ভিয়েতনামকে হারিয়ে এশিয়া কাপে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক স্বর্ণ
রুমেল খান
প্রকাশ : ২৭ মার্চ ২০২৬ ২২:৪৪ পিএম
পুরুষ কম্পাউন্ড দল সোনা জিতেছে এশিয়া কাপে। আনন্দটা উদযাপন করেছেন সবাই মিলে। ছবি : বাংলাদেশ আরচারি ফেডারেশন
আগেরদিন
ফুটবলে ভিয়েতনামের কাছে ৩ গোলে হেরেছিল বাংলাদেশ। তবে শুক্রবার (২৭ মার্চ) ফুটবলের সেই হারের
বদলা বাংলাদেশ নিয়েছে তীরবাজিতে। থাইল্যান্ডের ব্যাংককে এশিয়া কাপ আরচারিতে কম্পাউন্ড
দলগত পুরুষ বিভাগে সেই ভিয়েতনামকে হারিয়েই স্বর্ণপদক অর্জন করেছে লাল-সবুজের তীরন্দাজরা।
হিমু
বাছাড়, ঐশ্বর্য রহমান ও নেওয়াজ আহমেদের কম্পাউন্ড দল অসাধারণ নৈপুণ্য প্রদর্শন করেন।
এর আগে মালয়েশিয়াকে হারিয়ে সেমিফাইনালে ওঠে বাংলাদেশ পুরুষ কম্পাউন্ড দল। এরপর ফাইনালে
ওঠার লড়াইয়ে ভুটানকে হারায় ২৩২-২২৮ স্কোরে। ফাইনালে ভিয়েতনামকে ২৩১-২২৫ স্কোরে হারায়
কম্পাউন্ড দল। তাতে এ প্রতিযোগিতায় সোনা জেতে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ
পুরুষ কম্পাউন্ড দলের গড় স্কোর ৯.৬২। সবচেয়ে ভালো স্কোর হিমু বাছাড়ের (৯.৭৫)।
কম্পাউন্ড
পুরুষ দলীয় ইভেন্টে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় এটাই বাংলাদেশের প্রথম স্বর্ণপদক। এর
আগে কয়েকবার ফাইনালে উঠলেও সফল হতে পারেনি তারা৷ এবার কাঙ্ক্ষিত সেই
সফলতা এনে দিলেন হিমু-ঐশর্য-রাকিবরা।
আসরে
একক এবং মিশ্র-কোনো ইভেন্টেই বাংলাদেশ সেমিফাইনালের গণ্ডি পার
হতে না পারায় সমর্থকদের মধ্যে কিছুটা হতাশা কাজ করছিল। তবে কম্পাউন্ড দলগত বিভাগের
এই সাফল্য পুরো দলের মনোবল চাঙ্গা করে দেয়। 
হিমু,
রাকিব ও ঐশ্বর্যের এই জয় প্রমাণ করেছে যে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের আরচাররা
এখন যেকোনো শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে চ্যালেঞ্জ করার সক্ষমতা রাখে। ব্যাংককের মাঠে বাংলাদেশের
এই চ্যাম্পিয়ন হওয়ার খবর ক্রীড়াঙ্গনে এক নতুন উদ্দীপনার সৃষ্টি করেছে। বিজয়ী আরচারদের
এই অভাবনীয় সাফল্যকে দেশের ক্রীড়া বিশ্লেষকরা বাংলাদেশ আরচারি ফেডারেশনের সঠিক পরিকল্পনা
ও খেলোয়াড়দের কঠোর পরিশ্রমের ফসল হিসেবে দেখছেন।
এদিকে
এই সাফল্যের পর বাংলাদেশ আরচারি ফেডারেশন এবং এশিয়ান আরচারি ফেডারেশনের সভাপতি কাজী
রাজিব উদ্দিন আহমেদ চপল পদকজয়ীদের জন্য আর্থিক পুরস্কারের ঘোষণা দিয়েছেন।
কম্পাউন্ড
বিভাগে সবশেষ ২০২১ সালে চীনের গুয়াংজুতে অনুষ্ঠিত এশিয়া কাপের লেগ ওয়ানেও রুপা পেয়েছিল
বাংলাদেশ। দলগত বিভাগে সেবার সেরা হওয়ার লড়াইয়ে দল হেরেছিল দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে।
এই
স্বর্ণপদক হিমু, ঐশ্বর্য ও রাকিব তিন আরচারেরই প্রথম আন্তর্জাতিক স্বর্ণ। এর আগে হিমু
দক্ষিণ কোরিয়া ও ইরাকে রুপা জয়ী দলে ছিলেন, আর রাকিব ইরাক আসরে রুপা জিতেছিলেন।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রথম পদক, তাও আবার স্বর্ণ!
