× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ক্ষোভের অনলে দগ্ধ সুমিতা

রুমেল খান

প্রকাশ : ০৯ এপ্রিল ২০২৬ ০৩:৩৩ এএম

আপডেট : ০৯ এপ্রিল ২০২৬ ১৮:০৬ পিএম

বাংলাদেশের এ্যাথলেটিক্সে নারীদের হার্ডলস ইভেন্টের জীবন্ত কিংবদন্তী সুমিতা রানী। ছবি : সুমিতা রানীর ফেসবুক

বাংলাদেশের এ্যাথলেটিক্সে নারীদের হার্ডলস ইভেন্টের জীবন্ত কিংবদন্তী সুমিতা রানী। ছবি : সুমিতা রানীর ফেসবুক

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসের সেরা-কিংবদন্তী অভিনেত্রীদের একজন সুমিতা দেবী। “সুমিতা” নামে আরেকজন আছেন। তবে তিনি অভিনেত্রী নন, ট্র্যাকের রাণী (হার্ডলার) তার নাম সুমিতা রানী দাস। সুমিতা দেবীর (১৯৩৬-২০০৪) সঙ্গে তার একটি মজার মিল আছে। তা হলো-সুমিতা দেবীর মতো সুমিতা রানীরও জন্মদিন একই তারিখে, ফেব্রুয়ারি!

এ্যাথলেটিক্স ক্যারিয়ারে সুমিতার আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সেরা সাফল্য এসএ গেমসে ৪টি রৌপ্য ও ২টি ব্রোঞ্জপদক জয়। ছবি : সুমিতা রানীর ফেসবুক

সুমিতা রানীর জন্ম নোয়াখালীর মাইজদীতে। এ্যাথলেটিক্স ক্যারিয়ারে সুমিতার আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সেরা সাফল্য এসএ গেমসে ২০০৬ সালে হার্ডলস রিলেতে রৌপ্যপদক, ২০১০ সালে হার্ডলস রিলেতে রৌপ্যপদক, ২০০৪ সালে হার্ডলস রিলেতে ব্রোঞ্জপদক জয়।

২০০০-২০২১ সাল পর্যন্ত খেলেছেন সুমিতা। বাংলাদেশ গেমসে দৌড়াতে গিয়ে কঠিন ইনজুরিতে পড়ে শেষ হয়ে যায় তার ক্যারিয়ার। ২০০৭-২০২৫ সাল পর্যন্ত দেশে-বিদেশে মোট ৬টি ট্রেনিং কোর্স করে এখন তিনি পুরোদস্তর কোচ এবং জাজ। ২০০৮ সাল থেকে বাংলাদেশ জেলে চাকরি করছেন।

বহু সাফল্যের সারথী সুমিতা মনে করেন তিনি জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য। কিন্তু বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করেছেন তার চেয়ে অযোগ্য অনেকেই রহস্যজনকভাবে এই পুরস্কারটি পেয়ে গেছে। কিন্তু একাধিকবার আবেদন করে আজও সেটি জোটেনি তার কপালে! নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেছেন প্রতিদিনের বাংলাদেশের সঙ্গে। 


২০০০ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত খেলেছেন সুমিতা।  বাংলাদেশ গেমসে দৌড়াতে গিয়ে কঠিন ইনজুরিতে পড়ে শেষ হয়ে যায় তার ক্যারিয়ার। ছবি : সুমিতা রানীর ফেসবুক

সুমিতা
জানান, ‘২০২৪ সালে মন্টু স্যার (এ্যাথলেটিক্স ফেডারেশনের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রকিব মন্টু) থাকতে জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কারের জন্য একবার আবেদন করেছিলাম। তখন আমি সিরিয়ালে পাঁচ নম্বরে ছিলাম। কিন্তু যুব ক্রীড়া মন্ত্রণালয় অন্যদের সিলেক্ট করলেও আমাকে করেনি। গত ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকারে আসার পর আবারও নতুন করে আবেদন করতে বলে ক্রীড়া মন্ত্রণালয়। এটা তারা ফেডারেশনগুলোকে জানিয়ে দেয়। কিন্তু আমার ফেডারেশন আমাকে খবরটা যথাসময়ে জানায়নি! তখন ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক শাহ আলম স্যার। ওই সময়টায় আমি জেলখানায় নির্বাচনকালীন ডিউটিতে ব্যস্ত। পরে একজনের মাধ্যমে জানলাম মোট ২৭ জন পুরস্কার পাবেন (২০২৫ সালের জন্য) এবং অ্যাথলেটিক্স ফেডারেশনের সুপারিশে তিনজন পুরস্কার পাবেন, নিয়ে পত্রিকায় নিউজও হয়ে গেছে।

