যাদের হয়ে ছয় মৌসুম মাঠ মাতিয়েছেন, সেই মোহামেডানের জালেই বল পাঠিয়ে গোল উদযাপন আবাহনীর সুলেমান দিয়াবাতের। ছবি : প্রবা ফটো
চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীদের হারানোর চিত্তসুখই আলাদা। আর তারা যদি হয় বর্তমান চ্যাম্পিয়ন, তাহলে তো কোনো কথাই নেই! ঢাকা আবাহনী সেই দ্বিগুণ অনুভূতিই পেয়েছে শুক্রবার। বাংলাদেশ ফুটবল লিগে তারা এক কঠিন লড়াইয়ে তুলে নিয়েছে কাঙ্খিত জয়, সেটা ‘ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট’ খ্যাত মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবকে ২-১ গোলে হারিয়ে। অথচ কুমিল্লার শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হাইভোল্টেজ এই ম্যাচের শুরুতে ১-০ গোলে পিছিয়ে ছিল ‘দ্য স্কাই ব্লু ব্রিগেড’ খ্যাত আবাহনী। জয়ী দলের মিরাজুল ইসলাম এবং সুলেমান দিয়াবাতে এবং বিজিত দলের মোজাফফরভ ১টি করে গোল করেন।
এছাড়া মানিকগঞ্জের শহীদ মিরাজ-তপন স্টেডিয়ামে
ফকিরেরপুল ইয়ংমেন্স ক্লাবকে ২-০ গোলে হারায় ব্রাদার্স ইউনিয়ন এবং গাজীপুরের শহীদ বরকত
স্টেডিয়ামে পিডব্লিউডি স্পোর্টস ক্লাব একই ব্যবধানে হারায় রহমতগঞ্জ মুসলিম ফ্রেন্ডস
সোসাইটিকে।
২৭
দিন বিরতি শেষে মাঠে ফিরেছে লিগ। তিন ভেন্যুতে খেলা হলেও সবার দৃষ্টি ছিল ‘ঢাকা ডার্বি’তে।
গত লিগের চ্যাম্পিয়ন মোহামেডান এবার ধুকছে শুরু থেকেই। আগের ১১ ম্যাচে মাত্র ২ জয়ে
১১ পয়েন্ট নিয়ে তারা এ ম্যাচ শুরু করেছিল ছয়ে থেকে। এই ম্যাচ থেকে পয়েন্ট না পাওয়ায়
তাদের নেমে যেতে হয়েছে ১০ দলের লিগ টেবিলের সাতে। পক্ষান্তরে জয়ের ধারা অব্যাহত
রেখে আবাহনী উঠে গেছে পয়েন্ট টেবিলের দুইয়ে। ১২ ম্যাচে এটি তাদের ষষ্ঠ জয়, ২২ পয়েন্ট
তাদের। ব্রাদার্স ১৩ পয়েন্টে ছয় নম্বরে আর পিডব্লিউডি ১০ পয়েন্টে ৮ নম্বরে। ফকিরেরপুলেরও
পয়েন্ট দশ তবে গোল ব্যবধানে তারা নয় নম্বরে আর রহমতগঞ্জ ১৮ পয়েন্টে চার নম্বরে।
এই
জয়ের মধুর প্রতিশোধও নিল আবাহনী। কেননা লিগের প্রথম লেগে মোহামেডানের কাছে ৩-২ গোলে
হেরেছিল তারা। এই জয়ে তিন বছর পর চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীদের হারালোর মধুর স্বাদ পেল তারা।
পক্ষান্তরে টানা অষ্টম ম্যাচে জয়হীন আলফাজ আহমেদের শিষ্যরা। ফলে এটা পরিস্কার- লিগের
শিরোপাটা এবার আর ধরে রাখতে পারছে না তারা। পেশাদার লিগে ৩৪তম লড়াইয়ে আবাহনী পেলো ১৫তম
জয়। তাতে মোহামেডানকে সেই খতিয়ানে আরও পিছিয়ে পড়তে হলো।
কুমিল্লায়
খেলার তৃতীয় মিনিটে অলিম্পিক গোলে মোহামেডানকে এগিয়ে নিয়েছিলেন মোজাফফরভ। কিন্তু ধাক্কা
সামলে ধীরে ধীরে প্রতিরোধ গড়ে ঘুরে দাঁড়ায় ধানমণ্ডির ক্লাব আবাহনী।
আবাহনীর
দুটি গোলেই অবদান এমেকার। ১৭ মিনিটে তার অ্যাসিস্টে গোল করে ম্যাচকে সমতায় আনেন মিরাজুল
ইসলাম। আর ৬৬ মিনিটে তার একটি ক্রস থেকে বক্সের ভেতর বল পেয়ে ঘুরেই দুর্দান্ত গোল করেন
সুলেমান দিয়াবাতে। ৬৬ মিনিটে আরও একটি দুর্দান্ত পাসে আবাহনীকে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ
করে দেন এমেকা। তিন ফুটবলারকে কাটিয়ে কাটব্যাকে সুলেমান দিয়াবাতের কাছে বল পাঠান তিনি।
১৮০ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে ঘুরে দুই ফুটবলারের মাঝখান দিয়ে নিজের সাবেক ক্লাবের বিপক্ষে
প্রথম গোলটি করেন দিয়াবাতে।
বিরতির
পরপরই নিজ দলের গোলরক্ষক মিতুল মারমার সঙ্গে সংঘর্ষে অ্যাম্বুলেন্সে করে মাঠ ছাড়তে
হয় আবাহনীর ডিফেন্ডার হাসান মুরাদকে। একটি বল বিপদমুক্ত করতে লাফিয়েছিলেন দুজনই। মিতুল
সেটা লুফে নিয়ে পড়ে যান মুরাদের ওপরে। এতে চোয়ালে মারাত্মক আঘাত পেলে সঙ্গে সঙ্গে মুরাদকে
হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
এবার
আসা যাক সুলেমান দিয়াবাতের প্রসেঙ্গ। মোহামেডানের হয়ে আবাহনীর বিপক্ষেই রয়েছে তার অসংখ্য
গোল, গতকাল সেই মোহামেডানের বিপক্ষে প্রথম গোল করেন দিয়াবাতে। ফলে দিয়াবাতেকে ‘ঘরের
শত্রু বিভীষণ’ মনে করতেই পারে সাদা-কালো শিবির। তাদের জন্য ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘাঁ’ ছিল
অতিরিক্ত সময়ের ষষ্ঠ মিনিটে তাদের ডিফেন্ডার শাকিল আহাদ যখন লাল কার্ড দেখে মাঠ থেকে
বেরিয়ে যান!
