এশিয়ান গেমস নারী হকির মূলপর্বে বাংলাদেশ
রুমেল খান
প্রকাশ : ২৬ এপ্রিল ২০২৬ ২২:৪৪ পিএম
আপডেট : ২৬ এপ্রিল ২০২৬ ২২:৪৫ পিএম
এশিয়ান গেমস নারী হকির মূলপর্বে নাম লিখিয়ে অবিস্মরণীয় মুহূর্তটাকে ফ্রেমবন্দী করে রাখলো বাংলাদেশ জাতীয় নারী হকি দল। ছবি : বাংলাদেশ হকি ফেডারেশন
‘শোনো নারী/তুমি চাইলেই পারো সব/চোখ
বুজে কেন?/কেন রবে মুখ চেপে আঁচলে/তোমরাই তো জলতরঙ্গে সুর-তাল-লয় এনেছো’ ... রূপকথা
নয়, এ যে রীতিমতো বাস্তব। প্রথম দল, প্রথম আসরে অংশগ্রহণ, আর তাতেই কি না এমন অবিস্মরণীয়
কীর্তি, অভিষেকেই ইতিহাস! বলছি বাংলাদেশ জাতীয় নারী হকি দলের কথা। রবিবার (২৬ এপ্রিল) এশিয়ান গেমস
হকির মূলপর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে দেশের ক্রীড়াঙ্গনে রীতিমতো আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
কিছুদিন আগে পুরুষ দলও একই কীর্তি গড়েছিল। ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তায় জিবিকে হকি ফিল্ডে
অনুষ্ঠিত ওমেন্স এশিয়ান গেমস হকির বাছাইপর্বে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে হংকংকে ২-১ গোলে
হারিয়ে সেমিফাইনালে উন্নীত হয়। ম্যাচসেরা হন বিজয়ী দলের তন্নি খাতুন। আর সেই
সঙ্গে মূলপর্বের টিকিট কেটে চমক সৃষ্টি করে। নারী হকি দলকে অভিনন্দন জানিয়েছেন যুব
ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক।
বাংলাদেশ-হংকং ম্যাচের একটি দৃশ্য। ছবি : এশিয়ান হকি ফেডারেশন
মূলপর্বে খেলা নিশ্চিত করতে লাল-সবুজ
বাহিনীর কেবল ড্রই যথেষ্ট ছিল। কিন্তু তারা ড্র নয়, জয় কুড়িয়ে নিয়েই নিশ্চিত করে অভীষ্ট
লক্ষ্যে উপনীত হওয়া। বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে-এবারের এশিয়ান গেমসের বাছাইপর্বই বাংলাদেশের
মেয়েদের প্রথম আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা! আর অভিষেক টুর্নামেন্টেই কি না দারুণভাবে স্মরণীয়
করে রাখল তারা। গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচে চাইনিজ তাইপের সঙ্গে ৫-৫ গোলে ড্র করে বাংলাদেশ।
দ্বিতীয় ম্যাচে ৩-২ গোলে হারায় উজবেকিস্তানকে, যা তাদের ইতিহাসের প্রথম জয়। ফলে তৃতীয়
ও শেষ ম্যাচে ড্র করলেই নিশ্চিত হতো সেমিতে খেলা, সঙ্গে মূল পর্বের টিকিটও। তিন ম্যাচে
৭ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ সেরা হয়ে সেমিফাইনালে উঠল বাংলাদেশ। নিয়ম অনুযায়ী দুই গ্রুপের
চ্যাম্পিয়ন ও রানার্সআপ পাবে সরাসরি আগামী সেপ্টেম্বরে জাপানে হতে যাওয়া এশিয়ান গেমসে
খেলার সুযোগ। এ সমীকরণ বাংলাদেশ মিলিয়ে নিল অপরাজিত থেকে নকআউট পর্বে ওঠে।
ম্যাচে হারলেও বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ের
৩৪তম দল হংকং-ই ম্যাচের প্রথম মিনিটেই গোল করে এগিয়ে যায়। হারার শঙ্কায় পেয়ে বসে বাংলাদেশকে।
ডান দিক থেকে সতীর্থের বাড়ানো আড়াআড়ি ক্রসে সার্কেলের ভেতর থেকে নিখুঁত হিটে লক্ষ্যভেদ
করেন ল কা মুন মেলিসা। ম্যাচের বয়স তখন মাত্র ১৫ সেকেন্ড!