নিয়ে সুমিতার অভিযোগ হচ্ছে, যারা যোগ্য, দেশের জন্য খেলেছে, কষ্ট করেছে এবং পদক পেয়েছে, তারা পুরস্কার পাক। পেলে আমার কোনো আপত্তি-আফসোস নেই। কিন্তু যারা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কোনো পদকই জেতেনি, তারা যদি জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার পেয়ে যায়, তাহলে এটা অনেক দুঃখজনক।


সিনিয়র পর্যায়ে ৩৬টি স্বর্ণপদক জিতেছেন সুমিতা রানী। ছবি : সুমিতা রানীর ফেসবুক

২৭ জনকে প্রাথমিকভাবে মনোনীতদের মধ্যে সুমিতা ছিলেন না। এরপর ক্রীড়া মন্ত্রণালয় ২০২৬ সালের জন্য আবারও নতুন করে আবেদন করার সময়সীমা বেঁধে দেয়, যা শেষ হয় গত এপ্রিল। এবার অবশ্য সুমিতা আবেদনপত্র জমা দিতে পেরেছেন গত ২৮ মার্চ। 

তার আগে ফেডারেশনে গিয়ে সুমিতা সাধারণ সম্পাদকের কাছে জানতে চেয়েছিলেন কোন প্রক্রিয়ায় তিন অ্যাথলেটকে ২০২৫ সালের জন্য সিলেক্ট করা হলো। জবাবে শাহ আলম নাকি জানিয়েছেন, যারা মনোনীত হয়েছে, তাদের কেউ কেউ ফেডারেশনের কাছ থেকে কোনো প্রত্যয়নপত্র নেয়নি এবং ফেডারেশনের মাধ্যমে আবেদনও করেনি। সরাসরি ক্রীড়া মন্ত্রণালয় বরাবর আবেদন করেছে। আর সিলেকশনের বিষয়ে ফেডারেশন কিছু জানে না। ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের যারা যাচাই-বাছাই করেছে, তারাই বলতে পারবে। এরপর সুমিতা ফেডারেশনের কাছ থেকে একটি প্রত্যয়নপত্র নিজের নামে লিখিয়ে নেন এবং আবেদনপত্রের সঙ্গে সেটি যুক্ত করে ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে গিয়ে সবকিছু জমা দেন।


২০০৭ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত দেশে-বিদেশে মোট ৬টি ট্রেনিং কোর্স করে এখন তিনি পুরোদস্তর কোচ এবং জাজ। ছবি : সুমিতা রানীর ফেসবুক

সুমিতা তীব্র ক্ষোভমিশ্রিত কন্ঠে বলেন, ‘কারোর নাম বলতে চাই না। কিন্তু এটাও না বলে পারছি না যে, সিনিয়র এক অ্যাথলেট আবেদন করেছিলেন, যিনি ইন্দো-বাংলাদেশ বাংলা গেমসের মতো দ্বিপাক্ষিক আঞ্চলিক প্রতিযোগিতায় জেতা স্বর্ণপদককে আন্তর্জাতিক পদক বলে চালিয়ে দিয়েছেন এবং ক্যারিয়ারে নাকি ৭০টা স্বর্ণপদক জিতেছেন। অথচ ভালোমতোই জানি তিনি এত পদক জেতেননি!’ সুমিতা আরও যোগ করেন, ‘প্রায় / বছর আগে ধরনের আরেক অ্যাথলেটকেও জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল, যিনি কোনো আন্তর্জাতিক পদক জেতেননি।

আরেকটি অভিযোগও করেন সুমিতা। সেটা অঞ্চলপ্রীতি নিয়ে, ‘এক ফেডারেশনের কোনো কর্মকর্তার জেলার সঙ্গে এক অ্যাথলেটের জেলার মিল থাকায় সেই অ্যাথলেটকে অনেক গুরুত্ব-সমর্থন দেওয়া হচ্ছে, এমনটাও কিন্তু হচ্ছে।

সাবেক সিনিয়র সতীর্থ আল-আমিন এবং সাবেক দ্রুততম মানবী নাজমুন নাহার বিউটির প্রতি কৃতজ্ঞতাও জানান সুমিতা, ‘সাবেক লং জাম্পার বর্তমানে কোচ আল-আমিনকে অনেক ধন্যবাদ। প্রথমে ওনার মাধ্যমেই আবেদন করার সময়সীমা পত্রিকায় নিউজ হওয়ার বিষয়টা জানতে পারি। সেদিনই বিকেলে বিউটি আপু- ফোন করে আমাকে জানান। অথচ এটা আমাকে জানানো উচিত ছিল ফেডারেশনের। বিউটি আপু আমাকে বলেছেন- তোদের যোগ্যতা থাকার পরও কিভাবে অন্যরা জাতীয় পুরস্কার পাচ্ছে?’  