এ নিয়ে অনুভূতি কি? ঐশ্বর্য রহমান বলেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ, খুবই ভালো। আল্লাহির কাছে
লাখ লাখ শুকরিয়া স্বর্ণপদক পেয়েছি। এবং সব থেকে ভালো বিষয় হচ্ছে-প্র্যাকটিসটা ভালো
হয়েছিল। বিকেএসপিতে প্র্যাকটিস করেছিলাম। এখানে এসে যেটা হয়েছে, ভালোই হয়েছে। তবে আরেকটু
ভালো হতে পারতো। কেননা এর থেকেও বেশি স্কোর দেশে করেছি। চেষ্টা করবো পরবর্তীতে আরও
ভালো করতে। আমার টিমমেটরাও অনেক ভালো করেছে, তাদের জন্যই পদক জিততে পেরেছি। আমার সাফল্যের
জন্য ধন্যবাদ জানাতে চাই বিকেএসপি এবং ফেডারেশনকে।’
ভিয়েতনামের
বিপক্ষে ফাইনালে জয়ের কৌশল প্রসঙ্গে ঐশর্য বলেন, ‘প্র্যাকটিস থেকে শুরু করে অন্যান্য
যে ম্যাচগুলো আমরা তিন জন খেলেছি, প্রতিটিতেই আমাদের পারস্পরিক বোঝাপড়াটা দারুণ ছিল।
আমরা প্রত্যেকেই প্রত্যেককে ডিরেকশন দিয়েছি। যা যেটা প্রয়োজন, সে অনুযায়ী কথা বলেছি।
সমস্যা শেয়ার করেছি এবং সমস্যাগুলো আমরা নিজেরা নিজেরাই সমাধান করার চেষ্টা করেছি।
এবং এছাড়া আমরা প্র্যাকটিসের সময় সর্বোচ্চ স্কোর করার চেষ্টা করেছি। বিশেষ করে একজন
আরচার আটটা করে তীর মারে। আমরা ৮০-এর মধ্যে ৮০ স্কোর করারই চেষ্টা করেছি। এক্ষেত্রে
আমাদের অনুশীলনটা খুবই ভালো মানের হয়েছে। আমার দুই টিমমেট-তারা দুজনেই এর আগে কয়েকটা
ইন্টারন্যাশনাল কয়েকটা টুর্নামেন্ট খেলেছে। এটা ওদের জন্য সব থেকে ভালো হয়েছে। কয়েকটা
গেম খেলার কারণে ওদের অভিজ্ঞতাটা অনেক ওপরের লেভেলে আছে, যেটা আমাদের এখানে অনেক কাজে
দিয়েছে। কেননা ফাইনাল পোডিয়ামে যে খেলাটা হয়, সেটা অভিজ্ঞতা না থাকলে ভালো খেলা সম্ভব
নয়। আমি মনে করি অভিজ্ঞতা এবং টিম বন্ডিংটা কাজে দিয়েছে আমাদের সাফল্যের ক্ষেত্রে।’
স্বর্ণজয়ী
আরেক আরচার হিমু বাছাড় বলেন, ‘প্রথমেই ধন্যবাদ জানাবো বাংলাদেশ বিমানবাহিনীকে।
কেননা শুরু থেকেই তারা আমাকে সব ধরনের সাপোর্ট দিয়েছে। এটা অকল্পনীয়। ফেডারেশনকেও অনেক
ধন্যবাদ। তারপর বিকেএসপিকেও ধন্যবাদ, যেখান থেকে আমার আরচারির যাত্রা শুরু। এ পর্যন্ত
জাতীয় দলে আসার পেছনে তাদের অবদান অনস্বীকার্য। স্বর্ণপদক অর্জনের অনুভূতিটা আসলে অসাধারণ।
আমার স্বপ্ন ছিল আন্তর্জাতিক স্বর্ণপদক অর্জন করার, দেশের পতাকা সব দেশের সামনে তুলে
ধরার এবং বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত সবার সামনে বাজিয়ে শোনানোর।’
ম্যাচের
কোন মুহূর্তটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল? হিমুর ভাষ্য, ‘যেহেতু আমি প্রথমেই শুট করি,
সেহেতু স্টার্টিং পয়েন্টটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সবসময়ই চেষ্টা করেছি যেন শুরুটা ভালো
করে দিয়ে আসতে পারি। সেটা করতে পারলে আমার টিমমেটরা অনেক আত্মবিশ্বাস পাবে।’
ভবিষ্যত্যের
লক্ষ্য? ‘আমাদের ইভেন্টটা যেহেতু অলিম্পিকে চালু হয়েছে, তাই চাইবো অলিম্পিকে খেলতে।
তবে এশিয়ান গেমসও বরাবরই অনেক গুরুত্বপূর্ণ।’ হিমু বলেন।
বাংলাদেশ
দলের জার্মান কোচ মার্টিন ফ্রেডরিখ বলেন, ‘এই টুর্নামেন্টের আগে আমাদের দলের খুব ভালো
প্রস্তুতি হেয়েছিল। অনুশীলন ভালো করেছে। টিম বন্ডিংটা ছিল দারুণ। আমাদের আত্মবিশ্বাস
ছিল-আমরা অবশ্যই কিছু একটা অর্জন করতে পারবো। এবং শেষ পর্যন্ত সেটাই হয়েছে।’ 
মার্টিন
আরও বলেন, ‘এই সাফল্যে খুবই রোমাঞ্চিত বোধ করছি। ছেলেরা দারুণ করেছে। ম্যাচের শুরু
থেকেই তারা ভালো খেলেছে। এবং শেষ পর্যন্ত সেটা ধরে রেখেছে। অন্তিম মুহূর্ত পর্যন্ত
প্রতিপক্ষ দলকে কোনো সুযোগ বা জায়গা দেয়নি। সবমিলিয়ে আমি দারুণ খুশি।’
সবশেষে
মার্টিন বলেন, ‘আগামী ২০২৮ লস অ্যাঞ্জেলস অলিম্পিকে আরচারি ইভেন্ট কম্পাউন্ড থাকছে।
এটা আমাদের জন্য সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। এটাকে কাজে লাগাতে হবে। আগামী সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে
আমাদের একাধিক আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট (ওয়ার্ল্ড কাপ, এশিয়া কাপ) খেলতে হবে। সেগুলো
নিয়ে আমাদের ব্যাপক প্রস্তুতি নিতে হবে।’
আরকে/প্রবা