ম্যাচে অবশ্য ঘুরে দাঁড়াতে বেশি
সময় নেয়নি বাংলাদেশ। ১০ মিনিটেই সমতায় ফেরে তারা। জটলার মধ্য থেকেই সতীর্থের পাস সার্কেলের
ভেতরে প্রথম প্রচেষ্টায় নিয়ন্ত্রণে নিয়ে ঠান্ডা মাথার হিটে গোলকিপারকে পরাস্ত করেন
এমা নাদিরা। প্রথমার্ধ শেষ হয় ১-১ এর সমতায়।
দ্বিতীয় কোয়ার্টারে লড়াই হয়েছে
সমানে সমান। গোলের দেখা পায়নি কেউই। তৃতীয় কোয়ার্টারের মাঝামাঝি সময়ে (৩৯ মিনিটে) কনা
আক্তারের ফিল্ড গোলে এগিয়ে যায় বাংলাদেশ। শেষ পর্যন্ত ২-১ গোলের জয় নিয়েই মূলপর্বে
খেলার উল্লাসে মাতে জাহিদ হোসেন রাজুর দল।
দেশের ক্রীড়া ইতিহাসে পুরুষ হকি
দলের দীর্ঘ ঐতিহ্য থাকলেও নারী হকির বিষয়টি সবসময়ই ছিল উপেক্ষিত। এবারই প্রথম বাংলাদেশ
হকি ফেডারেশনের (বাহফে) উদ্যোগে মেয়েদের সিনিয়র দল গঠন করা হয়। প্রথমবার আন্তর্জাতিক
টুর্নামেন্ট খেলতে নেমেই অর্পিতারা যে অভাবনীয় সাফল্য এনে দিয়েছেন, তা দেশের নারী ক্রীড়াঙ্গনে
এক নতুন যুগের সূচনা করল।
ম্যাচসেরার পুরস্কার নিচ্ছেন বাংলাদেশের তন্নি খাতুন। ছবি : এশিয়ান হকি ফেডারেশন
বাংলাদেশের মেয়েরা বয়সভিত্তিক পর্যায়ে
আন্তর্জাতিক হকিতে অংশ নিলেও জাতীয় দল কখনোই গঠন হয়নি। তাই এই সফরটি ছিল ঐতিহাসিক।
অথচ বাহফে এই সফরে দলটিকে পাঠায় অনেকটা চুপিসারেই। কেননা দলটিকে নিয়ে কোনো সংবাদ সম্মেলনের
আয়োজনও করেনি তারা রহস্যজনকভাবে!
এই নারী দলটি যেভাবে গঠিত হয়, সেটা
জানা যাক। প্রাথমিকভাবে বাহফে বিকেএসপিতে জাতীয় ক্যাম্পের জন্য ৩৭ খেলোয়াড়কে ডাকে।
পরে তা কমিয়ে ২৬ জন করা হয়। ক্যাম্পে বিকেএসপির খেলোয়াড়দের পাশাপাশি ব্র্যাক ব্যাংক
অপরাজেয় আলো টুর্নামেন্টসহ বাইরে থেকে নির্বাচিত ১১ খেলোয়াড়ও ছিল। দুই মাস প্রশিক্ষণের
পর, ১৮ সদস্যের দল গঠন করা হয়। এর মধ্যে ১৪ জনই বিকেএসপির এবং বাকি চার জন বাইরের।
বাংলাদেশ জাতীয় নারী হকি দল : অর্পিতা পাল, হিমাদ্রি বড়ুয়া সুখ, নীলাদ্রি বড়ুয়া
নীল, রিয়াশা আক্তার ঋষি, নিনিশেন রাখাইন, তন্নি খাতুন, ধানুচিং মারমা, শারিকা সাফা
রিমন, ফাতেমা তুজ-জোহরা, আইরিন আক্তার রিয়া, নাদিরা তালুকদার এমা, কনা আক্তার, জাকিয়া
আফরোজ লিমা, মহুয়া, সানজিদা আক্তার মনি, রিতু আক্তার, ফারদিয়া আক্তার রাত্রি ও নাদিরা।