২০০৮ সাল থেকে বাংলাদেশ জেলে চাকরি করছেন। এখন তিনি বাংলাদেশ জেল অ্যাথলেটিক্স দলের কোচ। ছবি : সুমিতা রানীর ফেসবুক

এরপর আরেকটা বোমা ফাটান সুমিতা, ‘একজনকে চিনি, যিনি যতবারই ফেডারেশনের একটি পদে আসীন হয়েছেন, ততবারই জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার নিয়ে কারচুপি হয়েছে! তার সময়কালে বেশিরভাগ যোগ্য অ্যাথলেটরাই পুরস্কার পায়নি। রেকর্ডস চেক করলেই এর সত্যতা পাবেন।

কদিন আগে সুমিতাকে ফোন করেন তার সমসাময়িক সতীর্থ, ২০০৬ এসএ গেমসে স্বর্ণজয়ী তায়কোয়ান্দোকা মিজানুর রহমান। তিনি সুমিতাকে যা বলেছিলেন, সেটি আসলে অনেক ক্রীড়ামোদীদের মনের কথা, ‘কিরে সুমিতা, এবার কি তুই জাতীয় পুরস্কার পাচ্ছিস? কি বললি, অ্যাপ্লাই করার পরও তোর নাম আসেনি? কিন্তু তোকে অ্যাপ্লাই করতে হবে কেন?’ ক্রীড়ামোদীরা জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কারের জন্য আবেদনের প্রক্রিয়া নিয়ে সবসময়ই প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের কথা, একজন ক্রীড়াবিদকে পুরস্কার পাওয়ার জন্য রাষ্ট্রের কাছে আবেদন করতে হবে কেন? রাষ্ট্রেরই তো উচিত যোগ্য ক্রীড়াবিদদের খুঁজে পুরস্কার দিয়ে তাকে সম্মানিত-মূল্যায়ন করা। অনেকের দৃষ্টিতেই এই বিতর্কিত ত্রুটিপূর্ণ নিয়মের কি সংস্কার করা যায় না? সেই সদিচ্ছা কি কখনো হবে ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের?


বহু সাফল্যের সারথী সুমিতা মনে করেন তিনি জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য। ছবি : সুমিতা রানীর ফেসবুক

সুমিতা যখন জানালেন, পুরস্কার পেতে হলে ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে আবেদন করাটাই নিয়ম। তখন মিজানুর বলেন, ‘কই, আমি তো আবেদন করিনি। বরং ফেডারেশনই তো আমার নাম মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে।মিজানুরের এই কথাতেই স্পষ্ট (যেটা নিয়ে ফেসবুকে অসংখ্য ক্রীড়াপ্রেমী সমালোচনায় মুখর)-জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার পাওয়াটা নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট ফেডারেশনের কারোর সঙ্গে অঞ্চলে মিল থাকা, সুসম্পর্ক তাদের মর্জির ওপর! সেক্ষেত্রে সফলতা-যোগ্যতা হচ্ছে গৌণ বিষয়। আক্ষেপের কণ্ঠের সুমিতার ভাষ্য, ‘অনেক বছর ধরে ফেডারেশনের দ্বারা মূল্যায়িত না হয়ে জহির রায়হানদের মতো প্লেয়াররা বিদেশে চলে যেতে বাধ্য হচ্ছে, যা ভীষণ দুঃখজনক। এভাবে চললে আর অ্যাথলেট পাওয়া যাবে না। ফলে ফেডারেশনই ধ্বংস হয়ে যাবে। ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হকের ওপর আমার অনেক বিশ্বাস-আস্থা। তাকে অনুরোধ করব-তিনি এমনটা যেন হতে না দেন এবং ফেডারেশনের মাধ্যমে লবিং করে নিজ থেকে আবেদন করে জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার দেয়ার নিয়মটা যেন অবশ্যই পরিবর্তন করেন।

ঢাকা জাতীয় স্টেডিয়ামে সুুমিতা রানীর সঙ্গে প্রতিবেদক। ছবি : সংগৃহীত

সিনিয়র পর্যায়ে ৩৬টি স্বর্ণপদক জেতা সুমিতা সবশেষে বলেন, ‘সত্যি কথা বলার কারণে হয়তো আমাকে কোনদিনই জাতীয় পুরস্কার দেয়া হবে না। কিন্তু তাতে কোনো আফসোস নেই।সুমিতা প্রতিবাদী স্পষ্টভাষী হওয়ার কারণেই কি ফেডারেশন তার প্রতি প্রসন্ন নয়? এজন্যই কি বছরের পর বছর ধরে প্রাপ্য সম্মান-মর্যাদা পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন? আর কতদিন এমনটা চলবে? ফেডারেশনের কি সুমতি হবে সুমিতার প্রতি? সেটা সময়ই বলে দেবে। 

আরকে/প্রবা 

   

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা