× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

এক জীবনে এগারো পরিচয়ের বিস্ময়

হাফিজ : ফুটবল মাঠ পেরিয়ে সংসদের শীর্ষে

রুমেল খান

প্রকাশ : ১২ মার্চ ২০২৬ ২০:০৯ পিএম

আপডেট : ১৩ মার্চ ২০২৬ ১৭:০৫ পিএম

হাফিজ : ফুটবল মাঠ পেরিয়ে সংসদের শীর্ষে

একটা মানুষ কি তার একজীবনে অনেক কিছু হতে পারে? কয়টা পরিচয়ে পরিচিত হতে পারে সেÑদু’টি, তিনটি, চারটি? কিংবা তারও বেশি? কিন্তু যখন শুনবেন বাংলাদেশের এক কৃতী সন্তান, কীর্তিমান পুরুষ ১১টি পরিচয়ে পরিচিত, তখন বিস্ময়ে হতবাক হওয়া আর আর করার কিছু থাকে না। যার কথা বলা হচ্ছে, একই অঙ্গে অনেক রূপের (আসলে গুণের) অধিকারী তিনি। ফুটবলার, অ্যাথলেট, দ্রুততম মানব, বীর মুক্তিযোদ্ধা, বাফুফের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক, এএফসির সহসভাপতি, ফিফার আপিল ও ডিসিপ্লিনারি কমিটির সদস্য, রাজনীতিবিদ ও মন্ত্রী। বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) আরেকটি নতুন পরিচয়ে পরিচিত হয়েছেন তিনি। চলমান জাতীয় সংসদের (ত্রয়োদশ) স্পিকার নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয়বাদী দলের নির্বাচিত এই সংসদ সদস্য। তাঁর নাম মেজর হাফিজ উদ্দিন আহমেদ (অব) বীরবিক্রম। 


এই প্রজন্মের কাছে মেজর হাফিজ শুধুই একজন রাজনীতিবিদ। তাদের বেশিরভাগই জানে না, তিনি ছিলেন তাঁর সময়ের কিংবদন্তীতুল্য এক ফুটবলার। বাংলাদেশের ইতিহাসে ক্রীড়াঙ্গনের অনেকেই রাজনীতিতে এসেছেন। হাফিজও তাদের একজন। কিন্তু অন্যরা যা হতে পারেননি, তাই হয়েছেন হাফিজ। আজ তিনি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের স্পিকার। এমন অনন্য অর্জন আর কারোর নেই। সাবেক ক্রীড়াবিদ স্পিকার নির্বাচিত হওয়ায় ফুটবলসহ পুরো ক্রীড়াঙ্গনে চলছে উচ্ছ্বাস। 

স্বাধীনতার পর মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের জার্সিতে তিনি দেখিয়েছেন গোলের জাদু। মোহামেডানের হয়ে লিগে সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছেন। তবে কেবল ফুটবল নয়, অ্যাথলেটিক্সেও তিনি ছিলেন সমান উজ্জ্বল। একাধিকবার হয়েছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের দ্রুততম মানব। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রীড়াক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সম্মান ‘ব্লু’ পদকও শোভা পেয়েছে তাঁর ঝুলিতে।


২০০৪ সালে ফুটবলে তাঁর অনন্য অবদানের জন্য ফিফা তাঁকে ‘অর্ডার অফ মেরিট’ পদকে ভূষিত করে, যা বাংলাদেশের কোনো ফুটবল ব্যক্তিত্বের জন্য সর্বোচ্চ সম্মান। সাবেক ফুটবলারদের সংগঠন সোনালী অতীত ক্লাবের অন্যতম উদ্যোক্তা ও প্রতিষ্ঠাতাও তিনি।

নব্বইয়ের দশকের পর থেকে রাজনীতিতে আরও বেশি সক্রিয় হন হাফিজ। সংসদ সদস্য ও মন্ত্রিত্বের দায়িত্ব পালন করেছেন একাধিকবার। তবে ২০২৬ সালের এই নতুন যাত্রাটি সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী। অতীতে অনেক ক্রীড়াবিদ বা ক্রীড়া সংগঠক সংসদ সদস্য কিংবা ক্রীড়ামন্ত্রী হয়েছেন, কিন্তু স্পিকারের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সাংবিধানিক পদে বসার নজির এর আগে ছিল না। মাঠের সেই ‘দ্রুততম মানব’ আজ জাতীয় সংসদের অভিভাবক।