গতকালকের
আবাহনী-মোহামেডান
ম্যাচটি কিছু মানুষের জন্য অন্য কারণেও আবেগের ছিল। ম্যাচ কমিশনার হিসেবে এটিই ছিল
মনসুর আজাদের শেষ ম্যাচ এবং এদিনই অবসর নেন সাবেক ফিফা রেফারি ভুবন মোহন তরফদার। ভিআইপি
বক্সে এই ম্যাচ উপভোগ করতে দেখা গেছে বাফুফের দুই কোচ গোলাম রব্বানী ছোটন ও হাসান আল
মামুনকে।
মোহামেডানের
জার্সিতে তো বটেই, বাংলাদেশের ঘরোয়া ফুটবলের ইতিহাসেই বিদেশী ফুটবলার হিসেবে লিগে ও
সব ধরনের প্রতিযোগিতায় সবচেয়ে বেশি গোলের মালিক দিয়াবাতে। যিনি মোহামেডানকে ২২ বছর
পর লিগ ও ১৪ বছর পর ফেডারেশন কাপের শিরোপা জেতাতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন, দলের
অধিনায়কত্বের গুরুদায়িত্ব সামলেছেন, অন্য ক্লাবের লোভনীয় অফার থাকার পরও যিনি সাদা-কালো
শিবিরের মায়া ছেড়ে অন্য কোথাও যাননি, সেই দিয়াবাতেকে ছুড়ে ফেলেছিল মোহামেডান, গত মৌসুমেই।
আফ্রিকার
দেশ মালির অধিবাসী দিয়াবাতে। জন্ম ২৩ মার্চ, ১৯৯১। ধর্ম-ইসলাম। উচ্চতা কাঁটায় কাঁটায়
৬ ফুট। জার্সি নম্বর ১০। টানা ছয় মৌসুম খেলেছেন ‘ব্ল্যাক এ্যান্ড হোয়াইট’ খ্যাত মোহামেডানে।
লিগে তিনি দলটির হয়ে করেছেন ৯৬ গোল, তাও মাত্র ১১২ ম্যাচে! অবিশ্বাস্য স্কোরিং রেট।
২০২১-২২ মৌসুমে লিগে ২১ গোল করে লিগের টপস্কোরার হয়েছিলেন। এছাড়াও তিনবার হয়েছেন দ্বিতীয়
সর্বোচ্চ গোলদাতা।
সাদা-কালোর
হয়ে তিনি মোট ১১৩ গোল করেছেন, যা ক্লাবটির ইতিহাসে কোন বিদেশী ফুটবলারের সবচেয়ে বেশি
গোলের রেকর্ড। ফলে অনেক মোহামেডান অনুরাগী দিয়াবাতেকে গোলস্কোরিংয়ের বিচারে মোহামেডানের
সেরা বিদেশী ফুটবলার মনে করেন।
৬
বছর কাটিয়েছেন সাদা–কালোদের তাবুতে। পরিণত হয়েছিলেন ঘরের ছেলেতে। না
হওয়ারও কারণ ছিল না অবশ্য। ফেডারেশন কাপ ও লিগ শিরোপা জয়ের পেছনে তার অবদানই যে বড়
ছিল। সেই দিয়াবাতে এবারের মৌসুমে মোহামেডান ছেড়ে যোগ দেন চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আবাহনীতে।
তার মাধ্যমে আবাহনী যেন কাঁটা দিয়ে কাঁটা তুলল। প্রতিশোধ নিল প্রথম লেগে হারের।
পরিসংখ্যানে
আবাহনী-মোহামেডান ফুটবল দ্বৈরথ :
ম্যাচ ১৪১, আবাহনী জয় ৫১, মোহামেডান জয় ৪৯, ড্র ৩৫, পরিত্যক্ত ৫, ওয়াকওভারে সমাপ্তি
১, আবাহনী গোল ১৪২, মোহামেডান গোল ১৩৪।
আরকে/প্রবা