো ফিফা বিশ্বকাপের অফিসিয়াল বল সরবরাহ করছে প্রতিষ্ঠানটি। ট্রাইওন্ডা নামটি স্প্যানিশ ভাষা থেকে এসেছে। ‘ট্রাই’ অর্থ তিন এবং ‘ওন্ডা’ অর্থ ঢেউ। ফলে ট্রাইওন্ডার অর্থ দাঁড়ায় ‘তিনটি তরঙ্গ’। নামটির মধ্যেই তিন স্বাগতিক দেশের ঐক্য ও সংযোগের বার্তা তুলে ধরা হয়েছে।
বলটির নকশায় লাল, সবুজ ও নীল রঙের ঢেউ ব্যবহার করা হয়েছে। পাশাপাশি বলের গায়ে স্থান পেয়েছে তিন দেশের জাতীয় পরিচয়ের প্রতীক। কানাডার ম্যাপল পাতা, মেক্সিকোর ঈগল এবং যুক্তরাষ্ট্রের তারকা। নতুন চার-প্যানেলের গঠন ও তরঙ্গাকৃতির জ্যামিতিক নকশা বলটিকে দিয়েছে ব্যতিক্রমী সৌন্দর্য। চারটি প্যানেল একত্রিত হয়ে বলের কেন্দ্রে একটি ত্রিভুজ আকৃতি তৈরি করেছে। সোনালি অলংকরণে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে বিশ্বকাপ ট্রফির মর্যাদা ও গৌরব।
শুধু নান্দনিকতাই নয়, প্রযুক্তিগত উৎকর্ষেও অনন্য ট্রাইওন্ডা। বলটির বিশেষভাবে নকশাকৃত গভীর সেলাইয়ের রেখা বাতাসে বলের স্থিতিশীলতা ও ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়তা করে। ফলে দীর্ঘ পাস, শট কিংবা ক্রসের সময় বলের গতিপথ আরও নিখুঁত হয়। আধুনিক ফুটবলের চাহিদা মাথায় রেখে এতে যুক্ত করা হয়েছে সর্বাধুনিক ‘কানেক্টেড বল প্রযুক্তি’। বলের ভেতরে স্থাপন করা হয়েছে ৫০০ হার্টজের অত্যাধুনিক মোশন সেন্সর চিপ, যা বলের প্রতিটি নড়াচড়া, গতি ও অবস্থান অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারে। এই প্রযুক্তি সরাসরি ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি সিস্টেমে তথ্য পাঠাবে, যার ফলে ম্যাচ কর্মকর্তাদের আরও নির্ভুল সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করবে। বিশেষ করে অফসাইড শনাক্তকরণ, বলের অবস্থান বিশ্লেষণ এবং বিতর্কিত মুহূর্তে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বিশ্বকাপের আবহকে আরও রঙিন করে তুলতে তিনটি নতুন মাসকটও উন্মোচন করেছে ফিফা। তিন স্বাগতিক দেশের প্রতিনিধিত্বকারী এই মাসকটগুলো হলো কানাডার ‘মেপল’ নামের মুজ, মেক্সিকোর ‘জায়ু’ নামের জাগুয়ার এবং যুক্তরাষ্ট্রের ‘ক্লাচ’ নামের বল্ড ঈগল। ফিফার মতে, এই তিন চরিত্র আনন্দ, উদ্যম, বৈচিত্র্য ও ঐক্যের প্রতীক।
কানাডার প্রতিনিধি মেপল একজন ভ্রমণপিপাসু ও সংস্কৃতিপ্রেমী চরিত্র। দেশটির বিভিন্ন প্রদেশ ও অঞ্চলে ঘুরে বেড়িয়ে সে কানাডার বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতিকে আত্মস্থ করেছে। শিল্প, সংগীত ও সৃজনশীলতার প্রতি তার বিশেষ অনুরাগ রয়েছে। মাঠে সে একজন দক্ষ গোলরক্ষক, যার আত্মবিশ্বাস ও নেতৃত্বগুণ তাকে আলাদা পরিচয় দিয়েছে।
অন্যদিকে দক্ষিণ মেক্সিকোর জঙ্গল থেকে উঠে আসা জায়ু দ্য জাগুয়ার দেশটির ঐতিহ্য, শক্তি ও প্রাণচাঞ্চল্যের প্রতীক। একজন স্ট্রাইকার হিসেবে তার গতি, ক্ষিপ্রতা ও সৃজনশীলতা প্রতিপক্ষের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। মাঠের বাইরে নৃত্য, খাবার ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মাধ্যমে মেক্সিকোর প্রাণবন্ত পরিচয় তুলে ধরে সে। মানুষের মধ্যে সংযোগ ও সম্প্রীতি গড়ে তোলাই তার মূল লক্ষ্য।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি ক্লাচ দ্য বল্ড ঈগল সাহস, নেতৃত্ব ও আশাবাদের প্রতীক। দেশজুড়ে ভ্রমণ করে বিভিন্ন সংস্কৃতি ও মানুষের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে সে। মাঠে একজন মিডফিল্ডার হিসেবে খেলাটির ছন্দ নিয়ন্ত্রণ করে ক্লাচ, আর মাঠের বাইরে সতীর্থদের অনুপ্রাণিত করে সামনে এগিয়ে যেতে উৎসাহ জোগায়।
মজার বিষয় হলো, তিন মাসকট একসঙ্গে একটি ফুটবল দলের প্রতিচ্ছবিও তৈরি করে। মেপল গোলরক্ষক, জায়ু স্ট্রাইকার এবং মাঝমাঠের দায়িত্বে রয়েছে ক্লাচ। ফিফার ভাষায়, এই তিন চরিত্র একত্রে ফুটবল ঘিরে মানুষের আবেগ, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং বৈশ্বিক ঐক্যের প্রতীক।