১৯৭১ সালে হাফিজের ‘স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল’-এর হয়ে খেলার কথা ছিল। কিন্তু তা না করে তিনি অস্ত্র হাতে রণাঙ্গনে ঝাঁপিয়ে পড়েন পাকিস্তানি  সেনাদের বিরুদ্ধে। যুদ্ধের ময়দানে দেখিয়েছেন অপরিসীম সাহস ও বীরত্ব। আর এ কারণে তাঁকে সম্মানিত করা হয়েছে ‘বীর বিক্রম’ খেতাবে। ফুটবল মাঠে ছিলেন নিখাদ স্ট্রাইকার। ছিলেন প্রতিপক্ষের কাছে রীতিমত ত্রাস। বলের ওপর ছিল দারুণ নিয়ন্ত্রণ। বল নিয়ে ড্রিবলিং করে গোল করা কিংবা গোল করানোর প্রতি ছিল তাঁর ঝোঁক। যেসব গুণাবলী থাকলে একজন পরিপূর্ণ ফরোয়ার্ড হওয়া যায়, তার কোনো কিছুরই কমতি ছিল না।


হাফিজের জন্ম বরিশালে, ১৯৪৪ সালের ২৯ অক্টোবর। ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলার অনুরাগী। যদিও তাতে তার পরিবারের মোটেও সায় ছিল না। দুর্দান্ত ভালোবাসার কারণে পড়ালেখার পাশাপাশি খেলাধুলায় লেগে থাকেন। তাঁর এক কাজিন ছিলেন দেলোয়ার। ফুটবলার হিসেবে তিনি বরিশালে ভীষণ জনপ্রিয় ছিলেন। এ কারণে ফুটবল হয়ে ওঠে তাঁর প্রধান আকর্ষণ। এছাড়া খ্যাতিমান ফুটবলার গজনবী এবং কবিরও তাঁর প্রেরণার অন্যতম উৎস। ৫ ফুট ৮ ইঞ্চি উচ্চতাসম্পন্ন এই ফুটবলারের ফুটবল ক্যারিয়ার শুরু হয় ১৯৬২ সালে ঢাকায় ফায়ার সার্ভিসের হয়ে। ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত একই দলে খেলেন। এরপর পর্যায়ক্রমে খেলেন ওয়ান্ডারার্স (১৯৬৬-১৯৬৮) ও মোহামেডানে (১৯৬৮-১৯৭৮)। ১৯৬৯, ১৯৭৫, ১৯৭৬ ও ১৯৭৮ সালে মোহামেডান লিগ চ্যাম্পিয়ন হয়। ১৯৭৬ সালে তিনি ছিলেন অধিনায়ক। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে ১৯৭৪ সালে প্রথম ডাবল হ্যাটট্রিক করার কৃতিত্ব তাঁর। ফায়ার সার্ভিসের সঙ্গে তিনি এই কৃতিত্ব দেখান। ১৯৭৬ সালে লিগের টপ স্কোরার হন। ১৯৬৮ সালে মোহামেডানের হয়ে জেতেন ঐতিহ্যবাহী আগাখান গোল্ড কাপ।


পাকিস্তান আমলে বাঙালিরা সব দিক দিয়েই ছিল শোষিত ও বঞ্চিত। ক্রীড়াঙ্গনও এর ব্যতিক্রম ছিল না। পাকিস্তান জাতীয় ফুটবল দলে বাঙালিদের সুযোগ পাওয়াটা ছিল ব্যতিক্রমী ঘটনা। যারা অসাধারণ নৈপুণ্য প্রদর্শন করতে পারতেন, তাঁদের বাদ দেয়া সম্ভব হতো না। অল্প যে ক’জন বাঙালি পাকিস্তান জাতীয় ফুটবল দলে সুযোগ করে নেন, হাফিজ তাঁদের একজন। ১৯৬৬ সালে সফরকারী সৌদি আরব জাতীয় দলের সঙ্গে খেলায় জাতীয় দলে নির্বাচিত হন। ১৯৬৭ সালে বার্মায় এশিয়া কাপে, ১৯৬৮ সালে ঢাকায় এলসিডি দলের সঙ্গে, সফররত সোভিয়েত ইউনিয়নের অলগা দলের সঙ্গে, ১৯৬৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন সফরে, তেহরানে ফ্রেন্ডশিপ কাপে, তুরস্কের আংকারায় আরসিডি টুর্নামেন্টে এবং ১৯৭০ সালে তেহরানে আরসিডি টুর্নামেন্টে খেলেন। একবার তিনি জাতীয় দলের ভারপ্রাপ্ত অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭২ সালের ৪ ও ১১ নভেম্বর ঢাকা স্টেডিয়ামে কলকাতা ইস্টবেঙ্গলের সঙ্গে খেলায় বাংলাদেশ নির্বাচিত একাদশের অধিনায়ক ছিলেন। এরপরও বাংলাদেশ জাতীয় দলের হয়ে খেলতে পারেননি, যা তার জীবনের সবচেয়ে বড় হতাশার অধ্যায়।


সেই হাফিজ জীবনের নানা বাঁক বদল করে আজ হয়েছেন ফুটবলার থেকে সংসদের অভিভাবক, যা নিঃসন্দেহে এক অনন্য কীর্তি। অভিনন্দন তাঁকে।

 আরকে/প্রবা

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা